আরও ২১ লাশ উদ্ধার : মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫০ : কাঁদছে পাহাড়

399

পাহাড়ধসে প্রাণহানিতে মোদির শোক: যুক্তরাজ্য ও ইইউ’র দুঃখ প্রকাশ : মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সমবেদনা
আরও ২১ লাশ উদ্ধার : মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৫০ : কাঁদছে পাহাড়
অভ্যন্তরীণ সড়ক যোগাযোগ বিপর্যস্ত : নিম্নাঞ্চল বন্যায় প্লাবিত : আজও চলবে উদ্ধার কাজ
সমীকরণ ডেস্ক: আবদুল আজিজের বয়স আনুমানিক ৫০ বছর। ব্যান্ডেজ নিয়ে বান্দরবান জেলা হাসপাতালের ৪৭ নম্বর বেডে শুয়ে আছেন। দু’চোখ বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরছে। বিড়বিড় করে ডাকছেন স্ত্রী কামরুন নেছা ও মেয়ে সুফিয়াকে। তিনি নিজেও জানেন না আর কোনো দিন ফিরবেন না স্ত্রী-মেয়ে। তার চোখের সামনেই পাহাড়চাপায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। বিলাপ করে তিনি বললেন, কার জন্য কিনলাম ঈদের শাড়ি। ও কামরুন নেছা, আমারে ছাড়ি তুমি কোথায় গেলা? ও সুফিয়া, আমার কাছে ফিরে আয় মা। তোদের ছাড়া আমি কীভাবে থাকব রে। কাদের নিয়ে বাকি জীবন কাটাব। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া আবদুল আজিজ যখন প্রলাপ বকছিলেন, তখনই মাটি খুঁড়ে উদ্ধার করা হয় কামরুন নেছা ও সুফিয়ার লাশ। তার মতো স্বজন হারানো মানুষের আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছে পাহাড়ের বাতাস। নিহতদের তালিকা গতকাল বুধবার আরও দীর্ঘ হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৫০ জনে। মঙ্গলবার চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও বান্দরবানে ১৩২ জনের লাশ পাওয়া গেলেও দ্বিতীয় দিনে আরও ২১ লাশ উদ্ধার হয়েছে। নতুন করে পাহাড় ধসে কক্সবাজার ও খাগড়াছড়িতে আরও সাতজন নিহত হয়েছেন। সব মিলিয়ে গতকাল পর্যন্ত পাঁচ জেলায় পাহাড় ধসে মাটিচাপায় নিহত হয়েছেন ১৫০ জন। স্থানীয়রা বলছেন, তিন জেলায় এখনও অন্তত ১৫ জনের মতো নিখোঁজ রয়েছেন।
untitled-3_301089  এদিকে, শোকাহত মানুষদের সান্ত¡না দিতে গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের সব রকমের সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দেন। রাঙামাটি ও বান্দরবানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ গতকালও বিচ্ছিন্ন থাকায় হেলিকপ্টারে দুর্গত এলাকায় যান মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। ত্রাণ কার্যক্রম ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে পৃথক দুটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা গতকাল সকাল থেকে দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযান শুরু করে। সন্ধ্যায় তা স্থগিত করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকালে আবারও উদ্ধার অভিযান শুরু হবে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক জসিম উদ্দিন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী বলেন, পাহাড় ধসে চট্টগ্রামে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৭ জনে পৌঁছেছে। গতকাল বুধবার রাঙ্গুনিয়ায় চারজনের লাশ পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য দেওয়ার জন্য তালিকা করা হচ্ছে। নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে দাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মো. মানজারুল মান্নান বলেন, সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা রাঙামাটিতে ১০৫ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করেছি। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক জানান, গতকাল নতুন করে দু’জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা মা-মেয়ে।
তিন জেলায় আরও ২১ লাশ উদ্ধার: গতকাল রাঙামাটিতে আরও সাতজনের লাশ পাওয়া গেছে। তারা হচ্ছেন রাঙামাটি শহরের সুস্মিতা চাকমা (৫), আজিজা আক্তার (৫), ফুলহুদী চাকমা, মো. মুন্না আলমগীর (২৬), জুড়াছড়ির ছতিশ চাকমা (৫৫) ও হ্যাপি তঞ্চঙ্গা (৭)। বান্দরবানে মঙ্গলবার সাতজন নিহত হলেও গতকাল আরও দু’জনের লাশ পাওয়া গেছে। তারা হলেন কামরুন নেছা (৪০) ও সুফিয়া (১২)। সম্পর্কে তারা মা-মেয়ে। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় থেকে গতকাল আরও চারজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। তারা হলেন আশীষ কুমার মজুমদার, তার মেয়ে শ্রেয়া মজুমদার (১১), ডা. দিলীপ কান্তি দে (৪৭) ও ইয়াসমিন আকতার (১৫)। খাগড়াছড়ি ও টেকনাফে নিহত চার: কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সাতঘরিয়া পাড়ায় পাহাড় ধসে বাবা-মেয়ে নিহত হয়েছেন। গতকাল ভোররাতে প্রবল বর্ষণের সময় পাহাড় ধসে মাটিচাপায় তারা নিহত হন। তারা হলেন মো. ছলিম (৪২) ও মেয়ে তিসা মনি (১০)। এ ছাড়া খাগড়াছড়ির বরমাছড়িতে পাহাড় ধসে নিহত হয়েছেন দু’জন। তারা হলেন পরিমল চাকমা (৫৫) ও কালিঞ্জি চাকমা (৪৫)। এর মধ্যে কালিঞ্জি চাকমার লাশ পাওয়া গেছে ফটিকছড়ি উপজেলার খিরামে।
