চুয়াডাঙ্গা বৃহস্পতিবার , ২২ সেপ্টেম্বর ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অসৎ উদ্দেশ্য নিয়েই জন্ম ইভ্যালির

সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
সেপ্টেম্বর ২২, ২০২২ ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

Girl in a jacket

♦ কোম্পানির দুর্দশার জন্য রাসেল দায়ী মানেননি কোনো আইন-বিধি
♦ ভাউচার থাকলেও টাকা দাতা-গ্রহীতার হদিস নেই
♦ বিনিয়োগকারী ছাড়া কোম্পানি চালানো সম্ভব নয়

সমীকরণ প্রতিবেদন: গ্রাহকদের টাকা নিয়ে প্রতারণা করার উদ্দেশ্যেই ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ইভ্যালির জন্ম হয়েছিল। ইভ্যালি ছিল এক পরিবারের কোম্পানি এবং একক ব্যক্তির নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠানটি চলত। এই প্রতিষ্ঠানে মোহাম্মদ রাসেলই একাধারে এমডি, সিইও, সিএফও, প্রধান হিসাবরক্ষকসহ সব দায়িত্ব পালন করতেন। ব্যবসা পরিচালনায় কোম্পানিটি কোনো আইন ও বিধি মানেনি। সবক্ষেত্রেই ছিল গোঁজামিল। অনেক ভাউচার পাওয়া গেলেও দাতা-গ্রহীতার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রাসেল। ইভ্যালি-সংক্রান্ত অডিট রিপোর্ট ও হাই কোর্টের নির্দেশে গঠিত পরিচালনা বোর্ডের প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন দুটির সার-সংক্ষেপ বাংলাদেশ প্রতিদিনের হাতে রয়েছে।

আদালতের নির্দেশে গঠিত ইভ্যালির পরিচালনা পর্ষদ গতকাল এই অডিটি প্রতিবেদন হাই কোর্টে দাখিল করেছে। একই সঙ্গে পাঁচ সদস্যের এই বোর্ড দাখিল করেছে নিজেদের প্রতিবেদনও। অডিট কোম্পানির সুপারিশ উদ্ধৃত পরিচালনা পর্ষদের মতামত অংশে বলা হয়েছে, ইভ্যালিতে নতুন করে বড় ধরনের বিনিয়োগ না হলে কোম্পানিটি চালানো অসম্ভব। হাই কোর্টের আদেশে বলা হয়েছিল, কোম্পানি চালানো সম্ভব না হলে দেউলিয়া করে দেওয়া। কিন্তু পরিচালনা বোর্ডের মতে, লাখ লাখ গ্রাহকের ভাগ্য ও পুঁজি এই কোম্পানির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। তাই দেউলিয়া ঘোষণা না করাই সমীচীন। এর ফলে ইভ্যালি ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে চালু হওয়ার পথ খোলা থাকবে। গতকাল এই পরিচালনা পর্ষদ নিজেদের পদত্যাগপত্রও হাই কোর্টে দাখিল করেছে।

পদত্যাগের বিষয়ে পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, আমাদের ওপর দায়িত্ব ছিল কোম্পানির অডিট করা এবং এই কোম্পানি সচল করা যাবে কি না, সে বিষয়ে প্রতিবেদন দেওয়া। আমরা আমাদের কাজ শেষ করেছি। তাই আমরা পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। এখন সুপ্রিম কোর্টে অবকাশ চলছে। অবকাশের পর হাই কোর্ট ইভ্যালির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।

