বাজারে মনিটরিং টিম; একাধিক ব্যবসায়ী আটক, জরিমানা

174

চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহসহ সারা দেশে গুজব রটিয়ে লবণ নিয়ে লঙ্কাকা-, লবণ কেনার হিড়িক

গুজবে কান না দিতে জনগণকে আহ্বান জানিয়ে মাইকিং, অস্থিরতা মোকাবিলায় মাঠে সক্রিয় প্রশাসনের একাধিক টিম
সমীকরণ প্রতিবেদন:
পেঁয়াজ, চালের পর এবার লঙ্কাকা- লবণের বাজারে। গুজব ছড়িয়ে তৈরি করা হয়েছে দেশজুড়ে অস্থিরতা। গুজবে কান দিয়ে লবণ কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন ক্রেতারা। একেকজন প্রয়োজনের অতিরিক্ত লবণ কিনে নেওয়ায় দোকানে দোকানে লবণের সংকট দেখা দিয়েছে। যদিও মন্ত্রণালয় এবং বিসিকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে দেশে পর্যাপ্ত লবণ মজুত রয়েছে। গুজবে কান না দিয়ে প্রয়োজনের বেশি লবন না কেনার আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে, অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়ে যাওয়ায় চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, ঝিনাইদহসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বাড়তি দামে লবণ বিক্রি হয়েছে। সর্বোচ্চ ৩৫ টাকা কেজির লবণ ৫০ থেকে ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গতকাল থেকেই সারা দেশে বাজার পর্যবেক্ষণ শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে লবণ নিয়ে গুজবে কান না দিতে জনগণকে আহ্বান জানিয়ে মাইকিং করা হয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা:


‘চাচী তাড়াতাড়ি বাজার থেকে লবণ কিনে আনো। কাল থেকে ২ শ টাকা কেজি হবে, আমরা ৫ কেজি এনিচি। বাজারে গিয়ে যে অবস্থা দেকলাম, ফুরি গেলি পাবা না।’ এভাবেই কোনো এক অজ্ঞাতনামা কন্ঠে শহর থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছিল আশ্চর্য এ খবর। যখন পেঁয়াজের বাজার নিয়ে তটস্থ গোটা দেশ, তখন এমন খবরে বিশ্বাস না করারই বা কি আছে। এমন ধারণা থেকে গতকাল মঙ্গলবার বিকেল থেকে জেলা শহরসহ বিভিন্ন হাট-বাজার ও দোকান-পাসারগুলোতে লবণ কেনার হিড়িক পড়ে যায়। মানুষের মুখে মুখে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সয়লাব হয়ে যায় লবণের দাম বৃদ্ধির খবর। ৩০ টাকা থেকে ৪০-৫০ টাকা, যা রাত ১০টার দিকে ১৫০ এ পৌঁছে বলে খবর রটে। জেলাব্যাপী অনেক ব্যবসায়ী লবণ মজুত করতে থাকেন আরও দাম বৃদ্ধির আশায়। প্রচুর চাহিদা এবং অধিক মুনাফার আশায় মজুতের চেষ্টার কারণে গ্রাহকের চাহিদার তুলনায় লবণ দিতে পারেননি অনেক মুদির দোকানিরা। লবণের বাজারে অস্থিরতা মোকাবিলায় মাঠে নেমেছে প্রশাসনের একাধিক টিম।
চুয়াডাঙ্গা রেলবাজারের মুদি দোকানদার মিণ্টু মিয়া জানান, তিনি দীর্ঘ ব্যবসা জীবনে গতকাল যে পরিমাণ লবণ বিক্রি করেছেন, তা আর কোনো দিন হয়নি। সারা মাসে তাঁর দোকান থেকে ৮০ থেকে ১ শ কেজি লবণ বিক্রি হয়। কিন্তু মঙ্গলবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৬০ কেজি চিকন লবণ ও ৭৫ কেজি মোটা লবণ বিক্রি করেছেন তিনি। তিনি বলেন, হঠাৎ বিকেল থেকে মানুষ দোকানে ভিড় করতে শুরু করেন। ১ কেজি ২ কেজির চাহিদা-সম্পন্ন ক্রেতারা এদিন ৫ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত লবণ কিনে নিয়ে যান।
দাম বৃদ্ধির খবর যাচাই করতে চুয়াডাঙ্গা নিচের বাজার, ফেরিঘাট রোড, রেলবাজার, নতুনবাজারসহ বিভিন্ন হাট-বাজার ও দোকানে খোঁজ নেওয়া হয়। এ সময় অধিকাংশ দোকানেই দাম বৃদ্ধির খবরটি অসত্য বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
