60

বিদেশে অবৈধ ১০ লাখ বাংলাদেশি
কারাগার-ডিটেনশন সেন্টারের বন্দী জীবনে ৮৮৪৮ জন, দীর্ঘ ভেরিফিকেশনের চক্করে আরও ২ হাজার, ট্রাভেল পারমিট বন্ধের সুপারিশে উদ্বেগ
সমীকরণ প্রতিবেদন:
বিশ্বের ৫০টির বেশি দেশে কাগজপত্রহীন অবস্থায় অবৈধভাবে অবস্থান করছেন কমপক্ষে ১০ লাখ বাংলাদেশি। সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও জনশক্তি বাজার ও অভিবাসন-সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। এর বেশির ভাগেরই অবশ্য ভিসার মেয়াদ উত্তীর্ণ বা ভিন্ন পদ্ধতিতে ওসব দেশে গিয়ে অবৈধভাবে অবস্থান করছেন। এসব বাংলাদেশি মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, আরব আমিরাতের মতো শ্রমঘন দেশগুলোয় যেমন আছেন, তেমনি আছেন উন্নত বিশ্ব হিসেবে পরিচিত ইউরোপ-আমেরিকায়ও। অবৈধ অবস্থানসহ বিভিন্ন অপরাধে সম্পৃক্ততার জন্য বিদেশের কারাগারে বন্দী ৮ হাজার ৮৪৮ জনের তথ্য আছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। প্রবাসী বাংলাদেশি, জনশক্তি বাজার ও অভিবাসন-সংশ্লিষ্টদের তথ্যানুসারে উন্নত বিশ্ব হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতেই অবৈধভাবে অবস্থান করছেন ২ লাখের বেশি বাংলাদেশি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ১০ লাখ অবৈধ অভিবাসীকে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তও ভাবিয়ে তুলেছে সেখানে থাকা বাংলাদেশিদের। ইউরোপে শুধু স্পেনে বিভিন্ন কারণে অবৈধ হয়ে পড়েছেন প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি। মালয়েশিয়ায় প্রায় ৩ লাখ বাংলাদেশি যে কোনো মুহূর্তে গ্রেফতারের আতঙ্কে থাকেন।
গত বুধবার মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে নিরাপত্তাবাহিনীর অভিযানে ৪৪ অবৈধ বাংলাদেশি আটক হন। ৭ জুলাই মালয়েশিয়ার সেপাং নদীর ১০০ মিটার ভিতরে জঙ্গলে অভিযান চালিয়ে ৩৩ বাংলাদেশিকে আটক করে দেশটির পুলিশ। গত চার মাসে আটকের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। সৌদি আরবে কাজ হারানো ও গ্রেফতার হয়ে দেশে ফেরার শঙ্কা আছে ২ লক্ষাধিক বাংলাদেশির। মূলত সৌদি আরবে সরকারি ও বেসরকারি খাতের ১২ পেশায় প্রবাসীদের কাজ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় এসব পেশায় কর্মরত বৈধ প্রবাসী শ্রমিকদেরও ইকামা (বসবাসের অনুমতিপত্র) নবায়ন করা হচ্ছে না। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে থাকা বৈধ প্রবাসীরাও অবৈধ হয়ে পড়ছেন। বাহরাইনে থাকা ২ লাখ বাংলাদেশির মধ্যে বিভিন্ন কারণে প্রায় ৭০ হাজার শ্রমিক অবৈধ হয়ে পড়েছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশি শ্রমিকের বাহরাইনের ইমাম হত্যার পর থেকেই সেখানে থাকা অবৈধ বাংলাদেশিদের আটক শুরু করে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গত আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৭৬৬ জন বাংলাদেশি শ্রমিককে দেশে পাঠিয়েছে বাহরাইন সরকার। ওমানে থাকা ৮ লাখের মতো বাংলাদেশির প্রায় অর্ধেকই দেশটিতে পাড়ি দিয়েছেন কথিত ফ্রি ভিসায়। অনেকেই আবার দালালের মাধ্যমে দেশটিতে গেছেন অবৈধভাবে। আবার কিছু বাংলাদেশি আছেন যারা বৈধভাবে গেলেও চুক্তি অনুযায়ী কম বেতন পাওয়া এবং মাস শেষে বেতন না পাওয়ার কারণে মালিকের কাছ থেকে পালিয়ে অবৈধ হয়ে কাজ করছেন।
প্রায়ই পুলিশের হাতে আটক হচ্ছেন তারা। গ্রেফতার আতঙ্কে রয়েছেন কাতারপ্রবাসীরাও। সেখানে প্রায়ই চলছে অবৈধ শ্রমিক গ্রেফতার অভিযান। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অবৈধভাবে বসবাসরত ৯৩ হাজার বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার চাপ কঠোর থেকে কঠোরতর করার চেষ্টা করছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। বিপৎসংকুল জেনেও ইউরোপে যাওয়ার পথ হিসেবে লিবিয়া, তিউনিসিয়াকে বেছে নেওয়া কয়েক হাজার ভাগ্যান্বেষী রয়েছেন চতুর্মুখী শঙ্কায়। যুক্তরাজ্যে অভিবাসন আইন নিয়ে কাজ করা ইসমাইল মিয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অবৈধ পথে অদক্ষ কর্মীদের প্রতারণার মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর পথ ধীরে ধীরে রুদ্ধ হয়ে আসছে। এদের সবাই যে অবৈধ পথে বা মানব পাচারের শিকার হয়ে অবৈধ হয়েছেন তা নয়, বেশির ভাগই ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় আনডকুমেন্টেড হয়েছেন। শ্রমঘন দেশগুলোয় সাধারণ ক্ষমার আওতায় বিভিন্ন সময়ে বিশেষ সুযোগ পাওয়া গেলেও বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে উন্নত রাষ্ট্রগুলোয় অবৈধভাবে অবস্থানের সুযোগ কমে আসছে। এ কারণে বিশালসংখ্যক এই অভিবাসী বাংলাদেশিকে থাকতে হচ্ছে অনিশ্চয়তায়।’
