চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ২১ মে ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর প্রয়াণ; এই শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
মে ২১, ২০২২ ৮:৪৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা কালজয়ী গান, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রম্নয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি- এই গানের রচয়িতা, বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট ও বুদ্ধিজীবী, স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত লেখক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী চলে গেলেন না ফেরার দেশে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকালে লন্ডনের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, জীবন ও কর্মের মধ্যদিয়ে কেউ কেউ নিজেকে এমন স্থানে উন্নীত করেন, যাদের শূন্যতা মেনে নেওয়া কঠিন। তিনি ছিলেন এমনই একজন মানুষ যিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন তার কর্মের মধ্যদিয়ে। এই কিংবদন্তির প্রস্থানে স্বাভাবিকভাবেই নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বরেণ্য এ সাংবাদিকের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেছেন, ‘আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর মৃত্যুতে বাংলাদেশ প্রগতিশীল, সৃজনশীল ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একজন অগ্রপথিককে হারাল। তার একুশের অমর সেই গান বাঙালি জাতিকে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তির আন্দোলনে অসীম সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছিল। তিনি একজন বিশিষ্ট কলামিস্ট। লেখনীর মাধ্যমে তিনি আজীবন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকাশে কাজ করে গেছেন।’ শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানের রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তার মেধা-কর্ম ও লেখনীতে এই দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রেখেছেন। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মননকে ধারণ করে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়কে সমর্থন করে জাতির সামনে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সরকার নিবন্ধিত সাপ্তাহিক জয় বাংলা পত্রিকায় বিভিন্ন লেখালেখির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছেন। পরে তিনি প্রবাসে থেকেও তার লেখনীর মাধ্যমে বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে তুলে ধরেছেন।’ উল্লেখ্য, ৮৭ বছর বয়সি গাফ্ফার চৌধুরী ১৯৭৪ সাল থেকে ব্রিটেনে বসবাস করছিলেন। তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছু দিন ধরে হাসপাতালে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলেন। বলা দরকার, বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা বাঁক বদলের সাক্ষী গাফ্ফার চৌধুরী ছিলেন একাত্তরে মুজিবনগর সরকারের মুখপত্র সাপ্তাহিক জয় বাংলার নির্বাহী সম্পাদক। ১৯৭৪ সাল থেকে লন্ডনে বসবাস করলেও মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে তার কলম সোচ্চার ছিল সবসময়। প্রবাসে থেকেও ঢাকার পত্রিকাগুলোতে তিনি যেমন রাজনৈতিক ধারাভাষ্য আর সমকালীন বিষয় নিয়ে একের পর এক নিবন্ধ লিখে গেছেন, তেমনি লিখেছেন কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, স্মৃতিকথা ও প্রবন্ধ। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৪ সালের ১২ ডিসেম্বর বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া গ্রামে। ছাত্রজীবনে লেখালেখিতে হাতেখড়ি হয়েছিল তার। ১৯৪৯ সালে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সম্পাদিত মাসিক সওগাত পত্রিকায় তার গল্প প্রকাশিত হয়। ১৯৫২ সালে সাময়িকপত্রে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস ‘চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান’। এছাড়া তার সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি ছাত্রজীবনে। ঢাকা কলেজের ছাত্র থাকাকালে যোগ দেন দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায়। ১৯৫১ সালে যোগ দেন খায়রুল কবীর সম্পাদিত দৈনিক সংবাদের বার্তা বিভাগে। ১৯৫৬ সালে যোগ দেন তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া সম্পাদিত দৈনিক ইত্তেফাকে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলমযোদ্ধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। জয় বাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে মডারেটরের ভূমিকাও পালন করেন। স্বাধীনতার পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক জনপদের প্রধান সম্পাদক ছিলেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে লন্ডনে পাড়ি জমান। ১৯৭৬ সালে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সেখানে ‘বাংলার ডাক’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। ‘সাপ্তাহিক জাগরণ’ পত্রিকায়ও কিছু দিন কাজ করেন। পরে তিনি ‘নতুন দিন’ ও ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকা বের করেন। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ইউনেস্কো পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পদক, একুশে পদক, শেরেবাংলা পদক, বঙ্গবন্ধু পদকসহ অসংখ্য পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন। সর্বোপরি আমরা বলতে চাই, তিনি তার কাজের মধ্যদিয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার অবদান কখনো ভুলে যাওয়ার নয়। তার লেখনীতে উদ্দীপ্ত হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রস্থানে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো, তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়। এই কিংবদন্তির বিদেহী আত্মার প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার পরিজনের প্রতি গভীর সমবেদনা।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।