চুয়াডাঙ্গা রবিবার , ১০ অক্টোবর ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আলোচনায় নতুন নির্বাচন কমিশন

সমীকরণ প্রতিবেদন
অক্টোবর ১০, ২০২১ ৯:১৩ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

কীভাবে নতুন ইসি হবে রাজনৈতিক মহলে চলছে আলোচনা : ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে একমত নয় বিএনপিসহ কিছু বিরোধী দল
সমীকরণ প্রতিবেদন:
বর্তমানরা বিদায় নেবেন ফেব্রুয়ারিতে । কীভাবে নতুন ইসি হবে রাজনৈতিক মহলে চলছে আলোচনা । ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে একমত নয় বিএনপিসহ কিছু বিরোধী দল মাহমুদ আজহার, গোলাম রাব্বানী ও রফিকুল ইসলাম রনি আলোচনায় নতুন নির্বাচন কমিশন আবারও আলোচনায় নির্বাচন কমিশন। কোন প্রক্রিয়ায় গঠন হবে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি), তা নিয়ে রাজনীতিতে ব্যাপক উত্তাপ বইছে। এরই মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সার্চ কমিটির মাধ্যমেই গঠিত হবে নতুন নির্বাচন কমিশন। অন্যদিকে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো এর বিরোধিতা করে বলছে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হবে। এ ইস্যুতে মাঠ গরম করার পরিকল্পনাও নিচ্ছে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ বুদ্ধিজীবী মহলের বড় একটি অংশই বলছে, নির্বাচন কমিশন গঠনে আইন কাঠামো থাকা উচিত। সোমবার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানান, রাষ্ট্রপতি একটি সার্চ কমিটি গঠন করবেন। এর মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন হবে। আগের দিন একই কথা জানান দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও। এর পরই রাজনীতি সরগরম শুরু হয়। সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রতি ক্ষমতাসীনদের আস্থা থাকলেও বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দলই শুরু থেকে তাদের ‘দলকানা’ বলে আসছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল বলছে, নির্বাচন কমিশন গঠনে স্থায়ী সমাধান হওয়া উচিত। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন প্রসঙ্গে গতকাল সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সংবিধান মেনে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের কোনো বিকল্প নেই। তবে আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, আইনটি হতে হবে জনস্বার্থে, দলীয় স্বার্থে নয়। এবং এটি প্রয়োগও হতে হবে জনগণের স্বার্থে, যাতে কয়েকজন সৎ, নির্ভীক ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পান। এ ছাড়া আইনে এমন কিছু বিষয় রাখতে হবে যাতে সঠিক ব্যক্তিরা নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ পান।
এদিকে বিদায়ের শেষ মুহূর্তে কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন বর্তমান নির্বাচন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। আর মাত্র চার মাস মেয়াদ রয়েছে এ কমিশনের। আগামী বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিদায় নেবেন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা। এর পরই সাংবিধানিক সংস্থাটিতে দায়িত্ব নেবেন নতুন ব?্যক্তিরা, যাদের অধীনে হবে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন গঠনের এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির- সংবিধানে বলা আছে। একটি আইনের অধীনে তিনি এ নিয়োগ দেবেন। তবে বিগত সময়ের মতো এবার সার্চ কমিটির মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের আভাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এজন্য আগামী জানুয়ারিতে সার্চ কমিটি গঠন করা হবে। এরপর গঠন হবে নতুন নির্বাচন কমিশন। তবে সার্চ কমিটি নির্বাচন কমিশন ঠিক করে দেবে না, তারা রাষ্ট্রপতিকে সহায়তা করতে কিছু নাম বাছাই করে দেবে। রাষ্ট্রপতি তা থেকে নিয়োগ দেবেন। স্বাধীনতার পর ১২ জন সিইসি ও ২৭ জন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ পেয়েছেন। এর মধে?্য সিইসি পদে বিচারপতি এ কে এম নূরুল ইসলাম সাড়ে সাত বছর ছিলেন।
প্রথমবার রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করে ২০১২ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি একটি সার্চ কমিটি গঠন করেন। তাদের মনোনীত ব?্যক্তিদের মধ?্য থেকে নিয়োগ দেন নতুন কমিশনের সদস্যদের। এরপর ২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও একই পদ্ধতি অনুসরণ করেন। তবে ২০১২ সালের চার সদসে?্যর সার্চ কমিটির পরিবর্তে ২০১৭ সালে ছয় সদস্যের কমিটি করেছিলেন রাষ্ট্রপতি। ওই কমিটিতে দুই বিশ্ববিদ?্যালয় শিক্ষককে নেওয়া হয়েছিল।
সংবিধানের আলোকেই ইসি গঠনের পক্ষে আওয়ামী লীগ
সংবিধান মেনে বিদ্যমান আইনি কাঠামোতেই নির্বাচন কমিশন গঠন করতে চায় আওয়ামী লীগ। বিষয়টি দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই অনেকটা পরিষ্কার করেছেন। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। কিছুদিন আগেও আইন করে কমিশন গঠন করার পক্ষে ক্ষমতাসীন দলটিতে মত থাকলেও এখন কম সময়ে আইন করা যাবে না বলে এ পদ্ধতি থেকে সরে আসছে। রাষ্ট্রপতি যে প্রক্রিয়ার নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন, তাতেও পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার কথা জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা বলছেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সব ক্ষমতা থাকবে ইসির হাতে। তাদের কাজে সরকার সহযোগিতা করবে। আর সার্চ কমিটির মাধ্যমে কমিশন গঠন হলে সেখানে সব দলের মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকবে। এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তাঁর সংবাদ সম্মেলনে পরিষ্কার বলেছেন সার্চ কমিটির মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন করা হবে। তিনি বলেন, যখন সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল তখন রাষ্ট্রপতি সব রাজনৈতিক দলের অভিমত নিয়েছিলেন। সবাই রাজি হওয়ার পরই সার্চ কমিটির গেজেট হয়। যদিও সার্চ কমিটির গেজেট আইন নয়, কিন্তু এটা যেহেতু সবার কনসেন্স নিয়ে করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তে হয়েছিল, তাই সেটি কিন্তু আইনের কাছাকাছি। তিনি বলেন, ‘অতীতের মতো এবারও সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে যাবে। রাষ্ট্রপতি তাদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করবেন। কমিশন তাদের শপথ অনুযায়ী স্বাধীনভাবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পরিচালনা করবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো ভূমিকা বা হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই, থাকবেও না। সবকিছু বিচার-বিবেচনায় নিয়ে যেভাবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করেন সেভাবেই তো হওয়ার কথা। আমরা অপেক্ষায় রয়েছি, বিষয়টিকে স্বাগত জানাতে।’