জানা গেছে, স্বনামধন্য অডিট ফার্ম হুদাবাসী চৌধুরী অ্যান্ড কোম্পানি ১৮ সেপ্টেম্বর অডিট প্রতিবেদন পরিচালনা বোর্ডে দাখিল করে। এই প্রতিবেদন পর্যলোচনার পর পরিচালনা পর্ষদ ১১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। এই ১১ পৃষ্ঠা প্রতিবেদনের সঙ্গে ছয়টি ভলিউমে অডিট রিপোর্টও হাই কোর্টে দাখিল করা হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭টি ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে, যার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। শীর্ষ পদে কর্মকর্তা প্রায় সবাই আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের সদস্য। তাদের বেতনভাতাও ছিল অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কয়েকটি ক্ষেত্রে দেখা গেছে, চারজন কর্মকর্তাকে ১ লাখ টাকা করে বেতন দেখানো হলেও পরিশোধ করা হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। অধিকাংশ বেতনভাতা ক্যাশে পরিশোধ করা হয়েছে। এরও নথিপত্র পাওয়া যায়নি। এভাবে ক্যাশে বেতন পরিশোধ করাও বেআইনি। প্রতিবেদনে বলা হয়, কোম্পানির প্রাথমিক পুঁজি ছিল ১ কোটি টাকা। অথচ তাদের দৈনিক ট্রান্সজেকশন ছিল কোটি কোটি টাকা এবং এই টাকা সবই ক্রেতাদের। ক্রেতাদের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে ইভ্যালি অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এই টাকায় তারা বিলাসবহুল জীবনযাপন করেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রাসেল এবং তার স্ত্রী শামীমার ব্যবসা-বাণিজ্যের বিষয়ে কোনো জ্ঞানই নেই। হিসাব-নিকাশের বিষয়ে তাদের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ফলে কোম্পানির সব হিসাব-নিকাশই ভুয়া ছিল। কোনো কার্যকর বিনিয়োগকারী ছাড়া কোম্পানি বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না। এ ছাড়া তাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, মানবসম্পদ বিভাগ, উদ্ভাবনী ব্যবস্থাপনা, উৎপাদন খরচ এবং বিক্রয়মূল্য নির্ধারণে কোনো নীতি ছিল না। পাশাপাশি কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ এবং বাস্তবায়নেরও কোনো নীতি ছিল না। ক্রয়-বিক্রয় ও তথ্য-প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তায় কোনো ব্যবস্থা ও কোনো নীতিমালা খুঁজে পাওয়া যায়নি। অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করে বোর্ডের মতামত অংশে বলা হয়েছে, ইভ্যালি প্রতিদিন ব্যাংক থেকে প্রচুর নগদ টাকা উত্তোলন করত। কিন্তু সেসব উত্তোলিত নগদ টাকার গতিপথ আমরা খুঁজে পাইনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, এত টাকা গেল কোথায়। এ থেকে ধারণা হওয়া স্বাভাবিক কোম্পানিটি বন্ধ করার অনেক আগেই রাসেল-শামীমার ইভ্যালি নিয়ে পরিকল্পিত প্রস্তুতি ছিল যেন কোম্পানিটি এক সময় বন্ধ হয়ে যায়।

বোর্ডের মতামতে আরও বলা হয়, গ্রাহকের টাকায় অহেতুকভাবে তারকাদের কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত করেছে পণ্যদূত হিসেবে। সেজন্য ইভ্যালির প্রচুর অর্থ খরচ করতে হয়েছে। এগুলো মোটেও দরকার ছিল না। তারা নিজেদের কোনো টাকা খরচ করেনি। গ্রাহক ও সরবরাহকারীর টাকা খরচ করেছে। এক কথায় বলা যায়- রাসেল-শামীমা ‘পরের ধনে পোদ্দারি করেছে’। গ্রাহকের সরল বিশ্বাসকে পুঁজি করে রাসেল-শামীমা দম্পতি প্রতারণামূলক ব্যবসা পরিচালনা করেছে, যা সম্পূর্ণভাবে অবৈধ ও বেআইনি। অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে যে কোম্পানি কাজ করে, সে কোম্পানি টিকে থাকতে পারে না। হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন করলেও ইভ্যালির কোনো স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতা এই কোম্পানির ছিল না।

মতামতে বলা হয়, তারা যেভাবে খরচ দেখিয়েছে এটা গ্রহণযোগ্য নয়। খরচের হিসাব-সংক্রান্ত যেসব নথিপত্র ইভ্যালিতে পাওয়া গেছে তার কোনোটাই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রতি মাসে ইভ্যালি অন্তত ৫ কোটি টাকা বেতন-ভাতার পেছনে খরচ করেছে। এত টাকা লেনদেনের সঠিক কোনো হিসাব না থাকায় ধারণা জন্মে, এই টাকা পাচার করা হয়েছে। এ বিষয়টি দেখার দায়িত্ব সরকারের।

Girl in a jacket

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।