চুয়াডাঙ্গা নিচের বাজারের মা ট্রেডার্সের মালিক পলাশ কুমার সাহা বলেন, ‘অন্য দিনের মতোই চিকন লবণ খুচরা ৩২ থেকে ৩৫ এবং পাইকারি ২৮ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। মোটা লবণ বিক্রি হচ্ছে ১৪ থেকে ১৬ টাকা কেজি দরে। এ ছাড়া বেশি দামে লবণ বিক্রি করা হচ্ছে না। কারণ, আমাদের কাছে লবনের পর্যাপ্ত মজুত আছে।’
তবে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা শহরজুড়ে লবণ ক্রেতাদের দোঁড়াদৌঁড়ি দেখা যায়। সাইকেল-মোটরসাইকেল, ভ্যান-ইজিবাইক এমনকি নছিমন-করিমনযোগেও দূর-দুরান্ত থেকে লবণ কিনতে বাজারগুলোতে মানুষের ভিড় জমে। কিছু অতিউৎসাহী মানুষকে চাহিদার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি লবণ কিনতে দেখা গেছে। তবে কীভাবে জানলেন লবণের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে জানতে চাইলে তা বলতে পারেননি কেউ, প্রায় সবাই লোকমুখে শুনেছেন বলে জানান।
তবে এ খবর নেহাতই গুজব আর বানোয়াট বলে নিশ্চিত করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। গুজব থেকে বিরত থাকতে এবং লবণ নিয়ে বিভ্রান্তিতে না পড়তে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করা হয়। এরপরেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামে জেলা প্রশাসন, পুলিশসহ প্রশাসনের একাধিক টিম। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লবণ কিনে নিয়ে যাওয়ার সময় হাতে-নাতে আটক করা হয় ছয়জনকে। জব্দকৃত লবণ ভ্যান বোঝাই করে নেওয়া হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে। তবে আটক ব্যক্তিরা সবাই ক্ষুদ্র মুদি ব্যবসায়ী হওয়ায় খোঁজখবর নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। আর জব্দকৃত প্রায় ২ শ কেজি লবণ নিতে আগামী বৃহস্পতিবার বিকেলে ডিসি অফিসে আসতে বলা হয়েছে তাঁদের।
জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও এনডিসি সিব্বির আহমেদের নেতৃত্বে মনিটরিং টিমে অংশ নেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শিবানী সরকার, ফিরোজ হোসেন, হাবিবুর রহমান, জেলা বাজার কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সজল আহমেদসহ জেলা পুলিশের সদস্যরা।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সিব্বির আহমেদ বলেন, ‘লবণের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এমন একটি গুজব ছড়িয়ে পড়লে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করাসহ বিভিন্নস্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। যদি কেউ এমন গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করে, তবে তাঁকে আইনের আওতায় আনা হবে। এ ধরণের গুজব রোধে প্রশাসন, সাংবাদিক ও সুশীলসমাজের লোকজনকে এগিয়ে আসতে হবে।’
এদিকে, অতিরিক্ত মূল্যে লবণ বিক্রির সময় চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের সামনে ‘ট’ বাজারে ফরহাদ স্টোরকে পাঁচ হাজার টাকা ও হকপাড়ায় সাদিয়ে স্টোরকে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেছেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াশীমুল বারী। লবণের মূল্য বেশি রাখার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁদেরকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে এ জরিমানা করা হয়েছে।
আলমডাঙ্গা:


