চুয়াডাঙ্গা রবিবার , ১৫ জানুয়ারি ২০২৩
আজকের সর্বশেষ সবখবর

আখেরি মুনাজাতের মধ্যদিয়ে আজ শেষ হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমার ১ম পর্ব

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
জানুয়ারি ১৫, ২০২৩ ৮:০৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

Girl in a jacket

সমীকরণ প্রতিবেদন:
কহর দরিয়াখ্যাত টঙ্গীর তুরাগ পাড়ের বিশ^ ইজতেমাস্থল এখন দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মুসল্লির পদচারণায় মুখরিত। শিল্প নগরী টঙ্গী এখন যেন ধর্মীয় নগরীতে পরিণত হয়েছে। এবারের ইজতেমার প্রথম পর্বের দ্বিতীয় দিন গতকাল শনিবার আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-বিধান ও রাসূল সা: প্রদর্শিত তরিকা অনুযায়ী জীবন গড়ার আহ্বান জানিয়ে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি জিকির আজকার, ইবাদত বন্দেগি আর ধর্মীয় ভাবগম্ভীর পরিবেশে পবিত্র কুরআনের আলোকে গুরুত্বপূর্ণ বয়ানের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেছে। আজ রোববার আখেরি মুনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে আখেরি মুনাজাত অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ব তাবলিগ জামাতের শীর্ষ মুরব্বি বাংলাদেশের হাফেজ মাওলানা জুবায়ের হাসান আখেরি মুনাজাত পরিচালনা করবেন বলে জানিয়েছেন আয়োজক কমিটি। মুনাজাতে বিশে^র সব মানুষের সুখ, শান্তি ও কল্যাণ কামনা করে দোয়া করা হবে। আয়োজকরা ধারণা করছেন ২৫-৩০ লাখ ধর্মপ্রাণ মানুষ আখেরি মুনাজাতে অংশ নিবেন। ইজতেমা ময়দানে বিদেশী নিবাসের পূর্বপার্শ্বে বিশেষভাবে স্থাপিত মঞ্চ থেকে এ মুনাজাত পরিচালনা করা হবে। এর আগে অনুষ্ঠিত হবে হেদায়তি বয়ান। হেদায়তি বয়ান ও আখেরি মুনাজাতের মধ্যদিয়ে শেষ হচ্ছে প্রথম পর্ব। এরপর চার দিন বিরতি দিয়ে আগামী শুক্রবার শুরু হবে তিন দিনের বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্ব। আখেরি মুনাজাতে মানুষের আসা-যাওয়া নিরাপদ করতে গতকাল শনিবার দিবাগত মধ্যরাত থেকে মুনাজাত পর্যন্ত ইজতেমা ময়দানগামী সড়কে যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে পুলিশ। গত কয়েক বছর বিরতি দিয়ে এবার অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশ্বইজতেমার অন্যতম আকর্ষণ যৌতুকবিহীন বিয়ে।
ইসলামের মর্মবাণী সর্বত্র পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে ধর্মপ্রাণ মানুষ দলে দলে ছুটে আসছেন টঙ্গীর তুরাগ তীর ইজতেমা ময়দানে। গতকালও টঙ্গী অভিমুখী বাস, ট্রাক, ট্রেন, লঞ্চসহ বিভিন্ন যানবাহনে ছিল মানুষের ভিড়। আখেরি মুনাজাতের আগ পর্যন্ত মানুষের এ ঢল অব্যাহত থাকবে। ইতোমধ্যে ইজতেমা ময়দান পূর্ণ হয়ে গেছে। মূল প্যান্ডেলে স্থান না পেয়ে অনেকে নিজ উদ্যোগেই প্যান্ডেলের বাইরে পলিথিন সিট ও কাপড়ের সামিয়ানা টানিয়ে গতকালও অবস্থান নিয়েছেন। এ দিকে এবারও তাবলিগের শীর্ষ মুরব্বিরা রেডিও-টিভিতে আখেরি মুনাজাত সরাসরি সম্প্রচারে অনুমতি দেননি। ক্যামেরাও মুরব্বিদের ছবি তোলাও বারণ করে দিয়েছে ইজতেমা কর্তৃপক্ষ। তারপরও কিছু কিছু বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইজতেমা কর্তৃপক্ষের অজ্ঞাতে আখেরি মুনাজাত সম্প্রচার করার উদ্যোগ নিয়েছেন।
দ্বিতীয় দিনে যারা বয়ান করলেন :
ইজতেমা আয়োজক কমিটির মুরব্বি প্রকৌশলী মাহফুজ জানান, নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্বের দ্বিতীয় দিন ইজতেমায় আগতদের উদ্দেশে বাদ ফজর বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা খুরশিদুল হক রায়বেন্ড। এরপর সকাল ১০টা হতে বিশেষ বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ইব্রাহিম দেওলা, পরে মাদরাসা ছাত্রদের উদ্দেশে বিশেষ বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা খুরশিদ, আরব জামাতের জন্য বয়ান করেন ভারতের মাওলানা আহমদ লাট, বোবা ও বধিরদের জন্য বয়ান করেন ভারতের মাওলানা সানোয়ার, বিদেশী জামাতের মানুষের উদ্দেশে ইংরেজিতে বয়ান করেন পাকিস্তানের মাওলানা ইফতার জামান। বাদ জোহর বয়ান করেন ভারতের মাওলানা ফারুক। বাদ আসর বয়ান করেন ভারতের মাওলানা জুহাইরুল হাসান এবং অনুবাদ করেন মাওলানা যোবায়ের হাসান।
