আগের মতোই সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও ভোট বর্জন

50

৫ম ধাপে ২৯ পৌরসভা নির্বাচন সম্পন্ন : কালীগঞ্জ মহেশপুরসহ আ.লীগের নিরঙ্কুশ জয়
কালীগঞ্জে ভোট কেন্দ্রে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া, সারা দেশে সংঘর্ষে ১ জন নিহত, আহত ১০
সমীকরণ প্রতিবেদন:
বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, ভাঙচুর, নির্বাচন বর্জন, প্রিসাইডিং অফিসারসহ নির্বাচনি কর্মকর্তাদের ব্যালটে সিল মারার অভিযোগের মধ্যদিয়ে শেষ হলো ৫ম ধাপের ২৯টি পৌরসভার নির্বাচন। গতকাল রোববার সকাল ৮টায় শুরু হয়ে বিকেল ৪টায় পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলে। নির্বাচনী সংঘর্ষে একজন নিহত ও কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছেন। এর আগের ধাপের নির্বাচনগুলোর মতো এ নির্বাচনেও কেন্দ্র দখল, এজেন্ট বের করে ইচ্ছে মত ভোটগ্রহণ ও প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এনে বিএনপি ও জাতীয় পার্টি মনোনীত বেশ কয়েকজন মেয়র প্রার্থী নির্বাচন বর্জন করেছেন। ককটেল নিক্ষেপ, মারামারি-ভাঙচুরের ফলে আতঙ্কে অনেক পৌরসভায় শুরু থেকে ভোটারের উপস্থিতি ছিল অনেক কম। আবার বেশ কয়েকটি পৌরসভার বিভিন্ন কেন্দ্রে উল্লেখযোগ্য ভোটার উপস্থিতি ছিল। পঞ্চম ধাপের নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা মার্কার প্রার্থীরা একচেটিয়া বিজয় লাভ করেছে। ২৯ পৌরসভার মধ্যে ২৭টিতেই আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে দুজন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। একটি বিএনপি ও অন্যটি আ.লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী জয় লাভ করেছেন।
কালীগঞ্জ ও মহেশপুর পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়:
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ ও মহেশপুর পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতিকের প্রার্থীরা। সন্ধ্যা ৭টার দিকে জেলা নির্বাচন অফিসার রোকুনুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, কালীগঞ্জ পৌরসভায় ১৯ হাজার ৩২৬ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন বর্তমান মেয়র আশরাফুল আলম আশরাফ। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আলহাজ্ব মাহাবুবার রহমান পেয়েছেন ৩ হাজার ৭৪ ভোট। এছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী নারিকেল গাছ প্রতীকের এনামুল হক ইমান পেয়েছেন ২ হাজার ৮১৬ ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের হাতপাখা প্রতীকের নুরুল ইসলাম পেয়েছেন ১ হাজার ৪৭১ ভোট। নির্বাচনে কালীগঞ্জ পৌরসভায় মোট ভোটার রয়েছে ৪০ হাজার ৫৭৭ জন। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীন ইভিএম-এর মাধ্যমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরে পৌরসভার কাশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের বাইরে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মাঝে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে ৪ জন আহত হয়। একটি ঘটনা ছাড়া দিনব্যাপী শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
অপর দিকে মহেশপুর পৌরসভা নির্বাচনে ২য় বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী আব্দুর রশিদ খান। তিনি পেয়েছেন ১৩ হাজার ৫৯৮ ভোট। বিএনপির প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী অ্যাড. আমিরুল ইসলাম খান চুন্নু পেয়েছেন ১ হাজার ৫৫ ভোট পেয়েছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মোস্তফা কিরণ পেয়েছেন ৯৩৬ ভোট ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী তাহাবুর রহমান পেয়েছেন ৪৭২ ভোট। এর আগে দুপুর ১টার দিকে কারচুপির অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলনে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন বিএনপির মেয়র প্রার্থী অ্যাড. আমিরুল ইসলাম খান চুন্নু।
কালীগঞ্জে ভোট কেন্দ্রে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া:
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ পৌরসভা নির্বাচনে কাশিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেদে সম্প্রদায়ের দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার সময় ইসলাম নামে এক যুবক আহত হয়েছেন। দুই কাউন্সিলর প্রার্থী মেহেদী হাসান সজল ও আরিফুল ইসলামের সমর্থকদের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ বিজিবি ও র‌্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাঠিচার্জ করে। এতে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ পৌরসভায় ভোট গ্রহণ হয়েছে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে। এদিকে কালীগঞ্জ পৌরসভার ধানের শীষ প্রতীকের মেয়র প্রার্থী আলহাজ¦ মাহবুবার রহমান অভিযোগ করেছেন, তাঁর এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। বিএনপি সমর্থিত ভোটারদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। সবখানেই নৌকার রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। কারো কাছে অভিযোগ করে কোনো ফল পাওয়া যায়নি। এখানে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ২১০ জন পুলিশ, ১৯৮ জন আনসার ও ৩ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটার রয়েছে ৪০ হাজার ৫৭৭ জন। ৯ ওয়ার্ডে ২১ কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়।
মহেশপুর ও শৈলকুপায় বিএনপির প্রার্থীর ভোট বর্জন:
ঝিনাইদহের মহেশপুর পৌরসভার বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট আমিরুল ইসলাম চুন্নু নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। গতকাল রোববার দুপুরে তিনি মহেশপুর উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ভোট বর্জন করেন। এ সময় বিএনপির দলীয় নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্রে কেন্দ্রে তাঁর এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা দিয়েছে সরকার দলীয় প্রার্থীর লোকজন। তাছাড়া প্রতিটি কেন্দ্র ও তাঁর আশে-পাশে দলীয় লোকজন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। বিএনপির সমর্থিত কাউকে আসতে দেখলেই তাঁকে হুমকি-ধামকি দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কেন্দ্রে গিয়ে দেখতে পায় প্রতিটি বুথের ভেতরে নিয়োজিত ব্যক্তি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব বিষয়ে নির্বাচনে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতা পাইনি। যে কারণে অবাধ, নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন হচ্ছে না। যার ফলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াচ্ছি। উল্লেখ্য, মহেশপুর পৌর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের আব্দুর রশিদ খাঁন, বিএনপির অ্যাডভোকেট আমিরুল ইসলাম চুন্নু ও স্বতন্ত্র প্রার্থী গোলাম মোস্তাফা কিরণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এরমধ্যে বিএনপির প্রার্থী চুন্নু রোববার দুপরে নানা অভিযোগ এনে নির্বাচন বর্জন করেন।
অপর দিকে, ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলা পরিষদের উপ-নির্বাচনে ভোট বর্জন করেছেন বিএনপি প্রার্থী মো. হুমায়ুন বাবর ফিরোজ। তিনি গতকাল রোববার বিকেলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে নির্বাচন বর্জনের কথা জানান। ফেসবুকে তিনি দাবি করেন, ‘রোববার সকালে ভোট শুরু হওয়ার পর থেকে আমার নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা প্রদান ও শনিবার রাতে সরকার দলীয় লোকজন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিভিন্ন নেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে ভোট কেন্দ্রে যেতে নিষেধ করেন। সব কেন্দ্রে আমার নির্বাচনী এজেন্টদের ঢুকতে বাধা প্রদান ও যে সব কেন্দ্রে এজেন্টরা ঢুকেছিল, তাদেরকে বের করে দিয়ে নৌকায় সিল মারার মহোৎসব পালন করে।’ এর প্রমাণ-স্বরুপ তিনি ফেসবুকে প্রকাশ্যে নৌকার সিল মারার ভিডিও সংযুক্ত করেন। ভোটের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহযোগিতায় তাঁর ভাষায় ‘ভোট ডাকাতির’ প্রতিবাদে দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তিনি ভোট বর্জন করেন বলে উল্লেখ করেন। তিনি সুষ্ঠু পরিবেশে নির্বাচনের দাবিও জানান।