অব্যবস্থাপনায় জেলাজুড়ে সংক্রমণ বিস্ফোরোণের শঙ্কা!

95

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের করোনা ইউনিটে রোগীর স্বজনদের অবাধ চলাচল
* হাসপাতালের সবুজ এলাকাতেও অগোছালো চিত্র
* গাদাগাদি করে করোনার নমুনা পরীক্ষা
* জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের অজ্ঞতা ও অপারগতা
* স্বাস্থ্য বিভাগ সচেতন হলে মানুষ এই সংকটের মধ্যে পড়ত না’
নিজস্ব প্রতিবেদক:
তীব্র ছোঁয়াচে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে গোটা জেলাজুড়ে। এই ভাইরাসে আক্রান্তদের থাকতে হয় আইসোলেশনে। আক্রান্ত না হলেও শরীরে উপসর্গ থাকলে তাদেরকে থাকতে হবে কোয়ারেন্টাইনে। ঠিক সেই মহামারি সময়ে চিকিৎসা ক্ষেত্রে এ জেলার মানুষের বড় ভরসার জায়গা চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল। তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে সদর হাসপাতালের ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট ডেডিকেটেড করোনা ইউনিটে। সেখানে অবাধে চলাচল করছে করোনা আক্রান্ত হয়ে আইসোলেনে ও উপসর্গ নিয়ে ইয়োলো জোনে থাকা চিকিৎসাধীন রোগীর স্বজনেরা। রোগীর স্বজনদের অবাধ বিচরণের কারণে হাসপাতালসহ পুরো জেলাজুড়ে ঘটতে পারে সংক্রমণের বিস্ফোরণ, এমনটাই মনে করছেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। তবে রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের চরম অব্যবস্থাপনার কারণে করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন রোগীর সঠিক পরিচর্যার জন্য তাঁদের হাসপাতালে বাধ্য হয়েই আসতে হচ্ছে। করোনা ইউনিটে প্রয়োজনে চিকিৎসক-নার্স পাচ্ছেন না রোগীরা, তাই ভরসা কেবল সঙ্গে থাকা স্বজনরায়।
গতকাল শনিবার সদর হাসপাতালের করোনা ইউনিটে সরেজমিনে দেখা গেছে, ‘করোনা ইউনিটের চতুর্থ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে দেড় শতাধিক রোগী। তবে তাঁদের পরিচর্যায় রয়েছে তিনশর অধিক স্বজন। স্বজনদের সঙ্গে থাকা শিশুর সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। রোগীর স্বজনেরা সম্পূর্ণ অবাধে করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন থাকা রোগীর কক্ষের ভেতরে ঢুকছেন, বের হচ্ছেন। কেউবা ওষুধসহ জরুরি প্রয়োজনে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, মিশে যাচ্ছেন শহরের লোকজনের ভিড়ে। এদের মধ্যে আবার কেউ কেউ হাসপাতালের বাইরের বিভিন্ন দোকান থেকে কিনছেন খাবার, কেউ বা দোকানেই বসে খাচ্ছেন। ফলে হাসপাতাল থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। করোনা ইউনিটের সামনে চারজন আনসার সদস্যকে দেখা গেলেও, রোগীর স্বজনদের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ অপারগ তাঁরা।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে হাসপাতালের ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট ডেডিকেটেড করোনা ইউনিটে প্রতিদিন গড়ে ১৬০ থেকে ১৮০ জন চিকিৎসা নিচ্ছে। আর এই বিপুল সংখ্যক রোগীদের চিকিৎসাসেবায় সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকছে মাত্র দুজন চিকিৎসক, পাঁচজন নার্স, পাঁচজন স্বেচ্ছাসেবক ও দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। করোনা ইউনিটে করোনাবিষয়ক সচেতনতা সৃষ্টিতে হাসপাতালের অর্ধদিন কাজ করছে চারজন আনসার সদস্য।
অন্যদিকে, সম্পূর্ণ অগোছালো চিত্র দেখা গেছে হাসপাতালের সবুজ এলাকা সাধারণ ওয়ার্ড, ফ্লু কর্নার, বর্হিঃবিভাগসহ কোভিড টিকাদান কেন্দ্র ও কোভিড পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্রেও। কোথাও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বা শারীরিক দূরত্ব মেনে চলার প্রবণতা দেখা যায়নি। অনেকেই দীর্ঘ লাইনে গাদাগাদি করে করোনা পরীক্ষার নমুনা দিতে আসছেন। তাদের অনেকের মাঝেই রয়েছে উপসর্গ। কোভিড টিকা কেন্দ্রে দেখা গেছে টিকা গ্রহীতাদের উপচে পড়া ভিড়। হাসপাতালের ফ্লু কর্নারে করোনা উপসর্গ ঠান্ডা, জ্বর নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কেউই মানছে না স্বাস্থ্যবিধি। চিকিৎসকের কক্ষে সবার আগে প্রবেশ করতে একজনের সঙ্গে গাঁ ঘেষে দাঁড়িয়ে অপরজন। এমন চলতে থাকলে সাধারণ রোগে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরাও করোনা সংক্রমিত হবেন। খোদ হাসপাতালের কর্তব্যরত একাধিক চিকিৎসকই স্বীকার করছেন হাসপাতালের অব্যবস্থাপনায় করোনা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকির কথা।
করোনা ইউনিটে অবাধে চলাচলকারী করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রোগীর একাধিক স্বজনেরা জানান, ‘হাসপাতালে জনবল সংকট থাকায় রোগীকে ভর্তি করা থেকে শুরু করে যাবতীয় তত্ত্বাবধায়নে থাকছেন তাঁরা। রোগীর খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে করে ওষুধপত্র এবং চিকিৎসার বিভিন্ন বিষয়ও দেখাশোনা করতে হচ্ছে তাদের। ফলে রোগীর স্বজনদেরকে করোনা ইউনিটে চলাফেরা করতে হচ্ছে হরহামেশাই।’
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই করোনাভাইরাসের বিস্ফোরণ ঘটবে জেলাজুড়ে। মূলত রোগীর স্বজনদের অসচেতনতা ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনায় এই ঝুঁকির কারণ। সম্প্রতি জেলায় করোনা আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা এবং প্রতিদিন নতুন শনাক্তের সংখ্যায় যার প্রমাণ মিলেছে।
এই পরিস্থিতিতে সংক্রমণ ঝুঁকির শঙ্কার কথা জানিয়েছে সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. এ এস এম ফাতেহ আকরাম বলেন, ‘করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে শয্যা সংখ্যার থেকেও বেশি রোগী চিকিৎসাধীন থাকছে। রোগী ও তাদের স্বজনদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে হাসপাতালে প্রবেশের নির্দেশনা দেওয়া থাকলেও কেউ তা মানছে না। হাসপাতালে জনবল সংকট থাকায় লোকজনকে কিছুতেই এই নির্দেশনা মানানো যাচ্ছে না। আমরা চিকিৎসকেরা স্বাধ্যমত রোগীদেরকে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি। লকডাউনের মধ্যেও হাসপতালে ইজিবাইকে ভড়ে যাচ্ছে। আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা, জীবননগরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীর স্বজনেরা খাবার নিয়ে হাসপাতালে চলে আসছে। করোনা মহামারির এই ভয়াবহ অবস্থাতে চিকিৎসকেরাও আতঙ্কে রয়েছে। করোনা মহামারি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধিরা প্রথম থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের চলাচল সংরক্ষিত করার বিষয়ে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধিদেরকে জানানো হয়েছে। আশা করছি অতিদ্রুত এই সমস্যার একটি সমাধান হবে।’