চুয়াডাঙ্গা সোমবার , ২১ নভেম্বর ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আদালত চত্বরে ফিল্মি স্টাইলে জঙ্গি ছিনতাই

পুলিশের চোখে পিপার স্প্রে মেরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয় তার ছয় সহযোগী
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
নভেম্বর ২১, ২০২২ ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের চোখে পিপার স্প্রে ছিটিয়ে এবং কিল-ঘুসি মেরে ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণ থেকে আনসার আল ইসলামের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নিয়েছে তাদের সহযোগীরা। চারজনকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত দুইজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, অপর দুইজন পালাতে পারেনি। পালিয়ে যাওয়া দুইজনই ২০১৫ সালে বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায় এবং জাগৃতি প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপন হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। গতকাল রবিবার দুপুর ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরই একটি মোটরসাইকেলে চড়ে আদালত চত্বর ত্যাগ করে পলাতক জঙ্গিরা। ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গির মধ্যে এক জন মইনুল হাসান শামীম ওরফে সামির ওরফে ইমরান (২৪)। তিনি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মাধবপুর গ্রামের মৃত আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে। অপরজন আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ওরফে সাজিদ ওরফে শাহাব (৩৩)। তিনি লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার ভেটশ্বর গ্রামের আবু তাহেরের ছেলে।

এ ঘটনায় রাজধানী জুড়ে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সারা দেশের আদালতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিদের ধরিয়ে দিলে ১০ লাখ টাকা করে পুরস্কার ঘোষণা করেছে পুলিশ সদর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, এ ঘটনায় যদি কারো গাফিলতি পাওয়া যায়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২০১৮ সালের মার্চে ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে গুলি করে তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেয় সহযোগীরা। এর মধ্যে দুই জন ছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। সেই ঘটনার পর জঙ্গিদের আদালতে আনা-নেওয়াসহ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গাফিলতি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর গোলাম সারোয়ার খান জাকির বলেন, গতকাল সকালে আসামিদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর তাদের হাজতখানায় রাখা হয়। হাজতখানা থেকে তাদের সন্ত্রাস দমন ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এরপর ২০১৩ সালের মোহাম্মদপুর থানার একটি মামলায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন শুনানি হয়। শুনানি শেষে হাজতখানায় নেওয়ার পথে অজ্ঞাতনামা ছয় জন পুলিশের দিকে স্প্রে-জাতীয় কিছু ছুড়ে মেরে আসামিদের ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তিনি বলেন, জঙ্গিদের আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের আরো বেশি সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। এখানে নিরাপত্তা আরো বেশি জোরদার হওয়া উচিত ছিল।

আদালতের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আনসার আল ইসলামের এ দুই সদস্য ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলায় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। একই বছরের ৩১ অক্টোবর আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী ফয়সল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যার মামলায়ও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে এ দুই জঙ্গি। এদের ধরিয়ে দিতে তখন পুরস্কারও ঘোষণা করেছিল পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস দমন আইনে আরো একাধিক মামলা রয়েছে। সেগুলোতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। গতকাল এমনই একটি মামলায় আদালতে তোলা হয়েছিল তাদের। ঘটনার পরপরই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হারুন আর রশীদ ঘটনাস্থলে বলেন, ‘দুটি মোটরসাইকেলে চারজন এসে পুলিশের চোখে স্প্রে করে আসামিদের ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তারা প্রকাশক দীপন হত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তারা পুলিশের গায়ে হাত তুলেছে। স্প্রে করার কারণে পুলিশ সদস্যরা চোখে দেখতে পাননি। ডিবি পুলিশ প্রত্যেক জায়গায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি করছে। আমরা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করছি।’

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, কোর্টের শুনানি শেষে প্রথমে চারজনকে নিচে নামিয়ে আনা হয়। দুটি হাতকড়া দিয়ে দুই-দুইজনকে আটকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বাকি আসামিরা তখন ওপরে ছিল। চারজনের মধ্যে মইনুল হাসান ও আবু সিদ্দিককে জঙ্গিরা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তবে মো. আরাফাত ও মো. সবুজকে নিতে পারেনি। জঙ্গিরা পিপার স্প্রে ব্যবহার করে। এতে একজন সিকিউরিটি গার্ড, একজন পুলিশ সদস্যসহ কয়েক জন সাধারণ মানুষ আক্রন্ত হন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আদালতের মূল ফটকের কাছে পৌঁছামাত্র কয়েকজন দুর্বৃত্ত পুলিশের চোখে পিপার স্প্রে মেরে হাতকড়া পরানো চার আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পুলিশ সদস্যদের মারধরও করা হয়। এতে আহত হন পুলিশ সদস্য নুরে আজাদ। এরপর দুই আসামি একটি মোটরসাইকেলে চড়ে পালিয়ে যায়, যেটির চালক ছিল আরেক জন।