সার্চ কমিটি মানবে না বিএনপি
পুরনো ফরমুলায় সার্চ কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন মানবে না বিএনপি। এ নিয়ে শিগগিরই দলের অবস্থান তুলে ধরবে তারা। প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গেও এ নিয়ে সংলাপ করতে চায় দলটি। তবে দলটির আরেকটি সূত্র এও বলেছেন, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া আর কোনো ইস্যুতে আপাতত সরকারের সঙ্গে দরকষাকষিতে যেতে চায় না বিএনপি। তবে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে তারা এবার কোনো ছাড় দেবে না। আন্দোলনের ছকও কষা হচ্ছে এই এক দফা সামনে রেখেই।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বক্তব্য হলো, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যে আলোচনা হয়েছে আর এবার যে আলোচনা হবে তা এক নয়। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার- এই একটি এজেন্ডা নিয়ে আলোচনা করতে চাইলে রাজি আছি। সরকার একতরফাভাবে সার্চ কমিটি গঠন করলে তা মানা হবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কথা বলে সবার মতামত নিয়েই ইসি গঠন করা হবে।’ বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা মনে করেন, নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দুই দিক থেকেই সরকারকে চাপে ফেলতে হবে। রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলতে পারলে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাবে। এ চিন্তা থেকেই বিএনপি কর্মপরিকল্পনা ঠিক করছে। এ লক্ষ্যে গত মাস থেকে বৈঠক করছেন দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘সার্চ কমিটি নিয়ে আমাদের ভাবনা নেই। আমাদের মূল ভাবনা হলো নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার। এর বাইরে আর কোনো ভাবনা আপাতত আমাদের মাথায় নেই।’
যেভাবে গঠিত হয় হুদা কমিশন
নতুন ইসি গঠন প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি ২০১৬ সালের ১৮ ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেন। অধিকাংশ দলের সুপারিশ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ইসি গঠনের সুপারিশ তৈরির জন্য ২০১৭ সালের ২৫ জানুয়ারি ছয় সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করেন। ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সিইসি ও অন্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য ১০ জনের নাম সুপারিশ করার সময়সীমা দেওয়া হয় সার্চ কমিটিকে। ১০ জনের নামের তালিকা চূড়ান্ত করতে সার্চ কমিটি নিজেদের মধ্যে চার দফা বৈঠক করে। প্রথম বৈঠকে কার্যপরিধি ঠিক করার পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংলাপে অংশ নেওয়া ৩১টি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি করে নাম নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। দ্বিতীয় বৈঠকে ২৬টি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে পাওয়া ১২৫টি নাম থেকে ২০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি এবং তৃতীয় বৈঠকে ওই তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের সম্পর্কে যাচাই-বাছাই ও বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়। সর্বশেষ বৈঠকে ১০ জনের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়। নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে ১০ জনের নাম চূড়ান্ত করার পর ২০১৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের হাতে সে তালিকা তুলে দেয় সার্চ কমিটি। এরপর ওই দিন নতুন ইসি গঠন করেন রাষ্ট্রপতি। পরে ১৫ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন সিইসি কে এম নূরুল হুদাসহ নতুন নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা। নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন এ কমিশনের অন্য সদস্যরা হলেন মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। সে হিসেবে ১৫ ফেব্রুয়ারি তাদের মেয়াদ পাঁচ বছর পূর্ণ হবে।
ইসি গঠনে প্রথম রাজনৈতিক সংলাপ
২০১২ সালে নতুন ইসি গঠনের আগে রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেন। ২২ জানুয়ারি গঠন করা হয় সার্চ কমিটি। সে সময় সার্চ কমিটির আহ্বানে আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল নতুন কমিশনের জন্য তাদের পছন্দের ব্যক্তির নামের তালিকা দিলেও বিএনপি দেয়নি। ২২ জানুয়ারি গঠনের পর ৭ ফেব্রুয়ারি ১০ জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে দিয়েছিল সার্চ কমিটি। তার মধ?্য থেকে পাঁচজনকে ৮ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপ্রধান। কমিটি রাষ্ট্রপতির কাছে যে সুপারিশ জমা দেয় তাতে সিইসি ও চার কমিশনার নিয়ে পাঁচটি পদের জন্য ১০টি নাম আসে। তার মধ্য থেকেই পাঁচজনকে বেছে নেন রাষ্ট্রপতি। সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অনধিক চারজন নির্বাচন কমিশনারকে লইয়া বাংলাদেশের একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে এবং উক্ত বিষয়ে প্রণীত আইনের বিধানাবলি-সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারকে নিয়োগদান করিবেন।’ সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রপতি সব সময় সিইসি ও ইসি নিয়োগ দিলেও ২০১২ সালে কমিশন হয় সার্চ কমিটির মাধ্যমে। সে সময় প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।