চুয়াডাঙ্গা শুক্রবার , ১২ আগস্ট ২০২২
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অর্থনীতির মূল খলনায়ক আর্থিক খাতের দুর্বলতা

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি অবিবেচনাপ্রসূত, ২০২৪ সালের আগে এই দুর্যোগ কাটবে না
সমীকরণ প্রতিবেদনঃ
আগস্ট ১২, ২০২২ ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

সমীকরণ প্রতিবেদন: আর্থিক খাতের দুর্বলতা দেশের অর্থনীতির প্রধান খলনায়ক। আর এর কারণ, দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে সংস্কার না হওয়া। এখন এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দুটোই দেখা যাচ্ছে। আর্থিক খাতের অযত্নের কারণে আমরা এগোতে পারছি না। ফলে অর্থনীতির অবস্থা এখন আগের চেয়ে গুরুতর হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের আহবায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে সরকারের জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত অনভিপ্রেত ও অবিবেচনাপ্রসূত। অনেক দিন ধরে রেখে হঠাৎ করে টাকার মান কমানো কিংবা জ্বালানির মূল্য বাড়ানো অর্থনীতির দুর্বলতা প্রকাশ করে। তিনি মন্তব্য করেন, ২০২৪ সালের আগে এই দুর্যোগ কাটবে না। এ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ে দেশের নীতিপ্রণেতারা বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তিমূলক কথা বলছেন। ‘বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় একটি উত্তরণকালীন নীতি সমঝোতার খসড়া’ শিরোনামে গতকাল ভার্চুয়াল মাধ্যমে সাংবাদিকদের সাথে আলাপচারিতায় ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য এ কথা বলেন। তিনি দেশের অর্থনীতির সার্বিক অবস্থা তুলে ধরেন।
ড. দেবপ্রিয় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, সরকার যদি বলে আইএমএফর জন্য জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে তাহলে সরকার তার নীতি সার্বভৌমত্ব হারিয়ে ফেলেছে। আইএমএফকে সাক্ষী গোপাল মেনে কিছু করা, এটা কোনো সম্মানজনক অবস্থান নয়। তবে যেকোনো ঋণ পেতে কিছু প্রাক-পদক্ষেপের প্রয়োজন হয়। কিন্তু আইএমএফ বলছে তাই করেছে, এটা সম্মানজনক নয়। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য এতটা বৃদ্ধি করা ঠিক হয়নি। কেবলমাত্র বৈশ্বিক কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করা হয়নি। সরকার এখন ভালো ভর্তুকি কমিয়ে দিচ্ছে, খারাপ ভর্তুকি রেখে দিচ্ছে। ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত অর্থনৈতিক এই দুর্যোগ থাকতে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, মুদ্রাস্ফীতি, টাকার ওপর চাপ, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন প্রকল্প- এসব বিষয়ে যেসব সমস্যা চলছে তা ২০২৪ সালের শেষ পর্যন্ত স্থায়িত্ব লাভ করতে পারে। আর আর্থিক খাতে সংস্কারের অভাবই এই খাতে খলনায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বর্তমান সঙ্কট রোগের উপসর্গ মাত্র উল্লেখ করে দেবপ্রিয় বলেন, রোগ ভিন্ন জায়গায়। সেটি হলো সংস্কার না হওয়া। তিনি বলেন, আর্থিক খাতের সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারকে ভর্তুকি কমাতে হচ্ছে। অথচ এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে গরিব মানুষকে সুরক্ষা দিতে ভর্তুকি দেয়া বেশি প্রয়োজন ছিল। এই অর্থনীতিবিদ মনে করেন, আর্থিক খাতের এই সঙ্কট মোকাবেলায় দুই থেকে তিন বছরের জন্য একটি অন্তর্র্বতীকালীন অর্থনৈতিক নীতি সমঝোতা প্রয়োজন। এই নীতিসমঝোতায় নীতিবিষয়কে প্রাধান্য দিতে হবে। সেগুলো হলো সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখা এবং গরিব মানুষকে সুরক্ষা দেয়া। এই নীতি প্রণয়ন ঐকমত্যের ভিত্তিতে হওয়া উচিত। তাহলে আগামীতে যদি রাজনৈতিক টানাপড়েন হয়, তখনও আর্থিক খাতকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হবে। তিনি বলেন, টাকার মূল্য আরো আগে থেকেই কমানো উচিত ছিল। অর্থনীতিতে সব কিছু ধাপে ধাপে করতে হয়। ধাপে ধাপে করা সব ক্ষেত্রেই সত্য। কারণ অর্থনীতি কখনো শক পছন্দ করে না। জ্বালানি তেলের মূল্য এতটা না বাড়িয়ে অন্য জায়গায় যে সম্পদ ছিল সেটা ব্যবহার করা যেত। তিনি বলেন, সুদের হারের ক্যাপ একেবারে তুলে দেয়া উচিত হবে না। ব্যাংক সুদের হারে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকার নিজেদের ভেতরেই অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছে না। স্থায়ী কমিটি কোথায়? তাদের ভেতর আলোচনা কই? সরকারের বাইরে আলোচনার আগে তাদের ভেতরে মন্ত্রিসভা, সংসদে আলোচনা করুক। সরকার তার রাজনৈতিক সহযোগীদের সাথে আলোচনা করুক। সংসদের বাইরের বিরোধী দলের সাথে আলোচনা করুক। সরকার শুধু নামে থাকলে হবে না। সরকারের প্রতি জনমনে আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা থাকতে হবে। জনগণ সরকারকে আস্থায় নিচ্ছে না, সে জন্যই আলোচনা প্রয়োজন।

