৮ দশক পরে মৃতপ্রায় চিত্রা নদীতে পানি

316

পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে নদী পাড়ের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায়
আরিফ হাসান:
দর্শনার নিম্নস্থল থেকে উৎপত্তি হয়ে দীর্ঘ ১৭০ কিলোমিটার বয়ে যাওয়া দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম নদী চিত্রা। গড়ে ৫৩ মিটার প্রস্থ এবং প্রকৃতি সর্পিলাকার নদী চিত্রা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে প্রবাহিত গঙ্গা-পদ্মা সিস্টেমের একটি বিশাল উপকূলীয় নদী। দর্শনার নিম্নস্থল থেকে উৎপত্তি হয়ে চিত্রা দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে মিশেছে খুলনার দৌলতপুরের কাছে ভৈরব নদীতে। খোরস্রোত চিত্রা নদীর উৎপত্তিস্থল শুকিয়ে যাওয়ার পর থেকেই দখল, দূষণে অনেকাংশেই হারিয়ে যায়। সম্প্রতি ৬৪টি জেলার অভ্যন্তরীণস্থ নদী খনন প্রকল্পের আওতায় চুয়াডাঙ্গা জেলার পাঁচটি নদী খনন করা হচ্ছে। যার মধ্যে অন্যতম চিত্রা নদী। প্রকল্পের আওতায় চিত্রা নদী ২৩ কিলোমিটার খনন করার কথা থাকলেও একাধিক মামলায় নদী খনন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেলেও আংশিক খননকৃত চিত্রায় ইতিমধ্যে পানি ও প্রাণের মিতালী লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরিবর্তন হতে শুরু করেছে নদী পাড়ের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান।
জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা জেলার মধ্য দিয়ে মোট ৫টি নদী প্রবাহিত। এর মধ্যে মাথাভাঙ্গা প্রধান নদী। চিত্রাসহ অন্য চারটি নদীর নদীর মূল উৎস মাথাভাঙ্গা। মাথাভাঙ্গা নদীর দর্শনা অংশের নিম্নস্থল থেকে উৎপত্তি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম নদী চিত্রা। দখল ও দূষণে মাথাভাঙ্গা নদী মৃতপ্রায় হলেও চিত্রা নদী বিলীন হয়ে গিয়েছিল। দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা, দুধপালিতা, চুয়াডাঙ্গা সদরের দোস্ত, উকতো, কুকিয়াচাঁদপুর, নেহালপুর, বোয়ালিয়া, শ্রীকোল, জালশুকা, ফুলবাড়ী, বলদিয়া, বড়শলুয়া, তিতুদহ, গোস্টবিহার, কালুপোল, খাড়াগোদা এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াত ও জীবন-জীবিকার প্রধান মাধ্যম ছিল চিত্রা। ঐতিহাসিকদের মতে চিত্রা নদীকে কেন্দ্র করেই এই এলাকায় গড়ে ওঠে জনবসতি। সুলতানী আমলে চুয়াডাঙ্গা সদরের কালুপোল গ্রামে চিত্রার পাড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজা গন্ধব রায়ের রাজ্য। চিত্রা নদী পথেই এলাকার মানুষজন তাদের উৎপাদিত ফসল দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে বিক্রি করত। বিদেশী সওদাগররা অত্র এলাকায় আসতেন ব্যবসা-বাণিজ্য করতে। উৎপত্তিস্থল শুকিয়ে যাওয়া, নদীর জায়গা দখল করে পুকুর খনন, মাটি ভরাট করে চাষাবাদসহ নানা কারণে নাব্যতা হারিয়ে খোরস্রোত চিত্রানদীর অস্তিত হারিয়ে যায়। বর্তমানে চিত্রা নদী নতুন করে দখলমুক্ত করে খনন করার কাজ চলমান রয়েছে। এরই মধ্যে যেসব জায়গায় চিত্রা নদী খনন করা হয়েছে। সেখানে নদীতে যেমন পানির প্রবাহ লক্ষণীয়, তেমনি নদীতে দেশীয় প্রজাতির মাছের উপস্থিত নদী পাড়ের বাসিন্দার পূর্বের ন্যায় মৎস্য শিকারের দিকে ঝুঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দৈনন্দিন ও গৃহস্থলি কাজে নদীর পানি ব্যবহার যেন নতুন করে চিত্রা পাড়ের রঙিন স্বপ্ন দৃশ্যলিত হচ্ছে। চিত্রার পানিতে খেলে বেড়াচ্ছে পাড়ের বাসিন্দাদের পোষা হাঁস, ঝাকে ঝাকে আসছে বিভিন্ন প্রচাতির পাখি।
