চুয়াডাঙ্গা রবিবার , ১৫ মে ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অশনীর বৃষ্টিতে ভাসছে কৃষকের স্বপ্ন

অশনীর প্রভাবে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
মে ১৫, ২০২২ ১:৫৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সারা দেশে অশনির প্রভাবে ভারী বৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও ঝিনাইদহে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কাটা-মাড়াইয়ের সমস্যা হওয়ায় ইরি বোরো ধান নিয়ে মহাবিপাকে পড়েছে কৃষকরা। এতে চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন জেলার ধান চাষীরা। একদিকে শ্রমিক সঙ্কট, অন্যদিকে বৈরী আবহাওয়া যেনো কৃষকের ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠে কাটা ধান বৃষ্টির পানিতে ভাসছে। কৃষকের মুখে নেই হাসি। জমিতে কেটে রাখা ধান ঘরে তোলা নিয়ে নাজেহাল অবস্থা কৃষকদের। বৃষ্টির কারণে মাঠে কাদা-পানি হওয়ায় নামতে পারছেনা ইঞ্জিন চালিত ধান তোলা গাড়িগুলো ফলে বেড়েছে শ্রমিকের কদর। সুযোগমতো শ্রমিকরাও তাদের মজুরি বাড়িয়ে দিয়েছে। ৪০০ টাকার শ্রমিকের মুজুুরি করা হয়েছে ৭০০ টাকা। তারপরও মিলছেনা শ্রমিক। একইসঙ্গে বেড়েছে পরিবহন খরচ। পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধান ভেলায় ভাসিয়ে আনতে হচ্ছে রাস্তায় বা উঁচু জমিতে। বোরো আবাদে কৃষকদের দেখা স্বপ্ন এখন যেন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সব মিলিয়ে অশনীর বৃষ্টিতে ভাসছে কৃষকের স্বপ্ন।
জীবননগর:
ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে গত ৩ দিনের মুষল ধারের টানা বৃষ্টি আর বৈরী আবহাওয়াতে জীবননগর উপজেলার বিস্তৃর্ণ বোরো ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ক্ষেতে কেটে রাখা ধান পানিতে পচে বিনষ্ট হচ্ছে এবং সেই সাথে ডাঙ্গায় তোলার পর ধান হতে কল বেরিয়ে পড়ছে। এই দুর্যোগে এ উপজেলার কয়েক হাজার ধান চাষীদের সোনালী স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়েছে গেছে। চোখের সামনে এমন ক্ষতিতে এ উপজেলার মাঠজুড়ে কেবল এখন কৃষকের বুকফাটা কান্না বিরাজ করছে। গতকাল শনিবার দুপুরে সরেজমিনে উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নের ফসলের মাঠ পরিদর্শনকালে দেখা যায়, কৃষকেরা প্রায় হাঁটু পানিতে নেমে ধান কাটছেন। আবার কেউ কেউ কাটা ধান হাঁটু পানির মধ্য থেকে নিয়ে উঁচু স্থানে রাখার চেষ্টা করছেন। অনেক কৃষক পানিতে ভাসমান কাটা ধানের বিচালি একত্র করছে। অনেকে আবার ভিজা ধান মাড়াই করছেন।

ধানচাষিরা বলেন, পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। ধান পঁচে যাচ্ছে অথবা ধান হতে কল বেরিয়ে পড়েছে। ওই ধান সংগ্রহ করে বাড়িতে আনার মজুর পাওয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে তীব্র মজুর সংকট দেখা দিয়েছে। ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা পারিশ্রমিক দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে সামনের দিনে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম খাদ্য সংকটের মধ্যে পড়তে হবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

এবিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, এ উপজেলায় এবার ৭ হজার ৫’শ হেক্টর জমিতে বোরের ধান চাষ হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে প্রভাবে টানা বৃষ্টির কারণে ধান ক্ষেত ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এখন পর্যন্ত এ উপজেলার কৃষকরা ৪০ ভাগ ধান ঘরে তুলতে সক্ষম হলেও ৬০ ভাগ ধান মাঠে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমরা নিয়মিত পর্যেবক্ষণ করে যাচ্ছি এবং সেই সাথে ক্ষতি যতটা কমানো যায় এবং ধান দ্রুত ঘরে তুলতে পারা যায় সে ব্যাপারে কৃষকদের পরামর্শ দেয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে।