আলমডাঙ্গায় লবণের মূল্যবৃদ্ধির গুজব তীব্র আকার ধারণ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল থেকে উপজেলা ও পৌর এলাকার বিভিন্ন দোকানে চড়া দামে লবণ বিক্রয় করেন কিছু অসাধু ব্যবসায়ী। খবর পেয়ে উপজেলা প্রশাসন ও আলমডাঙ্গা থানা পুলিশের পক্ষ থেকে গুজবে কেউ কান না দিয়ে এবং অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রয় না করতে নিষেধ করলেও গোপনে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী হরমোশাই লবণ চড়া দামে বিক্রয় করেন। সঙ্গে সঙ্গে আলমডাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন দোকানগুলোতে বাড়তে শুরু করে লবণের মূল্য এবং ক্রেতাদের লবণ কিনতে লম্বা লাইন দেওয়ার মতো সৃষ্টি হয়। গতকাল মঙ্গলবার আলমডাঙ্গার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশিকুর রহমানের নির্দেশে ও বণিক সমিতির সহযোগিতায় পৌর এলাকায় মাইকিং করা হয়। মাইকিং করার হলেও চড়া মূল্যে লবণ বিক্রয়ের ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি)। এ সময় আলমডাঙ্গা উপজেলার মুন্সিগঞ্জ এলাকায় অতিরিক্ত দামে লবণ বিক্রি করার সংবাদ পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাত আটটার দিকে মুন্সিগঞ্জ বাজারে ছুটে যান। সেখানে বাবুল স্টোরে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে লবণ বিক্রির অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন। ভ্রাম্যমাণ আদালতে বাবুল স্টোরের মালিক সিহাব উদ্দীনকে তিন হাজার টাকা জরিমানা ও অনাদায়ে এক মাসের কারাদ- প্রদান করেন।
অন্যদিকে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বেশি দামে লবণ বিক্রির দায়ে আলমডাঙ্গার কালিদাসপুর ব্রিজের নাফিসা স্টোরের মালিক পিণ্টু রহমানকেও ৩ হাজার টাকা জরিমানা অনাদায়ে ১৫ দিনের কারাদ- প্রদান করেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) সীমা শারমিন। পরে তাঁরা জরিমানা দিয়ে মুক্ত হন। ভ্রাম্যমাণ আদালতে উপস্থিত ছিলেন আলমডাঙ্গা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সাহাবুদ্দিন লস্কর, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) তৌহিদুর রহমানসহ সঙ্গীয় ফোর্স।
দামুড়হুদা:
দামুড়হুদায় লবণের দাম বৃদ্ধির গুজবে দোকানে দোকানে লবণ বিক্রির হিড়িক চলছে। দামুড়হুদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মুনিম লিংকনের তড়িৎ পদক্ষেপে বাজার নিয়ন্ত্রণে আসে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে গুজব ছড়িয়ে পড়লে দামুড়হুদা বাজারে লবণ বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। বাড়তি দামে লবণ বিক্রির অভিযোগে দামুড়হুদা বাজারের মুদি ব্যবসায়ী মেসার্স এবি ট্রেডার্সের পরিচালক ময়নাকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে দুই হাজার টাকা জরিমানা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এস এম মুনিম লিংকন।
জানা যায়, লবণের দাম বৃদ্ধি পাবে এমন গুজবে মঙ্গলবার বিকেলে হঠৎ করে বাজারের কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা লবণ বিক্রি বন্ধ করে দেন। আবার অনেকে সুযোগ বুঝে বেশি দামে বিক্রি করতে থাকেন। এ সময় দোকানে দোকানে শত শত ক্রেতা লবণ কেনার জন্য ভিড় জমান। অধিকাংশ ক্রেতা ১ থেকে ১০ কেজি করে লবণ কিনতে থাকেন। লবণের দাম বৃদ্ধির এমন গুজবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তড়িৎ পদক্ষেপ নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন বাজার মনিটরিং শুরু করেন। তিনি বাজারের প্রতি ব্যবসায়ীর কাছে যান ও সবাইকে বেশি দামে বিক্রি না করার জন্য বলেন এবং কাউকে এক কেজির বেশি লবণ না দেওয়ার জন্য বলেন। এ সময় তিনি দামুড়হুদা বাজারে বেশি দামে লবণ বিক্রি করায় জরিমানা করেন। এরপর তিনি বিষয়টি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকুমার বিশ্বাসকে জানালে তিনি উপজেলার সব পুলিশ ফাঁড়িতে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলেন, কেউ যেন বেশি দামে লবণ বিক্রি করতে না পারে ও কোনো ক্রেতার নিকট এক কেজির বেশি লবণ বিক্রি করতে না পারে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলার বিভিন্ন বাজার মনিটরিং করেন ও সব ব্যবসায়ীকে সর্তক করে দেন।
