চুয়াডাঙ্গা শনিবার , ৫ আগস্ট ২০১৭
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আট কবরের সম্মুখ সমরের ইতিহাস

সমীকরণ প্রতিবেদন
আগস্ট ৫, ২০১৭ ৪:১৬ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ২রা আগষ্ট বাংলাদেশের জয়পুর গ্রামে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প করা হয়। কমান্ডার হাফিজুর রহমান জোয়ার্দ্দার বাগোয়ান গ্রামে স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ এসে কমান্ডারের নিকট বলে যে, পাকাবাহিনীর দালাল কুবাদ খান এর অত্যাচারে আমরা গ্রামবাসী অতিষ্ঠ। কমান্ডারসহ ৪ঠা আগষ্ট কুবাদ খানকে রাত্রিতে এরেস্ট করে ক্যাম্প নিয়ে আসে। নিয়ে আসার পর ৫ই আগষ্ট সকাল ৮টায় জপুর ক্যাম্প হইতে আমাদের কমান্ডার অস্ত্র ও গোলাবারুদ আনার জন্য কৃষ্ণনগর হর্টিকালচার বাগানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে আমরা ১৪ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের অধীনে কর্ণেল আর কেসিং এর কাছে যাওয়ার আগে আমাদের নির্দেশ দেন যে, আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত কেহ সম্মুখ সমরে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। এমন সময় সকাল ১১টায় কুবাদ খানের পক্ষের দালাল এসে বলে দুইজন রাজাকার আমাদের ক্যাম্পে এসে বলে যে, রাজাকার বাহিনী এসে আমাদের মাঠের পাকা ধান কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এই কথা শোনা মাত্র আমাদের রক্ত টগবগ করে ফুটে উঠল যে রাজাকারদের এখনি জীবিত ধরে নিয়ে আসতে হবে।
হাসান, নওশের তারেক এর নেতৃত্বে আমরা ১৫জন সহযোদ্ধাদের নিয়ে রাজাকার ধরায় অগ্রসর হই। বাগোয়ান গ্রামে যেয়ে দেখি কোন রাজাকার নেই। কুবাদ খানের দালালরা নিয়ে যায় রতনপুর ঘাটের ওপারে পাকবাহিনী এম্বুশ নিয়ে আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ও পাকবাহিনীর সাথে নদীর এপার-ওপার হতে গুলি বিনিময় শুরু হয়। মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর ১জন ওপিকে গুলি করে মারে। ওপি বটগাছে ছিল। আমরা জপুর ক্যাম্প থেকে গোলাগুলি শুনে চিন্তা করলাম রাজাকার ধরতে যে এত গোলাগুলি কেন? এমতবস্থায়  আরো ১৫জন মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র গোলাবরুদ নিয়ে বাগোয়ান গ্রামের দিকে যখন অগ্রসর হয় তখন আনুমানিক বেলা ১টা বাজে। আমরা বাগোয়ান গ্রামে পৌঁছালে দেখি যে পূর্বের যাওয়া মুক্তিযোদ্ধাগণ ঐ গ্রামে মুড়ি খাচ্ছে। আমরা যাওয়ার পর ঐ মুক্তিযোদ্ধাগণ আনন্দের সাথে বলে যে, আমরা রতনপুর ঘাটের ওপারে পাকবাহিনীর ওপিকে মেরেছি।
এইবার মুক্তিযোদ্ধারা ২টি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আমাদের গ্রুপ হাসানের নেতৃত্বে (১) আমি মোস্তফা খান, (২) আলী আজগর ফটিক, তারেক রওশন, রবিউল, খোকন, পিন্টু, আক্তার,  হুমায়ুন, নুরুল আমিন, কিয়ামদ্দিন, ্আফাজ উদ্দিন। আরেক গ্রুপ নওশের আলীর নেতৃত্বে কাভারিং পার্টি পজিশন নিয়ে থাকে। নাটুদহ গ্রামের হাইস্কুলে অবস্থানরত পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মোকাবেলা করার জন্য বাগোয়ান গ্রামের দিকে অগ্রসর হয়। হাসানের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাগণ নাটুদহ ক্যাম্পের পাকবাহিনীর সাথে মোকাবেলা করার জন্য অগ্রসর হয়। এমতবস্থায় পাকবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে ফেলে। দেখার পর রাস্তার ঢালুতে এ্যাম্বুশ করে এবং আমাদের দিকে ১রাউন্ড গুলি বর্ষণ করে। আমরা সাথে সাথে পজিশন চলে যাই। পজিশন ছিল ধানক্ষেত। পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখে সমরে প্রায় ২/৩ঘন্টা তুমুল যুদ্ধ চলতে থাকে।