যা বয়ান করলেন :
তাবলিগ জামাতের মুরব্বিগণ তাবলিগের ছয় উসুল যথা কালিমা, নামাজ, ইলম ও জিকির, ইকরামুল মুসলিমিন, তাসহিয়ে নিয়ত এবং তাবলিগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বয়ান করেন। বয়ানে মুরব্বীরা বলেন, যতদিন দ্বীন থাকবে, তত দিন দুনিয়া থাকবে। আর দ্বীন টিকে থাকবে দাওয়াতের মাধ্যমে। যুগে যুগে নবী-রাসুলগণ দ্বীনের দাওয়াতের কাজ করে গেছেন। ফেরাউনের কাছেও দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দিতে আল্লাহ্ হযরত মূসা (আ:) কে পাঠিয়েছিলেন। আল্লাহ যাল্লে জালালুহু নবী-রাসুলদেরকে তাদের নিজের পরিবার ও বিভিন্ন গোত্রের মানুষের কাছে দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার জন্য পাঠিয়েছেন। আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা:কে সারা দুনিয়ায় দ্বীনের দাওয়াত দেয়ার জন্য পাঠিয়েছিলেন। আজ তিনি নেই। এ কাজের জিম্মাদারি এখন তার উম্মতের ওপর। সকালের বয়ানে বলা হয়, পরকালের চিরস্থায়ী সুখ শান্তির জন্য আমাদের প্রত্যেককে জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বীনের দাওয়াতের কাজে জানমাল দিয়ে মেহনত করতে হবে। ঈমান আমলের মেহনত ছাড়া কেউ হাশরের ময়দানে কামিয়াব হতে পারবে না। দাওয়াতের মেহনত হলো নবুওয়াতি মেহনত। খুলুসিয়াত ও আজমতের সঙ্গে যারা মেহনত করবে তাদের যেকোনো আমলের ফজিলত বহুগুণ বেড়ে যায়। বয়ানে আরো বলা হয়, দুনিয়ার জিন্দেগে ক্ষণস্থায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষের দিল থেকে আসবাবের (সম্পদের) এক্বিন বের না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তার দিলে কুদরতি এক্বিন পয়দা হবে না। সবাকে দ্বীনের জন্য মেহনত করতে হবে। আল্লাহর কাছে আমল ছাড়া এ দুনিয়ার জিন্দেগির কোনো মূল্য নেই। বয়ানে আরো বলা হয়, দ্বীনের দাওয়াতের মাধ্যমে ঈমান মজবুত হয়। ঈমান মজবুত হলে আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আর এ সম্পর্ক গড়ে ওঠলে দুনিয়া ও আখিরাতে কামিয়াবি হাসিল হয়।
আজ যারা আখেরি মুনাজাত ও বয়ান করবেন হাসান:
বিশ্ব তাবলিগ জামাতের প্রথম পর্বের শেষদিন আজ শীর্ষ মুরব্বি বাংলাদেশের হাফেজ মাওলানা জুবায়ের আখেরি মুনাজাত পরিচালনার আগে সকাল সাড়ে ৭টায় ভারতের মাওলানা আবদুর রহমান হেদায়াতি বয়ান করবেন। বাংলাদেশের মাওলানা আব্দুল মতিন বাংলায় অনুবাদ করবেন। এদিন বিশেষ নসিহত করবেন ভারতের মাওলানা ইব্রাহিম দেওলা। তার বয়ান বাংলায় অনুবাদ করবেন মাওলানা জুবায়ের।
বয়ানের তাৎক্ষণিক অনুবাদ :
বিশ্ব ইজতেমায় বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের তাবলিগ মারকাজের ১৫-২০ জন শুরা সদস্য ও বুজর্গ বয়ান পেশ করেন। মূল বয়ান উর্দুতে হলেও বাংলা, ইংরেজি, আরবি, তামিল, মালয়, তুর্কি ও ফরাসি ভাষায় তাৎক্ষণিক অনুবাদ হচ্ছে। বিভিন্ন ভাষাভাষি মুসল্লিরা আলাদা আলাদা বসেন এবং তাদের মধ্যে একজন করে মুরব্বি মূল বয়ানকে তাৎক্ষণিক অনুবাদ করে শুনান। মূল বক্তা বয়ানের একটি নির্দিষ্ট অংশ শেষ করার পর অনুবাদের জন্য বিরতি দেন। অনুবাদ শেষ হলে তিনি আবার বয়ান শুরু করেন। এভাবেই ইজতেমা ময়দানে তাবলিগ জামাতের মুরব্বিদের বয়ান চলে।
এবার অনুষ্ঠিত হলো যৌতুকবিহীন বিয়ে :
