চুয়াডাঙ্গা সোমবার , ১৫ নভেম্বর ২০২১
আজকের সর্বশেষ সবখবর

অনলাইন জুয়াতে মেহেরপুরে দিনে ৫ কোটি টাকার লেনদেন

অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে চুয়াডাঙ্গায় নগদের অফিসে সিআইডির অভিযানের পর মিলল বিষ্ফোরক তথ্য
সমীকরণ প্রতিবেদন
নভেম্বর ১৫, ২০২১ ৯:৩৪ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

বেটিং সাইটে ৬০-৭০ জন এজেন্টের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে সিআইডি, চুয়াডাঙ্গা- মেহেরপুরের ৫ জনসহ গ্রেপ্তার ৯
সমীকরণ প্রতিবেদন:
চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, আইপিএল, বিগব্যাশ, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচগুলোতে চলে অনলাইনে জুয়ার আসর। রাশিয়া থেকে পরিচালিত হয় এ জুয়ার আসর, যাতে আসক্ত হচ্ছে বাংলাদেশীরা। জুয়া খেলার জন্য একজন জুয়াড়ি মোবাইল নম্বর বা ইমেইলের মাধ্যমে এই ব্যাটিং সাইট বা অ্যাপে অ্যাকাউন্ট খোলেন। ওই অ্যাকাউন্টের বিপরীতে একটি ই-ওয়ালেট তৈরি করে ব্যালান্স যোগ করা হয়। জুয়ার নামে এভাবে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার লেনদেন হয়। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, অনলাইন জুয়ার মাধ্যমে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরসহ দেশের কয়েকটি সীমান্তবর্তী জেলায় প্রতিদিন অন্তত ৩-৫ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের তথ্য পেয়েছে সিআইডি। তদন্ত সংস্থাটি জানিয়েছে, জুয়ার টাকা লেনদেনে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সুবিধা নিতো চক্রটি। এসব অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হতো বলেও ধারণা তাদের। গতকাল রোববার দুপুরে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।
ডিআইজি বলেন, একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ‘ওয়ানএক্সবেটবিডি ডটকম’ নামের একটি বেটিং সাইটের সন্ধান পাই। রাশিয়া থেকে সাইটটি পরিচালিত হলেও বাংলাদেশেও এর এজেন্ট রয়েছে। ৯ এজেন্টকে ইতঃমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গত শনিবার (১৩ নভেম্বর) দেশের সীমান্তবর্তী জেলা মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- মেহেরপুরের স্বপন মাহমুদ (২৭), নাজমুল হক (২১), আসলাম উদ্দিন (৩৫), মুরশিদ লিপু (২৫), চুয়াডাঙ্গার শিশির মোল্লা (২১) ও কক্সবাজারের মাহফুজুর রহমান নবাব, তাঁর স্ত্রী মনিরা আক্তার মিলি (২৪), সাদিক এবং মাসুদ রানা (২০)। এদের মধ্যে মাহফুজুর রহমান নবাব মেহেরপুর জেলার মূল নিয়ন্ত্রক। তাঁর অধীনে অন্তত ১২-১৩ জন এজেন্ট রয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ১৬টি মোবাইল ফোনসেট, তিনটি মোবাইল সিম, একটি ল্যাপটপ, একটি প্রাইভেটকার ও নগদ চার লাখ ১০ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
গতকাল রোববার দুপুরে সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি কামরুল আহসান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ব্যাটিং সাইটটি মূলত রাশিয়া থেকে পরিচালিত হয়। চলমান টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ, আইপিএল, বিগবস ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ইত্যাদি জুয়া খেলার জন্য একজন জুয়াড়ি প্রথমে মোবাইল নম্বরের মাধ্যমে এই সাইটে অ্যাকাউন্ট ওপেন করেন। ওই সময়ে অ্যাকাউন্টের বিপরীতে একটি ই-ওয়ালেট তৈরি করে ব্যালান্স যোগ করা হয়। ব্যালান্স যোগ করার জন্য অনেক মাধ্যম থাকলেও তার মধ্যে ‘নগদ’ অন্যতম।
সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, একটি ‘নগদ’ এজেন্ট সিমসহ মো. স্বপন মাহমুদ এবং আরেকটি নগদ এজেন্ট সিমসহ মোরশেদ আলম লিপুকে আটক করা হয়। আটক স্বপনকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি ওই সিমটি আসলাম উদ্দিনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে জুয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। সিম দেয়া বাবদ তিনি আসলামকে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতেন। আর এজেন্ট সিমে আসা টাকার লেনদেন এবং ব্যবসা করার কাজে সরাসরি সহযোগিতা করেন নগদের এসআর এবং ডিপোর ম্যানেজার।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গ্রেপ্তার মুরশিদ আলম লিপুকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি তার বোন জামাইয়ের একটি ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে সেখানকার নগদের এসআর এবং ডিপোর ম্যানেজারের সহায়তায় এজেন্ট সিমটি সংগ্রহ করে এই জুয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন। তাদের দেয়া তথ্য মতে মেহেরপুর জেলার নগদের কয়েকজন এসআর এবং সেখানকার ডিপোর তাদের এই কাজের সাথে সরাসরি জড়িত।
কামরুল আহসান বলেন, আরেকটি এজেন্ট সিমসহ মাহাবুবুর রহমান নবাবকে কক্সবাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার সাথে সেখান থেকে এই জুয়ার কাজে সহযোগী সাদিক ও মাসুম রানা এবং নবাবের স্ত্রী মনিরা আক্তার মিলিকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাহফুজুর রহমান নবাবকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি নিজের একটি জুয়ার এজেন্ট সিম চালান। তার এলাকায় তিনি প্রথম এই কাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে তার রেফারেন্সে আরো বহু জুয়ার এজেন্ট যুক্ত হয়। তার সহায়তাকারী এজেন্ট নম্বরে যে টাকা আসত তা জুয়ার ওয়েবসাইটে ডিপোজিট এবং উইথড্র করার কাজটি করতেন আটক সাদিক।
সিআইডি বলছে, আটক মাসুম রানা তার নামের নম্বর দিয়ে টেলিগ্রাম আইডি খুলে জুয়ার লোকজনদের সাথে যোগাযোগ করতেন এবং বিনিময়ে তিনি এজেন্টদের কাছ থেকে কমিশন পেতেন। জুয়ার কাজে জড়িত থাকায় নবাব বাসা থেকে বের হতে পারতেন না বা কোথাও যেতে পারতেন না। তাই নবাবের স্ত্রী মনিরা আক্তার মিলি টাকা সংগ্রহ করে ব্যাংকে টাকা জমা দেয়াসহ বাইরের সব কাজ করতেন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা সবাই জানিয়েছেন লেনদেনের কাজে ব্যবহৃত প্রতিটি এজেন্ট সিমই সেখানকার নগদের এস.আরের মাধ্যমে ট্রানজেকশন করেন।
সিআইডি কর্মকর্তা কামরুল আহসান বলেন, জুয়ার সাথে জড়িত এস.আর কর্মকর্তারা এই জুয়ার এজেন্টদের সাথে সরাসরি অবৈধ লেনদেনে জড়িত এবং এর বিনিময়ে জুয়ার এজেন্টদের কাছ থেকে প্রতিটি লেনদেনের কমিশন পেতেন। অনেক সময় জুয়ার এজেন্ট এবং এস.আরের মধ্যে বিটুবির মাধ্যমে লেনদেন হলেও তাদের মধ্যে শারীরিক কোনো লেনদেন হতো না। গ্রেপ্তার মোরশেদ আলম লিপু গত ৭ নভেম্বর তার ব্যবহৃত সিম এজেন্ট থেকে সেখানকার এস.আরের নম্বরে বিটুবির মাধ্যমে ৯ লাখ ৪৯ হাজার টাকা এস.আরকে পাঠায়, যা নগদায়ন হয়নি।
সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, জুয়ার এজেন্টরা ওয়ানএক্স বেটবিডি ডটকম নামের ব্যাটিং সাইট সব কাজ ম্যানেজমেন্ট ডটআইটু নামের ওয়েবসাইট, টেলিগ্রাম ও রেডি নামের একটি অ্যাপসের মাধ্যমে করে। স্বপনের ব্যবহৃত জব্দকৃত এজেন্ট সিমে প্রতিদিন সাত থেকে আট লাখ টাকা এবং লিপুর ব্যবহৃত এজেন্ট সিম থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ টাকার লেনদেন হতো, নবাবের ব্যবহৃত জব্দকৃত এজেন্ট সিম থেকে প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকার লেনদেন হতো।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিশেষ পুলিশ সুপার আশরাফুল আলম, বিশেষ পুলিশ সুপার মোহাম্মদ রেজাউল মাসুদ এবং অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আজাদ রহমান।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ১০ নভেম্বর চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলার মোবাইল ব্যাংকিং সেবা নগদের ডিস্ট্রিবিউটর স্বর্ণ ব্যবসায়ী রিপনুল হাসানের অর্ন্তগত নগদ এজেন্টদের কয়েকটি অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগে সিআইডির একটি টিম অভিযান পরিচালনা করে ও দুজনকে আটক করে নিয়ে যায়। ওইদিনই রাতেই ঢাকা থেকে আসা সিআইডির ওই টিমটি নগদের ডিস্ট্রিবিউটর স্বর্ণ ব্যবসায়ী রিপনুল হাসানের বাড়িতেও অভিযান চালায়।

দৈনিক সময়ের সমীকরণ সংবিধান, আইন ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য অপসারণ করার ক্ষমতা রাখে।