মালয়েশিয়াপ্রবাসী ফাহিম ইসলাম গতকাল বলেন, ‘কেউ শখ করে বিদেশে দিয়ে অবৈধ হয় না। বিভিন্ন কারণেই বাধ্য হয়ে অবৈধ হতে হয়। তাই সরকার ও হাইকমিশনের উচিত দুর্দশাগ্রস্ত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো। হাইকমিশনগুলো শুধু শিক্ষিত ও উচ্চ স্তরের মানুষের পাশে থাকবে, অর্ধশিক্ষিক দরিদ্র শ্রেণির জন্য কিছুই করবে না তা যেন না হয়।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন বলেছেন, ‘প্রবাসে বাংলাদেশিদের যে কোনো সংকটে পাশে থাকার প্রত্যয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে। কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদেশের কারাগারে আটক বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রুটিনমাফিক দূতাবাসের সাহায্যে কাজ করে আসছে। দূতাবাস প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রবাসীদের জন্য ট্রাভেল ডকুমেন্ট তৈরি করে দিচ্ছে। অনেক সময় সাজার মেয়াদ কমিয়ে দেওয়া, সাধারণ ক্ষমার সুযোগ নেওয়া অথবা আইনজীবী নিয়োগ করে মামলা পরিচালনা করে আটকদের মুক্তির ব্যবস্থা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিতভাবে করে আসছে।’
কারাগারে-ডিটেনশন সেন্টারে বন্দীজীবন :
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগারে বা ডিটেনশন সেন্টারে ৮ হাজার ৮৪৮ জন বাংলাদেশি আটক আছেন বলে তথ্য আছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এ-সংখ্যক বন্দী বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। এখনো ভেরিফিকেশনের অপেক্ষায় আছেন আরও ২ হাজার। গত বৃহস্পতিবার সংসদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন ৮ হাজার ৮৪৮ জনের তথ্য দিয়েছেন। সংসদে উত্থাপিত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর তালিকা অনুসারে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৪৯ বাংলাদেশি বন্দী রয়েছেন ভারতে। ভারতের কারাগারে বন্দী বাংলাদেশির একটি অংশ এখান থেকে পাচার হওয়া নারী ও শিশু। এ ছাড়া ভারতের সীমান্তরক্ষীসহ অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হওয়ায় বিভিন্ন কারাগারে বন্দী রাখা হয় তাদের। এ ছাড়া সৌদি আরবে ১ হাজার ২৮৯, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১ হাজার ১৫৬, বাহরাইনে ৬৯৩, মালয়েশিয়ায় ৫৭২, ওমানে ৪৪২, কাতারে ৩৫১, কুয়েতে ৩১৬, তুরস্কে ৩০০ ও ইরাকে ২৭৫ জন বাংলাদেশি বন্দী আছেন। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রে ৭৯ ও গ্রিসে ১০৬ জন বাংলাদেশি বন্দী রয়েছেন। আর ইরানে বন্দী ২৫০ জনের মধ্যে ২৩৩ জনকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
ট্রাভেল পারমিট বন্ধের সুপারিশে উদ্বেগ :
বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি বা সন্ত্রাসী যেন ঢুকতে না পারে সেজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া ট্রাভেল পারমিট ইস্যু না করার সুপারিশে উদ্বিগ্ন প্রবাসীরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সুপারিশের বিপরীতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আপত্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রবাসীরা। তারা বলছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে পাসপোর্ট কেড়ে নেয় দালালরা। আবার অনেকেরই পাসপোর্ট হারিয়ে যায়। এ ছাড়া বিদেশে অবৈধভাবে প্রবেশের কারণে কেউ কেউ জেল খেটে দেশে ফিরতে চান। এভাবে অনেক নাগরিকেরই পাসপোর্ট থাকে না। সে কারণে তাদের দেশে ফিরতে ট্রাভেল পারমিট ইস্যু করতে হয়। সেটা নিয়েই প্রবাসীরা দেশে ফিরতে পারেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রাভেল পারমিট ইস্যুতে দীর্ঘসূত্রতার সমস্যার সম্মুখীন হয়ে প্রবাসীরা যেন বিপাকে না পড়েন সেজন্য আপত্তির বিষয় ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আগের মতোই প্রয়োজনে দু-এক দিনেই ট্রাভেল পারমিট পাবেন প্রবাসীরা।