এমতবস্থায় হাসানের হাতে গুলি লাগে। আমাদের কাছে থাকা গোলাগুলি শেষ হয়ে আসে। আমি উঠে দেখি পাকবাহিনী আমাদেরকে ধরার জন্য ইউ কাটিং এ্যাম্বুশ করে আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে। আমরা ধানের ক্ষেতে ক্রলিং করে পিছু হটতে বাধ্য হই। ধানের ক্ষেতে ক্রলিং করার সময় ফটিক ও আমি মোস্তফা খান মাথায় ঢুষ খায়। আমরা তখন দুইজন আখের ক্ষেতের দিকে চলে যাই। পিছিয়ে যাবার সময় হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় আলী আজগার ফটিকের বাম পায়ের হাঁটুতে বাঁশের গোজ ফুটে যায়। এইবার পাকবাহিনী আমাদের ধরার জন্য আখ ক্ষেতের দিকে অগ্রসর হয়। ফটিক ও আমি মোস্তফা খান অস্ত্র অকেজো করে আখ ক্ষেতের ভিতরে ফেলে দিই। আমি মোস্তফা খান ও ফটিক ঝাঁপ দিয়ে গর্তের ভিতরে পড়ি। এমতবস্থায় বাম পায়ের পাতায় গরুর হাঁড় ফুটে যায়। ঐখান থেকে দুইজন আহত অবস্থায় খুব কষ্টের সাথে জপুর ক্যাম্পে আসি। এসে বন্দী কুবাদ খানকে নিয়ে অস্ত্র গোলাবারুদসহ ভারতের গোঙড়া বিএসএফ ক্যাম্পে অবস্থান করি। অবস্থান করার পরে আমরা বিএনএফদের বলি যে, আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের বাঁচানোর জন্য কভারিং ফায়ার দেওয়ার জন্য। এই কথা শুনে বিএসএফরা ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে যায়। তারপর মুক্তিযোদ্ধারা একে একে গোঙড়া বিএসএফ ক্যাম্পে আসতে থাকে। আসার টপর আমরা গুনে দেখি ৮জন মুক্তিযোদ্ধা আর আসে না। আমরা জানালাম ঐ ৮জন মুক্তিযোদ্ধা পাকবাহিনীর গুলিতে শহীদ হয়েছেন।
৮জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হলেন:- হাসান, কাশেম, রওশন, রবিউল, তারেক, খোকন, আফাজ উদ্দীন, কিয়ামদ্দিন। এই যুদ্ধে যারা প্রাণে বেঁচে যান:- মোস্তফা খাঁন, আলী আজগর (ফটিক), আজম আক্তার জোয়ার্দ্দার (পিন্টু) (মৃত), হুমায়ুন কবির (মৃত), আক্তারউজ্জামান, নুরুল আমিন (মৃত)।
এইবার কমান্ডার হাফিজুর রহমান জোয়ার্দ্দার পরের দিন ক্যাম্পে এসে আমাদের সবাইকে বকাবকি করে যে আমার হুকুম ছাড়া তোমরা কেন যুদ্ধে গিয়োছো? মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও অভিভাবক এবং বিহার চাকুলিয়ার ট্রেনিং প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার (ছেলুন) এই ৮জন শহীদ হওয়ার কথা শুনে ভারতের হাটখোলা এ্যাকশন ক্যাম্পের এ্যাকশন কমান্ডার হিসাবে প্রতি গ্রুপ কমান্ডারকে ডেকে একত্রিত করেন এবং যুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য দায়িত্ব নেন। তারপর থেকে সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার (ছেলুন)’র নেতৃত্বে গ্রুপ কমান্ডাররা যুদ্ধ করতেন এবং তিনি সকল গেরিলা কমান্ডারদের নেতৃত্ব দিতেন।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।