দামুড়হুদা:
ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে ভারিবর্ষণে জেলায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে কৃষকদের। দামুড়হুদা উপজেলার কৃষকের স্বপ্ন এখন বৃষ্টির জলে ভাসছে। এখনো দামুড়হুদার বিভিন্ন গ্রামের মাঠে মাঠে ধান কেটে ও আটি বেধে এবং জলের পানিতে ভাসতে দেখা যায়। এজন্য ধানক্ষেতেই পচনের আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। দামুড়হুদার মাঠে মাঠে কৃষকের স্বপ্ন ভাসছে বৃষ্টির পানিতে। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে শত শত হেক্টর জমির কাটা ধান। আধা পাকা ধান কেটেও শেষ পর্যন্ত ক্ষতি ঠেকানো যায়নি। কাচা ধানও নুইয়ে পড়েছে জমিতে। এতো কষ্টের ধান শেষ মুহূর্তে এভাবে বৃষ্টিতে ক্ষতি যাওয়ায় কৃষকরা দিশেহারা। ক্ষেতে ভেজা ধান আর কৃষকের চোখের জল মিলেমিশে হয়ে গেছে একাকার।

কানাইডাঙ্গা গ্রামের ধান চাষী জয়নাল আবেদীন বলেন, আমার ১ বিঘা জমির ধান এখনো বৃষ্টির পানিতে ভাসছে আর দু একদিন থাকলে জমিতেই সব ধান গজিয়ে যাবে। আমার এ বছর পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।

হরিশ্চন্দ্রপুর গ্রামের মনিরুজ্জামান জানান, প্রতি বছরের মতো এ বছরো ৫ বিঘা ধান ছিলো আমি ধান কেটে বিচালি করার জন্য মাঠে ধানের গাদা দিয়ে রেখেছি আর সেই দিন থেকেই বৃষ্টি আমার ৫ বিঘা জমির ধান জমিতেই গজিয়ে গিয়েছে আমার আমাদের খুব করুন অবস্থা। ৭০০ টাকা দিন মজুরিতেও মিলছে না ধান কাটা ও বহন করার শ্রমিক।

গতকাল সরেজমিনে দামুড়হুদা উপজেলার কুড়ুলগাছির চিৎলা বিলে, রায়সা বিলে, গবরার বিলে, কয়ার বিল, কার্পাসডাঙ্গার চন্দ্রবাস, কানাইডাঙ্গা, বয়রা, মুন্সীপুর-কৃতুবপুর গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, পানির নীচে ধান, কেউ কেউ ধান কেটে রাস্তার ওপরে রেখে দিয়েছে আবার কেউ কাটা ধানগুলো পানিতে ভাসমান অবস্থায় ছড়িয়ে থাকা একত্রে করছে আবার কেউ কেউ ধান মাড়াই করছে। এছাড়া ধান পানিতে ন্যুয়ে পড়ায় চারাও গজিয়েছে। অন্যদিকে, কাটা ধানগুলো মাড়াইয়ের পর ভেজা ধান শুকানো নিয়েও রয়েছে বেশ দুর্ভোগ। বৃষ্টির কারণে বাড়ির উঠুনেও কাঁদা হয়। সড়কেও ধান শুকাতে পারছেন না তারা।

এ বিষয়ে দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ঘুর্ণিঝড় অশনির কারণে বোরো ধান নিচু জমিতে পানি জমে যাবার কারণে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

মেহেরপুর:
ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে ভারী বর্ষণে মেহেরপুরের কৃষকের স্বপ্ন পানির নিচে তলিয়ে গেছে। গত দুই দিনের বৃষ্টিতে মেহেরপুর সদর, গাংনী ও মুজিবনগর উপজেলার প্রায় সকল এলাকায় আধাপাকা ও জমির কাটা ধান তলিয়ে গেছে। এখন ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ধান চাষীরা।

জানা যায়, পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন থেকে দুদিন বৃষ্টির পর প্রচণ্ড গরম অনুভূত হলেও বিরতি দিয়ে গত সোমবার থেকে শুরু হয় বৃষ্টি। অধিকাংশ এলাকায় থেমে থেমে টিপটাপ বৃষ্টি হতে থাকে।এতে মাঠের প্রায় সকল জমির কাঁচাপাকা ধান পানিতে ডুবুডুবু অবস্থায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। ভারী বর্ষণে জমির ধান ডুবে যাওয়াই কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। গত ৩দিনের ঝড় ও ঘূর্ণিঝড় অশনির প্রভাবে ঘণ্টাব্যাপী ভারী বর্ষণে কৃষকের স্বপ্ন ভেঙে তচনচ হয়ে গেছে। বৃষ্টির পর মেহেরপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মাঠের পর মাঠ জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক জমির ধান কর্তন করার পর সেগুলো পানিতে ভেসে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও ধান কর্তনের পর পালা দিয়ে পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখলেও সেগুলোর নিচে প্রায় ১ ফুট পানিতে ডুবে থাকতে দেখা গেছে। ধানের অধিকাংশই পেকে যাওয়ায় সকলে ধান কাটার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, অনেকেই কেটে ফেলেছেন ঠিক এমন সময় হঠাৎ অশনির প্রভাবে বৃষ্টি হওয়ায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে এলাকার কৃষকরা।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।