জঙ্গিদের মোটরসাইকেলে চড়ে পালিয়ে যাওয়ার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ১ নম্বর রঘুনাথ দাস লেনের রায় সাহেবের বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দিয়ে দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে লাল রঙের একটি বাইকে তিনজন পালিয়ে যায়। তাদের পিছু পিছু আরও কয়েক যুবক দৌড়াচ্ছিলেন। তাদের মধ্যে একজনের হাতে হেলমেট, দুইজনের হাতে ব্যাগ ও দুইজন খালি হাতে ছিলেন। আদালত প্রাঙ্গণের ভেতরের বই বিক্রেতা মো. নিজাম বলেন, ঘটনার পরপরই এক মেয়ে আমার দোকানের দিকে এসে বলে একটু পানি দেন। সে অনেক কাশছিল। তার সঙ্গে একটা বাচ্চা ছিল, সেই বাচ্চার মুখ আটকে রেখেছিল ওই মেয়ে। মেয়েটি বারবার বলছিল, একটু পানি দেন স্প্রে মারছে। আমি এটা শুনে ঘটনাস্থলে দৌড়ে গেছি। সেখানে গিয়ে দেখি অনেক লোক গলি দিয়ে দৌড়াচ্ছে। এর কিছুক্ষণ পরে দেখলাম পুলিশ দুইজনকে ধরে নিয়ে আসছে। নিজাম বলেন, গেটে যে সিকিউরিটি ছিলেন, তাকে স্প্রে মেরেছে। আর যে পুলিশ তাদের নিয়ে যাচ্ছিল, তাকে মেরে মুখ দিয়ে রক্ত বের করে দিয়ে হ্যান্ডকাপ পরেই দুই আসামি পালিয়ে গেছে। তিনি বলেন, জঙ্গিরা একটি অ্যান্টিকাটার ড্রেনে ফেলে পালিয়ে যায়। পরে পুলিশ সেটা জব্দ করে।

এ ঘটনার পর সারা দেশের আদালতগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে মৌখিক এই নির্দেশ দেওয়া হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. গোলাম রব্বানী। তিনি বলেন, রবিবার দুপুরে ঢাকার কোর্টে দুই জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মিস হয়ে যাওয়ার ঘটনায় আমরা নির্দেশনা দিয়েছি। যেন দেশের আদালতগুলো সতর্ক থাকে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই জঙ্গি মইনুল হাসান ও মো. আবু ছিদ্দিক সোহেলকে ধরিয়ে দিতে পারলে ২০ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. মনজুর রহমান বলেন, পলাতক দুই জঙ্গিকে ধরিয়ে দিতে পারলে ১০ লাখ করে ২০ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে দুই জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় কারও গাফিলতি থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। গতকাল সচিবালয়ের নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, ছিনিয়ে নেওয়ার পরপরই তাদের ধরতে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। পুলিশ তাদের হন্যে হয়ে খুঁজছে। আশা করি, শিগগিরই তারা ধরা পড়বে। এ বিষয়ে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বলেছেন, তদন্ত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের (ক্রাইম অ্যান্ড অপস্) নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে যুগ্ম কমিশনার (অপারেশনস্), যুগ্ম কমিশনার (সিটিটিসি), উপ-কমিশনার (গোয়েন্দা-লালবাগ) এবং অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (সিআরও) সদস্য হিসেবে থাকবেন।

ডিএমপি কমিশনার গোলাম ফারুক বলেন, আদালত থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই জঙ্গিকে গ্রেফতারে রাজধানীতে রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। প্রতিটি থানা ও অন্যান্য ইউনিটকে চেকপোস্ট বসানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দুই জঙ্গি পালিয়ে যাওয়ার পর আদালত প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সোয়াট টিম সদস্যরাও টহল দিচ্ছেন। ঘটনাস্থলে রয়েছে এপিসি ও সাজোয়া যানসহ বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট। এদিকে জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় আদালত এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জঙ্গিদের আদালতে আনার দিন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার হওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মো. গোলাম ছারোয়ার খান জাকির। তিনি বলেন, মোহাম্মদপুর থানার সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলার আজ শুনানি ছিল। সেই মামলার আসামি ২০ জন, এর মধ্যে ছয় জন পলাতক। ১২ জন জেল হাজতে ছিলেন ও দুই জন জামিনে ছিলেন। আদালতের নিরাপত্তার ঘাটতি আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলতে পারবে। তবে অবশ্যই নিরাপত্তাব্যবস্থা আরো জোরদার হওয়া উচিত ছিল।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেছেন, কাশিমপুর-২ কারাগার থেকে তাদের আদালতে নেওয়ার সময় নিরাপত্তায় কোনো ঘাটতি ছিল না। আদালতে নিয়ে তাদের কোর্ট পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদালত চত্বরে সব সময়ই নিরাপত্তা ঢিলেঢালা থাকে। আর সেই সুযোগটাই নিয়েছে জঙ্গিরা। আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে রেকি করে ঐ জায়গাটাকেই টার্গেট করে জঙ্গিরা। যেটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরের বাইরে ছিল। এখানে পুলিশের গাফিলতির বিষয়টি পরিষ্কার। প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ২ মার্চ ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজনভ্যানে গুলি চালিয়ে ও বোমা মেরে জঙ্গি মামলার তিন আসামিকে ছিনিয়ে নেয় সহযোগীরা। এর মধ্যে দুই জন ছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। এ সময় গুলিতে এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। এক উপপরিদর্শকসহ (এসআই) আহত হন প্রিজনভ্যানে থাকা পুলিশের তিন জন সদস্য।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।