অযত্ন-অবহেলায় বীরপ্রতীক হারুন অর রশিদের কবর

28

আরিফ হাসান, হিজলগাড়ী:
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী মরণোত্তর বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা হারুন অর রশিদের সমাধিস্থল স্বাধীনতার ৫০ বছর পরেও অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। যেন দেখার কেউ নেই। স্বাধীনতা কিংবা বিজয়ের মাস আসলেই স্থানীয় কয়েকজন যুবক কবরস্থানের আগাছা পরিস্কার করলেও স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে কবরটি সরকারিভাবে পাকাকরণ কিংবা সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। তাই হতাশ তার সহযোদ্ধারাসহ এলাকাবাসী। মুজিববর্ষের বীরপ্রতীক হারুন অর রশিদের করবটি পাকাকরণ করে স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণের দাবি এখন এলাকার সবার।
জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের রাঙ্গিয়ারপোতা গ্রামে ১৯৪৮ সালে জন্মগ্রহণ করেন বীরপ্রতীক হারুন অর রশিদ। তার পিতার নাম আমদ আলী মন্ডল ও মাতার নাম বিরাজ খাতুন। ৭ই মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ছাত্রাবস্থায় সক্রিয় রাজনীতির সাথে যুক্ত হারুন অর রশিদ ছিলেন ডানপিটে ও সাহসী। তিনি এই অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সাব উইং কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা ওসমান আলীর সাথে যোগ দিয়ে ভারতের মাজদিয়াসহ বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজ এলাকায় ফিরে আসেন। এলাকায় ফিরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সাথে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কমান্ডার ওসমান আলীর নেত্বেতে বিষখালী যুদ্ধে চরম সাহসীকতার পরিচয় দেন তিনি। কিন্তু সেই সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সমরাস্ত্র শেষ হওয়ার কারণে সেখান থেকে পিছু হটে ভারতের গেদে চলে যান। পরবর্তীতে এলাকায় ফিরে এসে আবারও তারা সুসংগঠিত হয়। ২৭ শে অক্টোবর বেগমপুর কলোনী বাজার সংলগ্ন স্থান বর্তমানে যেখানে বেগমপুর পুলিশ ক্যাম্প অবস্থিত সেখানে পাকবাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণ করার প্রস্তুতি নেন। এসময় কমান্ডার ওসমান আলী সকল মুক্তিযোদ্ধাদের তার নিদের্শনা মানার জন্য বললেও ডানপিটে হারুন অর রশিদ এক পাকিস্তানী সৈন্য দেখা মাত্রই গুলি করে দেয়। এতেই শুরু হয়ে যায় তুমুল সংষর্ঘ। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে ৪জন পাকিস্তানী সৈন্য নিহত হলেও ঘটনাস্থলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে হারুন অর রশিদ। সহযোদ্ধারা তাকে উদ্ধার করে সেখান থেকে পিছু হটে যদুপুর গ্রামে চলে আসে। গুলিবিদ্ধ হারুন অর রশিদকে বেগমপুর গ্রামের জালালের বাড়িতে রেখে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানী বাহিনীর ধাওয়া খেয়ে ভারতে চলে যায়। পরে পাকিস্তানী বাহিনীর ভয়ে গ্রামবাসী হারুন অর রশিদকে অর্ধমৃত অবস্থায় যদপুর করবস্থানে দাফন করে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন বেগমপুর ও তিতুদহ অঞ্চলের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা ওসমান আলী বলেন, ‘ডানপিটে স্বভাবের হারুনের ছিল অসীম সাহসের অধিকারী। তার মধ্যে প্রবল দেশ প্রেম ছিল। যেকোনো মূল্যে দেশ স্বাধীন করতেই হবে এই নেশা তাকে ঠিক মত ঘুমাতেও দিত না। যেহেতু শুরু থেকেই সে আমার সার্বক্ষনিক সঙ্গী ছিল, তাই তাকে খুব কাজ থেকে দেখেছি আমি। দেশের জন্য যে নিজের জীবন দিতেও পিছু পা হয়নি। সেই হারুনের কবরটি দেশ স্বাধীন হলেও সংরক্ষণ করা হলো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘হারুন অর রশিদ আমার বাহিনীর একজন সক্রিয় সদস্য ছিল। কিন্তু ইতিহাস বিকৃত করে তাকে সাব উইং কমান্ডার বলা হয়। প্রকৃত পক্ষে মুক্তিযুদ্ধ আনুষ্ঠানিক রুপ পেলে আমি ৮নং সেক্টরের সাব উইং কমান্ডার নিযুক্ত হয়।’ তিনি মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার জন্য ও বীরপ্রতীক হারুন অর রশিদের কবরটি পাকাকরণ করে স্মৃতিচিহ্ন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানান।
বৃহত্তর বেগমপুর ও তিতুদহ ইউনিয়নে ইতিহাস ঐহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ শেকড়-এর সভাপতি শামীম হোসেন মিজি বলেন, ‘দেশের জন্য হারুন অর রশিদ জীবন উৎসর্গ করলেও স্বাধীনতার এত বছর পরও তার কবর এখন বাঁশবাগানে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। তার কবরটি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, যা সত্যিই খুব দুঃখজনক। আমাদের জোর দাবি যাতে দ্রুত বীরপ্রতীক হারুন অর রশিদের করবটি পাকাকরণ করা হয়।’