চুয়াডাঙ্গা রবিবার , ২৭ ডিসেম্বর ২০২০
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অপহরণের ৮ দিন পর আমবাগানে মিলল কিশোরের লাশ

সমীকরণ প্রতিবেদন
ডিসেম্বর ২৭, ২০২০ ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

পাঁচ লাখ টাকার জন্য হত্যা, অপহরণকারী চক্রের মূলহোতাসহ গ্রেপ্তার ৪
দর্শনা অফিস/প্রতিবেদক, হিজলগাড়ী:
চুয়াডাঙ্গায় অপহরণের ৮ দিন পর উদ্ধার হলো কিশোর সাকিলের (১৫) লাশ। গতকাল শনিবার দুপুরে সদর উপজেলার যদুপুর গ্রামের একটি আমবাগান থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত সাকিল যদুপুর গ্রামের সৌদি প্রবাসী আবদুল কুদ্দুসের ছেলে। সাকিলকে অপহরণের পর চক্রটি তার পরিবারের কাছে মুক্তিপণ বাবদ মোবাইল ফোনে পাঁচ লাখ টাকা দাবি করে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তঃজেলা অপহরণকারী চক্রের মূল হোতাসহ হত্যাকারীদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে চারজনকে আটক করেছে দর্শনা থানার পুলিশ। আটককৃতরা হলেন- কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর থানার কামিরহাট ক্যানেলপাড়ার কুদ্দুস মণ্ডলের ছেলে রাজিব মণ্ডল (২৪), যশোর জেলার শার্শা থানার উলাশী গ্রামের ইমান আলীর ছেলে আকাশ (২৫), একই গ্রামের ওমর আলীর ছেলে শোয়েব (১৯) ও যদুপুর গ্রামের আক্রাম বকাউলের ছেলে ইদ্রিস আলী (৪৫)।
পুলিশ জানায়, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের যদুপুর গ্রামের সৌদি প্রবাসী আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে সাকিল গত ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে বাড়ি থেকে বের হয়। এরপর রাত গভীর হলেও সে বাড়িতে না আসায় পরিবারের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে শুরু করে। পরদিন সকাল ৯টার দিকে অপরিচিতি একটি মোবাইল নম্বর থেকে সৌদি প্রবাসী কুদ্দুস আলীর কাছে কল করে তাঁর ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে জানিয়ে ৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারী চক্র। বিষয়টি জানতে পেরে সাকিলের পিতা বিদেশ থেকে মা শেফালী বেগমকে জানায়। পরদিন ২০ ডিসেম্বর মা শেফালী বেগম দর্শনা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। যার নম্বর ৭৬৬। এরপর থেকেই দর্শনা থানার পুলিশ অপহৃত সাকিলকে উদ্ধারের জন্য মাঠে নামে। সাকিবের মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে যশোরের শার্শা থানা এলাকা হতে অপহরণের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর থানার কামিরহাট ক্যানেল পাড়ার কুদ্দুস মণ্ডলের ছেলে রাজিব মণ্ডল (২৪), যশোর জেলার শার্শা থানার উলাশী গ্রামের ইমান আলীর ছেলে আকাশ (২৫) ও একই গ্রামের ওমর আলীর ছেলে শোয়েবকে (১৯) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের কাছ থেকে অপহৃত সাকিলের মোবাইল ফোনটিও উদ্ধার করতে সক্ষম হয় পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা পুলিশকে জানায় সাকিলকে অপহরণ করে ঢাকার টঙ্গী এলাকায় রাখা হয়েছে। তাঁদের দেওয়া তথ্যমতে দর্শনা থানা পুলিশের এসআই সাইফুল ইসলাম ও এসআই আহাম্মেদ ফোর্স নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। তবে সেখানে গিয়ে সাকিলের কোনো সন্ধান পায়নি পুলিশ। পরে গ্রেপ্তারকৃত আসামি রাজিব পুলিশকে জানায় সাকিলকে মেরে ফেলা হয়েছে। পরে গ্রেপ্তারকৃতরা পুলিশের নিকট স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আরও বলে, অপহরণের ২ ঘণ্টা পর ওই রাতেই সাকিলকে কোমলপানির সঙ্গে ২০টি ঘুমের ট্যাবলেট