৭৫ লাখ টাকা গৃহঋণ পাবে সরকারি চাকুরেরা : ১ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিও হবে

496

বাড়ছেনা করের বোঝা, ব্যাংকিং খাত স্বাধীন ব্যাংক কমিশন গঠনের ঘোষণা আসছে
চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভোটার খুশি করার নির্বাচনী বাজেট আজ
ডেস্ক রিপোর্ট: ভোটে জয়ের স্বপ্ন নিয়ে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে বেশ হিসাবি বাজেট নিয়ে আজ সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। কারো কাছ থেকে সরাসরি বাড়তি কোনো অর্থ না নিয়ে কিভাবে সবাইকে খুশি রাখা যায়, সেই চেষ্টা আছে চার লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটের আয়-ব্যয়ের প্রতিটি হিসাবে। নতুন করে প্রত্যক্ষ কর বাড়িয়ে কাউকে রুষ্ট করার বিষয় নেই বাজেটে। তবে বিদ্যমান ৯ স্তরের ভ্যাটকে পাঁচ স্তরে নামানোর উদ্যোগ নিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এটিও করছেন বেশ হিসাব-নিকাশ করে, যাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে প্রভাব না পড়ে। মানুষের খুব একটা দরকার নেই, এমন কিছু পণ্য ও সেবাসহ এবং বিলাস পণ্যের ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করতে যাচ্ছেন তিনি। মোট তিন লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য নিয়ে নামা নির্বাচনী বছরের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবী থেকে স্কুল শিক্ষক, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠী থেকে উচ্চবিত্ত ব্যাংক মালিক, মুক্তিযোদ্ধা, বেসরকারি চাকরিজীবীসহ বেকার সবাইকে খুশি করার চেষ্টা থাকছে। বর্তমান সরকারের জনপ্রিয়তার অন্যতম খুঁটি অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন ধরে নিয়ে পদ্মা সেতু, মেট্রো রেলসহ বড় বড় প্রকল্পে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নির্বাচনের আগে।
আজ দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে সংসদে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বর্তমান সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ বাজেট প্রস্তাব শুরু করবেন। এটি অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাঁর একটানা দশম বাজেট। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচন মাথায় রেখেই নিজের ১২তম বাজেট সাজিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এমনভাবে রাজস্ব আয়ের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে। ছোট করদাতাদের ছাড় দিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর চিন্তা থাকলেও জনতুষ্টির জন্য বাড়তি ব্যয়ের চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত তা বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না বলে জানা গেছে। তবে ঋণের সুদহার কমাতে ব্যাংক মালিকদের অনুরোধে তাদের করপোরেট করহার ৪০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৭.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হতে পারে। জনগণকে স্বস্তি দিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দিকে মোটেই হাত বাড়াননি তিনি। ফলে এবারও বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা নেই বলে সোমবার জানিয়ে রেখেছেন অর্থমন্ত্রী।
কর, শুল্ককর ও ভ্যাটহার না বাড়িয়ে নতুন অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কিভাবে দুই লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকা আয় করবে তা নিয়ে অর্থনীতির বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। চলতি অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ৪৮ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যা অর্জন সম্ভব না হওয়ায় সংশোধিত বাজেটে কমিয়ে দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি করা হয়। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রী সোমবার সাংবাদিকদের বলেছেন, কর কমকর্তাদের মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে। আইন সংশোধন করে করদাতাদের হয়রানি করা কমানো হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কর বাড়বে। ব্যয়ের ক্ষেত্রে এমনভাবে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যাতে বেশি সংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়। আগামী এক বছর সরকার কাবিখা, করপোরেশন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থায়নে চলা উন্নয়ন কর্মকা-ের বাইরে এক লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনা করবে। এর মধ্যে নির্বাচনের আগে গ্রামীণ ও পল্লী এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন ও বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে চেষ্টা থাকবে সরকারের। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্প, ঢাকার মেট্রো রেল প্রকল্পসহ ৯টি বড় প্রকল্পে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। বাজেটে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণাও থাকবে, আগামী নির্বাচনে জয়ী হলে সরকার এ সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করবে। এই ৯টি বড় প্রকল্পেই ৩২ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে, যা মোট উন্নয়ন বরাদ্দের ১৯ শতাংশ। বাজেটে সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে জ্বালানি খাত। এলএনজি আমদানি করে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে এ খাতে বাড়তি নজর দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতে গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের আগে গত ৯ বছরে সরকারের বাস্তবায়ন করা বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকা- প্রচারে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে সরকারি চাকরিজীবীদের খুশি রাখার চেষ্টা থাকছে বাজেটে। মাত্র ৫ শতাংশ সুদে ১৪ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এলাকাভেদে সর্বনি¤œ ২০ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা পর্যন্ত গৃহঋণ দেওয়ার ঘোষণা থাকছে, যা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। এসব ঋণের সুদের বাকি ৫ শতাংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে ব্যাংকগুলোকে পরিশোধ করবে। এই ঋণের সুদ পরিশোধে বাজেটে ১৩ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। এ জন্য গঠিত সচিব কমিটি ৮ থেকে ১০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত চাকরিজীবীদের ৫ শতাংশ বেতন বাড়ছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী নিজেই। সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশনে হয়রানি ও জটিলতা কমাতে আলাদা একটি অফিস স্থাপনের ঘোষণা দিতে পারেন তিনি। বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বাজেটে তেমন কিছু করার না থাকলেও তাদেরকেও সন্তুষ্ট রাখতে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দেবেন অর্থমন্ত্রী। তবে তা আগামী অর্থবছর থেকেই কার্যকর করা সম্ভব হবে না। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে তখন কিভাবে সবার জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালু করা হবে, তার আগাম একটি রূপরেখা ঘোষণা করবেন মন্ত্রী। বেকারদের জন্য আশাজাগানিয়া বক্তব্য থাকবে ‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে ১০৩ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তব্যে। সরকার যে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ করছে, তাতে বিপুলসংখ্যক দক্ষ-অদক্ষ কর্মীর কর্মসংস্থান সৃষ্টির নিশ্চয়তার কথা জানাবেন তিনি।
প্রস্তাবিত বাজেটে সারা দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত শিক্ষকরা সন্তুষ্ট হবেন। এমপিওভুক্তির দাবিতে দীর্ঘদিন ঢাকায় আন্দোলন করা শিক্ষকরা এবার স্বস্তির ঘোষণা পাচ্ছেন। প্রায় এক হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এমপিওভুক্ত করতে বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকছে। এতে অন্তত কয়েক হাজার শিক্ষক পরিবারের মুখে হাসি ফুটবে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তব্যে ভবিষ্যতে মাধ্যমিক পর্যায়ের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করার কথা থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রায় দুই লাখ জীবিত মুক্তিযোদ্ধাকে বিশেষ সম্মাননা ভাতা হিসেবে বছরে পাঁচ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। বিজয় দিবস ভাতা নামে তারা ডিসেম্বর মাসে এ ভাতা পাবেন। এ ছাড়া সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় বিভিন্ন ভাতা পাওয়ার তালিকায় প্রতিবছর প্রায় ১০ শতাংশ হারে উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানো হয়। নির্বাচন সামনে রেখে এবারের বাজেটে তা বাড়ানো হচ্ছে প্রায় ১৫ শতাংশ। এর ফলে উপকারভোগীর সংখ্যা চলতি অর্থবছরে ৭৫ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ৮৬ লাখে দাঁড়াচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতাভুক্ত জনগোষ্ঠী সরকারের কাছ থেকে প্রতি তিন মাস অন্তর নির্দিষ্ট হারে টাকা পান। এ ছাড়া খাদ্য সহায়তাও পান তাঁরা। আগামী অর্থবছরে এসব ভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রেও উপকারভোগীদের দুর্ভোগ কমানো হচ্ছে। পেনশন ব্যবস্থার মতো উপকারভোগীদের মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নির্দিষ্ট সময়ে সরকারের হিসাব থেকে ভাতার অর্থে চলে যাবে। সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীতে চলতি অর্থবছর ৫৪ হাজার ২০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে, আগামী অর্থবছর তা ৬৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি থাকছে এক লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। এটি মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৪.৯ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এই ঘাটতি চলতি অর্থবছরের তুলনায় ১৩ হাজার ১৭ কোটি টাকা বেশি।