উপজেলার বিভিন্ন বাজার মনিটরিং ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সময় নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে ছিলেন দামুড়হুদা আব্দুল ওদুদ শাহ্ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ কামাল উদ্দিন, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার রাফিজুল ইসলাম, নির্বাহী অফিসের নাজির ওমর ফারুক, নির্বাহী অফিসের টেকনিশায়ান খাইরুল কবির দিনার, অফিস সহকারী রফিকুল ইসলাম প্রমুখ।
দর্শনা:
দর্শনায় চলেছে লবণ সংগ্রহের হিড়িক। লবণ ক্রয়ে মুদি দোকানগুলোই উপচে পড়া ভিড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার পুলিশ ও বিভিন্ন সংগঠনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুর থেকে এ গুজব এক কান থেকে আকের কান হতে হতে বিকেল শেষ না হতেই ব্যাপকভাবে প্রচার হয় দেশে লবন-সংকট দেখা গেছে ও লবনের মূল্য প্রতি কেজি ২ শ টাকা হয়ে যাবে। এ লবণ-সংকটের গুজবে দর্শনার সব গ্রামের মানুষ মুদি দোকানগুলোতে ভিড় শুরু করেন লবণ সংগ্রহের জন্য। দর্শনা দক্ষিণ চাঁদপুর কাঁচা বাজার-সংলগ্ন মুদি দোকান, বাসস্ট্যান্ড মুদি দোকান, রেলবাজার মুদি দোকান, পুরাতন বাজার মুদি দোকানসহ সব গ্রামের মুদি দোকানে লবণ-সংকটের গুজবে লবণ সংগ্রহের জন্য জনগণের ব্যাপক ভিড় লক্ষ করা গেছে। এ সুযোগে কিছু অসাধু মুদি দোকানি খোলা লবন ১৬ টাকা কেজি থাকলেও বিক্রি করেন ৩০ টাকা দরে ও প্যাকেট লবনের মূল্য মোড়কে ৩০-৩৫ টাকা লেখা থাকলেও ৫০-৬০ টাকা দরে বিক্রি করা শুরু করেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে বেশিরভাগ মুদি দোকানের লবন বিক্রি হয়ে যায়। সংবাদ পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, থানার পুলিশ, সংশ্লিষ্ট তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই বেশ কিছু মুদি ব্যবসায়ী তাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে চলে যান। এর আগে পরিস্থিতি বেগতিক হওয়ায় দামুড়হুদা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম রেলবাজারের বিভিন্ন মুদি দোকানে গিয়ে দোকান মালিকদের লবণ বিক্রি করতে নিষেধ করে। একই সাথে দর্শনা রেলবাজার ব্যাবসায়ী কমিটির সভাপতি টিপু সুলতান, সাধারণ সম্পাদক সাবির হোসেন মিকা, দর্শনা পৌর ছাত্রলীগ ও কলেজ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা রেল বাজারের মুদি দোকানগুলি মনিটরিং করেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম মুমিন লিংকন, দামুড়হুদা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকুমার বিশ্বাস ও দর্শনা তদন্ত কেন্দ্রের ওসি শেখ মাহাবুবুর রহমান দর্শনা রেল বাজারের প্রত্যেক মুদি দোকান মনিটরিং করেন এবং সতর্ক করেন।
কার্পাসডাঙ্গা:
দামুড়হুদা উপজেলার কার্পাসডাঙ্গা বাজারে গুজবে কান দিয়ে গতকাল মঙ্গলবার লবণ কেনার হিড়িক পড়েছে। গতকাল মঙ্গলবার এলাকায় গুজব ওঠে লবণের কেজি ১ শ টাকার ওপরে। আর এ গুজবে কান দিয়ে এলাকার লোকজন নেমে পড়েন লবণ কিনতে। দোকানে হিড়িক পড়ে যায় লবণ কেনার। দোকানিরাও সুযোগ বুঝে তাঁদের অবিক্রিত লবণ বিক্রি করতে থাকেন।
জীবননগর:
গুজবে হঠাৎ করেই অতিরিক্ত দামে জীবননগরে লবণ বিক্রি শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় তিন ব্যবসায়ীকে ভোক্তা অধিকার আইনে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জীবননগর শহরের বিভিন্ন মুদি দোকানে এ জরিমানা করা হয়। এ সময় দোকানগুলোতে লবণ কেনার জন্য ক্রেতাদের দীর্ঘলাইন দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা খোলা লবণ প্রতি কেজি ৪০-৬০ টাকা, প্যাকেট লবণ ৫০-১০০টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। খবর পেয়ে শহরে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়। এ সময় মেসার্স ফিরোজ স্টোরের মালিক আশরাফ আলীকে ১০ হাজার টাকা, মেসার্স রফিকুল স্টোরের মালিক মেহেদী হাসানকে ১০ হাজার টাকা ও নাহি স্টোরের মালিক রায়হান নবীকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিরাজুল ইসলাম। জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম ফোর্স নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় সহযোগিতা করেন।
মেহেরপুর:
গুজবে কান দিয়ে মেহেরপুর শহরসহ জেলার প্রতিটি গ্রামে লবণ কেনার জন্য মানুষের মধ্যে হিড়িক পড়ে গিয়েছে। তবে এ গুজব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতায়। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন টিম শহরের বিভিন্ন বাজার পরিদর্শন করেছেন। গত সোমবার থেকে দেশের বিভিন্ন জেলায় লবণ নিয়ে গুজব ছড়ানো শুরু হলে গতকাল মঙ্গলবার মেহেরপুর শহরসহ মেহেরপুর জেলার বিভিন্ন বাজারগুলোতে গুজব ছড়িয়ে পড়ে। বাড়ির গৃহিণী থেকে শুরু করে পরিবারের বিভিন্ন সদস্যরা লবণ কেনার জন্য দোকানে দোকানে ছুটতে থাকেন। সুযোগ বুঝে বেশ কিছু এলাকায় লবণের দাম বেশি নিতে শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। এদিন সন্ধ্যায় মেহেরপুরে জেলা প্রশাসক আতাউল গনি, মেহেরপুরের পুলিশ সুপার এস এম মুরাদ আলী, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক মো. তৌফিকুর রহমান, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদুল আলমের নেতৃত্বে পুলিশ বিভাগের সদস্যরা মেহেরপুর শহরের হোটেল বাজার এবং বড় বাজারে বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাঁরা মানুষজনকে গুজবে কান না দিতে উদ্বুদ্ধ করেন। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মেহেরপুরে লবণের কোনো ঘাটতি নেই।
এদিকে, মেহেরপুর জেলা প্রশাসন ও মেহেরপুর পৌরসভার পক্ষ থেকে মাইকিং করে গুজবে কান না দেওয়ার জন্য জনসাধারণকে আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসক মো. আতাউল গনি কঠোর হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেন, যদি কোনো ব্যবসায়ী কারসাজি করে লবণের দাম বেশি নেওয়ার চেষ্টা করেন, তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে পুলিশ সুপার এস এম মুরাদ আলী বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার লক্ষে কে বা কারা গুজব ছড়াচ্ছে ওই সব গুজবে কেউ কান দেবেন না। জেলা প্রশাসন থেকে জনানো হয়েছে, মেহেরপুর শহরসহ জেলার গ্রাম্য হাট-বাজরসহ বিভিন্ন স্থানে মোবাইল টিম থাকবে।
অপর দিকে, গুজবে কান দিয়ে মেহেরপুর শহরের বেশি দামে লবণ বিক্রি করার দায়ে এক ব্যবসায়ীর নিকট থেকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে মেহেরপুর শহরের গোহাট এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে রানা স্টোরের মালিক আব্দুস সালামের নিকট থেকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। মেহেরপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদুল আলমের নেতৃত্বে শহরের গোহাট এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় সেখানে ৬০ টাকা কেজি দরে লবণ বিক্রি করার দায়ে রানা স্টোরের মালিক আব্দুস সালাম নিকট থেকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।
গাংনী অফিস:
সারা দেশের মতো মেহেরপুরের গাংনীতেও লবণ সংকটের গুজব তুলে খুচরা দোকান থেকে লবণ উধাও হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। আর এ গুজবে কান দিয়ে লবণ কেনার হিড়িক পড়ে বিভিন্ন দোকানে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল থেকে এ খবর ছড়িয়ে পড়লে গাংনী বাজারসহ উপজেলার প্রত্যান্ত গ্রামের দোকানগুলোতেও লবণের দাম বাড়িয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা সাধারণ ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেন। খবর পেয়ে গাংনী উপজেলার প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তারা লবণ সংকটের গুজব ঠেকাতে বাজার মনিটরিং করা শুরু করে। এ সময় তাঁরা বেশি দামে লবণ বিক্রয় না করতে কঠোরভাবে সতর্ক করেন।
এদিকে, লবণ সংকটের গুজবকে কাজে লাগিয়ে উপজেলার মানিকদিয়া গ্রামের এক অসাধু ব্যবসায়ীকে ভ্রাম্যমাণ আদালতে অর্থদ- করা হয়। দ-িত ব্যবসায়ী উপজেলার কেশবনগর গ্রামের হাজিদিদার আলীর ছেলে মজিবর রহমান। ৩৫ টাকার লবণ ৬৫ টাকায় বিক্রয় করায় তাঁকে ৫ হাজার টাকা জারিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলারা রহমান। এ ছাড়াও গাংনী থেকে লবণ পাঁচারকালে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার আসমানখালী গ্রামের মো. মতিয়ার রহমানের ছেলে রাশেদুজ্জামানকে আটক করেছে গাংনী থানার পুলিশ।
এর আগে লবণ-সংকটের গুজব ছড়িয়ে পড়ায় বাজার মনিটরিং শুরু করেন গাংনী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলারা রহমান, গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওবাইদুর রহমান ও বাজার কমিটির সভাপতি মাহাবুবুর রহমানসহ আরও অনেকে। তাঁরা সাধারণ ভোক্তা ও জনগণকে গুজবে কান না দিয়ে স্বাভাবিক দামে লবণ ক্রয় করার পরামর্শ দেন। সেই সঙ্গে যদি কোনো ব্যবসায়ী অতিরিক্ত দামে লবণ বিক্রয় করেন, তাহলে সেই ব্যবসায়ীকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ করা হবে বলে সতর্ক করেন তাঁরা।
কালীগঞ্জ:
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ শহরে গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যার পর লবণ নিয়ে সৃষ্টি হয় তুলকালাম কা-। আগামীকাল (আজ) থেকে লবণ পাওয়া যাবে না, এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে শহরের সব স্থানে। এরপর লবণ কেনার হিড়িক পড়ে যায় খুচরা ক্রেতাদের মধ্যে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এক শ্রেণির অসাধু লবণ ব্যবসায়ী হঠাৎ করেই বাড়তি দামে লবণ বিক্রি শুরু করে দেন। বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হলে সঙ্গে সঙ্গে শহরে অভিযানে নামেন প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। তাঁরা শহরের বিভিন্ন দোকানে অভিযান চালান। সেই সঙ্গে প্রচার মাইকে ঘোষণা করেন, লবণের দাম বৃদ্ধির ঘটনাটি নেহাত গুজব। বেশি দামে লবণ বিক্রি করলেই ব্যবস্থা। আর ক্রেতাদের গুজবে কর্ণপাত না করার জন্য আহ্বান জানানো হয়। এ সময় ক্রয়কৃত লবণের ক্যাশ মেমো দেখাতে ব্যর্থ হওয়ায় পাইকারি লবণ ব্যবসায়ী উজ্জ্বল ট্রেডার্সকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে তা আদায় করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সূবর্ণা রানী সাহা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সূবর্ণা রানী সাহা জানান, লবণের দাম বেড়ে গেছে। আগামীকাল (আজ) থেকে লবণ পাওয়া যাবে না। সন্ধ্যার পর শহরে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এরপর শহরের লবণের দোকানগুলোতে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় শুরু হয়। এ সুযোগে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে লবণ বিক্রি করছেন, এমন খবরের ভিত্তিতে বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে গুজবের বিরুদ্ধে জনসচেতনতায় প্রচার মাইক বের করা হয়।