বর্তমান সঙ্কটে শ্রমিক শ্রেণীকে সুরক্ষার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এই মুহূর্তে একটি জাতীয় মজুরি কমিশন গঠনের সময় হয়ে গেছে। তৈরী পোশাক শ্রমিকদের এখন মহার্ঘ্য ভাতা দেয়া উচিত। বেশি বিনিময় হারের সুবিধা পাচ্ছেন পোশাকশিল্পের মালিকরা। তাই এর একটি অংশ পোশাকশ্রমিকদের পাওয়া উচিত। কারণ, বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে শ্রমিকশ্রেণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
নীতিনির্ধারকেরা স্বীকার করছেন যে অর্থনীতি নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে, এমন মন্তব্য করেন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, নীতিনির্ধারকরা অপরিপক্ব ও বিচ্ছিন্নভাবে কথা বলছেন। তাঁরা বিভ্রান্তিমূলক কথাবার্তা বলছেন। কেউ বলছেন, দুই মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ঠিক হয়ে যাবে, কেউ বলছেন, ২০২৪ সালের আগে ঠিক হবে না। কেউ বলছেন, আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ নেবে না, কেউ বলছেন নেবে। এসব কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, নীতি প্রণয়নের মধ্যে রাজনীতিবিদরা নেই, আমলানির্ভর নীতি প্রণয়ন হচ্ছে।

ড. দেবপ্রিয় পরামর্শ দিয়ে বলেন, ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেট এবং মধ্যমেয়াদি কাঠামোর প্রাক্কলিত সংখ্যাগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে। এই অন্তর্র্বতীকালীন নীতি সমঝোতা অংশগ্রহণমূলক এবং পরামর্শমূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করতে হবে। অর্জিত অন্তর্র্বতীকালীন নীতিমালার ঐকমত্য আগামী দিনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক টানাপড়েন থেকে মুক্ত থাকতে হবে। নীতিগুচ্ছটি ক্ষিপ্রতা ও দক্ষতার সাথে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নেতৃত্বে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং অন্তর্র্বতীকালীন নীতি সমঝোতার সাথে তথ্যভিত্তিক জবাবদিহিতার কাঠামো প্রয়োজন হবে বলে তার পরামর্শ।

কৃষিসহ সার্বিক বিশ্লেষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, আমনের দিকে মনোযোগ দিন। খরা ও বন্যার কারণে এ বছর আমন ধানের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি খাদ্যনিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। কারণ আমন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রধান ফসল। ডিজেল ও সারসহ কৃষি উপকরণের খরচ কমানো কৃষকদের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য হবে। তিনি বলেন, পশুখামার এবং মৎস্যচাষের খাতগত বৃদ্ধির হার কমছে। এই খাতগুলোকে আরো সমর্থন পাওয়া উচিত। অভিবাসী শ্রমিকদের মসৃণ বহিঃপ্রবাহ নতুন, তেমন নতুন নয়। এখন ঐতিহ্যবাহী বাজারে কার্যকর মনোযোগ দেয়া উচিত। পাশাপাশি মজুরি সমন্বয় না হলে শিল্পশ্রমিকদের, বিশেষ করে আরএমজি কর্মীদের মহার্ঘ্য ভাতা প্রয়োজন হবে (যা জানুয়ারি ২০১৯ থেকে অপরিবর্তিত)। তিনি বলেন, অনানুষ্ঠানিক সেক্টরে ছাঁটাই পর্যবেক্ষণ করুন এবং এককালীন লক্ষ্যযুক্ত নগদ প্রণোদনা বিবেচনা করুন। অনানুষ্ঠানিক সেক্টরের শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষার জন্য অভিবাসনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং টেকসই করতে হবে।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।