বেগমপুর ও তিতুদহ ইউনিয়ন ইতিহাস ঐহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ শেকড়ের সভাপতি শামীম হোসেন মিজি বলেন, বর্তমানে দোস্ত বা কৃষ্ণপুর হাট যে স্থানে অবস্থিত, প্রাচীনকালে এখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে সওদাগর বা ব্যবসায়ীরা এসে নৌকা নিয়ে অবস্থান করতেন। এখানে এলাকার উৎপাদিত কৃষি পণ্য, বিভিন্ন ধরনের মাটির তৈরি আসবাবপত্র ক্রয়-বিক্রয় হত। মূলত চিত্রা নদী ছিল এই এলাকার মানুষের একমাত্র উপার্জন ও বেঁচে থাকার সম্বল। চিত্রা নদীর বিলীন হওয়া শুরু হয় ১৯৩৮ সালে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই। চিত্রার উৎপত্তিস্থল ভরাট করেই বৃটিশরা কেরু অ্যান্ড কোম্পানির বর্তমান মিলটি গড়ে তোলে। উৎসমুখ শুকিয়ে যাওয়ার ফলে আস্তে আস্তে চিত্রা নদী বিলীন হয়ে যেতে শুরু করে। বেগমপুর, তিতুদহ ইউনিয়নসহ এই এলাকার মানুষের যাতায়াত ও জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস ছিল চিত্রা নদী। চিত্রা নদী পথে এই এলাকায় আগমন করেন নবাব মুর্শিদকুলীর কণ্যা ঘোষেটি বেগম। তাঁর নাম অনুসারে বেগমপুর গ্রামের নামকরণ হয়। তেমনিভাবে তিতুমীরের নাম অনুসারে তিতুদহ নামকরণ হয়েছে বলে জানা যায়। দীর্ঘদিন যাবৎ চিত্রা নদী মৃতপ্রায় থাকলেও বর্তমান নদী খনন হওয়া নদী পাড়ের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকেই অভিযোগ তুলে বলেন, চিত্রা নদী খনন শুরু হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক প্রভাবে ও ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজসে করে নদী পাড়ের মাটি বিক্রি ও নদী থেকে বালি উত্তোলন করে রমরমা বাণিজ্য শুরু করেছে একশ্রেণির নদীখোকারা। এছাড়াও কুকিয়াচাঁদপুর থেকে নেহালপুর পশ্চিমপাড়া পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার নদীতে মাছের পোনা ছেড়ে দখল নিয়ে মাছ চাষের অভিযোগ উঠেছে কয়েকজনের বিরুদ্ধে।
সরেজমিনে ঘুরে এর সত্যতাও পাওয়া গেছে। দোস্ত থেকে জালশুকা গ্রাম পর্যন্ত চারটি স্থানে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করে স্তুপ করে রাখা হয়েছে। কুন্দিপুর, নেহালপুর ও শ্রীকোল এলাকায় নদীর মাটি বিক্রি করা হচ্ছে ট্রাক্টর প্রতি এক হাজার টাকা দরে। যদিও অভিযুক্তদের দাবি অনুমোদন নিয়েই বালি উত্তোলন ও মাটি বিক্রয় করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন যাবৎ দখল ও দূষণে বিলীন হওয়া চিত্রা নদী যাতে নতুন করে দখলদারা দখলে নিতে না পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্মকতাদের দৃষ্টি কামনা করেছে চিত্রা পাড়ের বাসিন্দারা।