মিশিয়ে পান করিয়ে অজ্ঞান করে রাখা হয়। এরপর তারই পরিহিত গেঞ্জি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে যদুপুর গ্রামের নতুন মসজিদের অদূরের মোল্লাদের আমবাগানের মধ্যে কেটে নেওয়া গাছের গর্তে ফেলে আমের শুকনো পাতা ও খড়ি দিয়ে লাশ ঢেকে রেখেছে তাঁরা। স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তৎক্ষণিক দর্শনা থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) মাহবুবুর রহমান কাজল ও ওসি (তদন্ত) শেখ মাহবুর রহমান দ্রুত ফোর্স নিয়ে যদপুর গ্রামে ছুটে যান। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলে পৌঁছান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দামুড়হুদা সার্কেল) আবু রাসেল। গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী উক্ত স্থান থেকে সাকিলের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। একই সময় অপহরণকারী ও হত্যাকারীদের নিজ বাড়িতে আশ্রয় দেওয়ায় পুলিশ সুমনের পিতা সিদ্দিককে (৪৫) আটক করে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, ৬ মাস আগে যদুপুর গ্রামের সিদ্দিক আলীর ছেলে সুমনের সঙ্গে একই গ্রামের আ. কুদ্দুসের ছেলে সাকিল মাগুরায় রাজমিস্ত্রীর যোগালের কাজ করত। সেখানে তাদের সঙ্গে পরিচয় হয় কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর থানার কামিরহাট ক্যানেল পাড়ার কুদ্দুস মণ্ডলের ছেলে রাজিব মণ্ডলের। সেই পরিচয়ের সূত্র ধরে অপহরণের ৪ দিন আগে রাজিব ও শাকিব সুমনের বাড়িতে বেড়াতে আসে। ৪ দিন সে সুমনদের বাড়িতেই অবস্থান করে ১৯ তারিখ সকালের দিকে নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্য বিদায় নিয়ে চলে যায়। সুমন তাকে উথলী পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে। কিন্ত একই দিন সন্ধ্যার দিকে গ্রামের কয়েকজন রাজিবকে নতুন মসজিদের সামনে ঘোরাঘুরি করতে দেখে। তার কিছুক্ষণ পরেই সন্ধ্যা ৬টার দিকে সাকিল মোবাইলে কথা বলতে বলতে নতুন মসজিদের দিকে যায়। এরপর থেকেই তাকে আর কোথায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা আরও বলেন, এ হত্যাটি একটি রহস্যজনক। অপহরণকারীরা যদি মুক্তিপণ আদায়ের জন্য অপহরণ করে, তাহলে মুক্তিপণ নেওয়ার আগেই তাকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নিল কীভাবে। এ হত্যার সঙ্গে কি অন্য কোনো সূত্র রয়েছে, এমই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে এলাকাবাসীর মনে। তবে আসামি যখন আটক হয়েছে, পুলিশের তদন্তে এ হত্যার পিছনে হয়ত আরও কোনো নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
এ বিষয়ে দর্শনা থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) মাহবুবুর রহমান কাজল বলেন, এটি একটি দুঃখজনক ঘটনা। আসামিদের ভাস্যমতে ধারণা করা হচ্ছে অপহরণের পর মুক্তিপণের জন্যই সাকিলকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া আসামিদের কয়েক দফায় জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এ হত্যার সঙ্গে অন্য কোনো সূত্র আছে কি না, তা এখনই বলা সম্ভব হচ্ছে না। এ ঘটনায় আন্তঃজেলা অপহরণকারী চক্রের মূলহোতা রাজিব, তাঁর দুই সহযোগীসহ আশ্রয়দাতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দামুড়হুদা সার্কেল) আবু রাসেল জানান, সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে। এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত হত্যার শিকার সাকিলের চাচা আব্দুস সালাম বাদী হয়ে দর্শনা থানায় মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।