বিশ্ব ইজতেমার অন্যতম আকর্ষণ যৌতুকবিহীন বিয়ে। সম্পূর্ণ শরিয়ত মেনে তাবলিগের রেওয়াজ অনুযায়ী ইজতেমার দ্বিতীয় দিন বাদ আছর ইজতেমার বয়ান মঞ্চের পাশে যৌতুকবিহীন বিয়ের আসর বসে। শতাধিক বিয়ে অনুষ্ঠিত হয় এ আসরে। ভারতের মাওলানা জুহাইরুল হাসান এসব বিয়ে পড়ান। কনের সম্মতিতে এবং তার অনুপস্থিতিতে বর এবং কনে পক্ষের লোকজনের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হয় ওই বিয়ে। বিয়েতে মোহরানা ধার্য করা হতো ‘মোহর ফাতেমী’র নিয়মানুযায়ী। এ নিয়ম অনুযায়ী মোহরানার পরিমাণ ধরা হয় দেড় শ’ তোলা রুপা বা উহার সমমূল্যের অর্থ। গত কয়েক বছর এটি অনুষ্ঠিত হয়নি।
তাশকিলের কামরায় চিল্লাভুক্ত মুসল্লি :
ইজতেমার প্যান্ডেলের উত্তর-পশ্চিমে তাশকিলের কামরা স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন খিত্তা থেকে বিভিন্ন মেয়াদে চিল্লায় অংশ গ্রহণেচ্ছু মুসল্লিদের এ কামরায় আনা হচ্ছে এবং তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। পরে কাকরাইলের মসজিদের তাবলিগি মুরব্বিদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এলাকা ভাগ করে তাদেরকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাবলিগি কাজে পাঠনো হবে। এবার প্রায় ৬ হাজার জামাত তাবলিগে ছড়িয়ে পড়বে : তাবলিগ জামাতের অন্যতম মুরব্বি প্রকৌশলী মাহফুজ বলেন, তাবলিগের একমাত্র কাজই আল্লাহর পথে মানুষকে ডাকা। রাসূল সা:-এর বিদায় হজের ভাষণের মূল বাণী হিসেবে আমরা আল্লাহর পথে ডেকে থাকি। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই এর একমাত্র লক্ষ্য। একমাত্র আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিনের একক আনুকূল্যে এই ইজতেমা হয়ে থাকে। টঙ্গীর এই ইজতেমা থেকেই বিশ্বের অন্তত ১৫০টি দেশে দাওয়াতের এই কাজ করা হয়। প্রতি বছর টঙ্গী ইজতেমা থেকেই পাঁচ থেকে ছয় হাজার জামাত বিশ্বব্যাপী পাঠানো হয়। আগত বছরের বিশাল কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা টঙ্গী থেকেই হয়।
৭ মুসল্লির মৃত্যু :
বিশ^ ইজতেমা ময়দানে আগত ৭ মুসল্লি গতকাল পর্যন্ত মারা গেছেন। তাদের প্রায় সবাই শ্বাসকষ্টজনিত রোগে ভুগছিলেন বলে জানিয়েছেন ইজতেমা ময়দানের জিম্মাদার মাওলানা মোহাম্মদ শাকের। বিশেষ ট্রেন : বিশ্ব ইজতেমা উপলক্ষে বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে আখেরি মুনাজাত উপলক্ষে আখাউড়া, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন রুটে ২১টি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া আখেরি মুনাজাতের আগে ও পরে সব ট্রেন টঙ্গী স্টেশনে যাত্রা বিরতি করবে। টঙ্গী রেলওয়ে জংশন সূত্রে জানা গেছে, আজ আখেরি মুনাজাতের দিন জামালপুর-টঙ্গী একটি, আখাউড়া-টঙ্গী একটি, টঙ্গী-ময়মনসিংহ, লাকসাম-টঙ্গী রুটে বিশেষ ট্রেন যাতায়াত করবে। এ ছাড়া আখেরি মুনাজাতের আগে-পরে সব ট্রেন টঙ্গী স্টেশনে যাত্রা বিরতি করবে বলে জানিয়েছেন টঙ্গীর রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তা।
বিশ্ব ইজতেমায় বিদেশী মুসল্লি :
গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ জানান, গতকাল সকাল পর্যন্ত বিশ্বের শতাধিক দেশের ৮ হাজারের বেশি সংখ্যক বিদেশী মুসল্লি ইতোমধ্যে ইজতেমায় অংশ নিয়েছেন। আরো বিদেশী মেহমান টঙ্গীর পথে রয়েছেন। বিভিন্ন ভাষা-ভাষী ও মহাদেশ অনুসারে ইজতেমা ময়দানে বিদেশী মেহমানদের জন্য পৃথক বিদেশী নিবাস নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আয়োজক সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর কাকরাইল জামে মসজিদে প্রথম বিশ্ব ইজতেমার প্রচলন শুরু হয় ১৯৪৬ সালে। এরপর ১৯৪৮ সালে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামে। ১৯৫৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। ১৯৬৬ সাল থেকে গাজীপুরের শিল্পনগরী টঙ্গীর তুরাগ তীরে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

Girl in a jacket

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।