উদ্ধারকাজ আজও চলবে :উদ্ধার তৎপরতা চালাতে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লা থেকে রাঙামাটি গেছে ফায়ার সার্ভিসের ৬০ সদস্যের একটি বিশেষ দল। দলটি আজ বৃহস্পতিবার উদ্ধার অভিযানে অংশ নেবে। ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক জসিম উদ্দিন জানান, কাপ্তাই থেকে ট্রলারে করে তারা রাঙামাটি পৌঁছেছেন। গতকাল উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন।
স্বজন হারানো মানুষদের মানবেতর জীবনযাপন :রাঙামাটির ভেদভেদী এলাকার নতুনপাড়া ও পশ্চিম মুসলিমপাড়ার বাসিন্দা সাইফুল আলম ও আবদুল হাই জানান, তাদের চোখের সামনেই অনেক ঘরবাড়ি পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে বিধ্বস্ত হয়। এখন থাকার মতো কোনো জায়গাও নেই। এখন তারা বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আছেন। কিন্তু সেখানে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় অনেককে নিচে থাকতে হচ্ছে। তারা অভিযোগ করেন, ঘটনার পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এখনও এলাকা পরিদর্শনে আসেননি। এমনকি খাবারও দেননি। তবে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তারা কিছু খাবার পেয়েছেন। মেয়ে ও স্ত্রী হারানো জুড়াহুরি চাকমা বলেন, আশপাশের আত্মীয়ের বাসায় এক রাত ছিলাম। এখন আশ্রয়কেন্দ্রে এসে দেখি থাকার কোনো পরিবেশ নেই। খাবারেরও ঠিক নেই। জানি না কোথায় থাকব; কী খাব?’ পাহাড়জুড়ে শোকের মাতম এ যেন চলছে পাহাড়ের কান্না, কাদছে পাহাড়।
রাঙামাটির সঙ্গে এখনও বিচ্ছিন্ন চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজার ও বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। গতকাল সকাল থেকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম-বান্দরবান মহাসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হয়। তবে চট্টগ্রাম-রাঙামাটি সড়কে যানবাহন চলাচল এখনও স্বাভাবিক হয়নি। রাঙামাটি শহরের সাতছড়িতে সড়কের ওপর মাটি পড়ে থাকায় যানবাহন ঘাগড়া পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসছে বলে জানান হাইওয়ে পুলিশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ। সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ উল্লাহ জানান, রাতের মধ্যে মহাসড়ক থেকে পানি সরে গেছে। সকাল থেকে বড় চাকার গাড়ি চলছে। বান্দরবানের সঙ্গে যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। তবে হাইওয়ে পুলিশ সুপার পরিতোষ ঘোষ জানান, বান্দরবান শহরের সুয়াবিল এলাকায় এখনও সড়কের ওপর পানি জমে আছে। বড় চাকার গাড়ি নির্বিঘেœ চলাচল করলেও প্রাইভেটকার, অটোরিকশাসহ ছোট যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ভয়াবহ ভূমিধসে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানিতে শোক জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পাশাপাশি তিনি স্থানীয় পর্যায়ে অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতায় সহযোগিতার প্রস্তাব করেছেন। টুইটারে তিনি এসব কথা বলেছেন। এক টুইটে মোদি লিখেছেন, ভূমিধসে বাংলাদেশে প্রাণহানিতে আমি শোহাহত। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের প্রতি আমার সমবেদনা রইলো। আহতদের প্রতি আমার প্রার্থনা। ১৩ই জুন স্থানীয় সময় রাত ১১টায় পোস্ট করা টুইটে তিনি লিখেছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অবস্থান করছে ভারত। প্রয়োজন হলে আমরা স্থানীয় অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় সরকারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জোয়েল রাইফম্যান। গতকাল ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জোয়েল রাইফম্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, গত ১৩ই জুন চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে পাহাড়ধসে যে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীর পক্ষ থেকে আমি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও উদ্ধারকারীদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি। আপনাদের এ দুঃখ-দুর্দশায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। সকল সাহসী উদ্ধারকারীকে আমরা সাধুবাদ জানাই।
বাংলাদেশের পার্বত্য তিন জেলায় পাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে শোক বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বৃটিশ হাইকমিশনার এলিসন ব্লেইক এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুন। বুধবার প্রকাশ করা ওই শোক বার্তায় ইইউ রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুন বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা করতে ইইউ প্রস্তুত আছে। অন্যদিকে, বৃটিশ হাইকমিশনার এলিসন ব্লেইক এক টুইট বার্তায় হাহাড় ধসে হতাহতের ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে এ ঘটনায় নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।