৬ জঙ্গী পাকড়াও: অস্ত্র, গুলি, গানপাউডার উদ্ধার: হামলার পর আত-তামকীন নামে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে নিজেদের আইএস হিসেবে প্রচার করত

279

সমীকরণ ডেস্ক: নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি সদস্যরা দেশের আরও অন্তত ৬টি স্থানে আত্মঘাতী হামলার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছিল। অপেক্ষায় ছিল শুধু নির্দেশনার। একজন আমির তাদের নির্দেশনা দিত। সারাদেশেই এ জঙ্গী সংগঠনের সিøপার সেলের বেশ কিছু সদস্য বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে নাশকতার জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে আসছে। র‌্যাবের হাতে আটক জেএমবি ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ৬ সদস্যকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এ ধরনের চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। তারা হলেন- মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে সিফাত (২৭), জাহিদ হাসান ওরফে মাইন (২১), মোঃ নয়ন হোসেন (২১), জাহিদ আনোয়ার ওরফে পরাগ (২২), মোঃ জিয়াবুল হক (২৪) এবং মোঃ তাজুল ইসলাম ওরফে তাজুল (২৯)। তাদের কাছ থেকে দুটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ৭ রাউন্ড গুলি, ১৩টি ডেটোনেটর, ৩৪টি সার্কিট, ৪টি চাপাতি, ৫টি ছোট চাকু, নয়টি আইডি কার্ড, ৫টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ১২টি চকলেট, ১০০ গ্রাম বারুদ, ৪০০ গ্রাম পাওয়ার জেল, ৮ গ্রাম সাদা গান পাউডার, ৫ গ্রাম লাল গান পাউডার ইত্যাদি উদ্ধার করা হয়েছে। র‌্যাব জানিয়েছে, এই চক্রটি দেশে বিভিন্ন জঙ্গী হামলার পর ‘আত-তামকীন’ নামে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে মিডিয়াতে নিজেদের আইএস হিসেবে প্রচার করত। যে কোন জঙ্গী হামলার পর এই চক্রটিই আইএস পরিচয়ে দায় স্বীকার করে দেশ-বিদেশে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করত। বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জঙ্গী সংগঠন আইএস-এর নামে দায় স্বীকারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে- আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসা এবং বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি ও স্থিতিশীলতা নষ্ট করা। তবে বাংলাদেশের এ সব জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠনের সরাসরি যোগাযোগের প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন র‌্যাব পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান। র‌্যাব সূত্র জানায়, এ চক্রের সদস্যরা কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙ্গে কিভাবে সফলতার সঙ্গে জঙ্গী হামলা করে নিরাপদে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে, পর মুহূর্তেই দায় স্বীকার করে দেশে-বিদেশে মেসেজ পাঠিয়ে দিত সে রহস্যও উদ্ঘাটন করা হয়েছে। এ জঙ্গীগোষ্ঠী বিটিআরসির কঠোর নজরদারির মাঝেও নিজেদের মধ্যে অন্তত সতর্কতার সঙ্গে যোগাযোগ করত। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক, ইমো ছাড়াও টেলিগ্রাম, থ্রিমার মাধ্যমে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দিত। আত-তামকীনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিভিন্ন গ্রুপে কাজ করে থাকে সংগঠনটির সদস্যরা। এর মধ্যে একটি গ্রুপ অনুবাদের কাজ করে, একটি ফটোশপের কাজ করে, আরেকটি গ্রুপ ভিডিও এডিটিংয়ের কাজ এবং অন্যটি প্রচারের কাজ চালায়। মঙ্গলবার রাতে এই ৬ জঙ্গীকে আটকের পর র‌্যাব সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে মুফতি মাহমুদ খান বেশ সুস্পষ্ট করেই বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা নিজেদের জেএমবি এবং আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য বলে স্বীকার করেছে। জেএমবির এ সদস্যরা নিজেদের দাওলাতুল ইসলামের সদস্য বলে দাবি করে। এরা সময়ের ব্যবধানের নিজেদের যেমন ছদ্মনামে পরিচয় দিচ্ছে, তেমনি নতুন নতুন সাংগঠনিক নাম নিয়ে তারা জঙ্গী কার্যক্রম চালাচ্ছে। এই দলের সদস্যরাই এ পর্যন্ত ১১টি হামলা চালিয়েছে। এ সংগঠনটি গুলশান, শোলাকিয়া, মাদারীপুরে শিক্ষকের ওপর হামলাসহ মোট ১১টি হামলার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও স্বীকার করেছে। তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য তারা থ্রিমা, ইমো ও টেলিগ্রাম এ্যাপস ব্যবহার করে। এছাড়াও তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গ্রুপ পেজ খুলে যোগাযোগ রক্ষা করে থাকে। এ সব জঙ্গীর অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে মুফতি মাহমুদ খান বলেন, সাধারণত তারা নিজেরাই চাঁদা দিয়ে অথবা হিতাকাক্ষীদের কাছ থেকে ইয়ানত সংগ্রহ করে সংগঠন পরিচালনা করে। ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকার কারণে তারা তাদের আর্থিক লেনদেনের প্রক্রিয়াটি ব্যাংক অথবা বিকাশের মাধ্যমে সম্পন্ন করে না। এক্ষেত্রে তারা নতুন পদ্ধতি যেমন-স্বর্ণ-চোরাকারবারী প্রক্রিয়ায় অর্থ সংগ্রহ করে। এর সুবিধা হলো যদি কেউ কখনও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে তবে তাকে জঙ্গী হিসেবে, না হয় চোরাকারবারী হিসেবে চালিয়ে দেয়া সহজ হয়। সাধারণত আমীরই তাদের আর্থিক কর্মকা- নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেন। তিনি বলেন- মাদারীপুরে কলেজশিক্ষকের উপর জঙ্গী হামলায় আবরার, নীরব এবং ওসামা নামক তিন ব্যক্তি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। আবরার, ওসামা, আব্দুর রহমান ও নীরবসহ মোট চারজন ওই অপারেশনের জন্য সিলেটে একত্রে মিলিত হয় এবং জঙ্গী আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। এ ক্ষেত্রে প্রথমে ওসামা, আবরার ও নীরব সিলেটে অবস্থান করেন। আব্দুর রহমান বিশেষভাবে গ্রুপের আমির কর্তৃক নির্বাচিত হয় এবং ওসামা, আবরার ও নীরবের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। সুনির্দিষ্ট দিনে আব্দুর রহমান ওই ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বলেন, সে সাদা প্যান্ট, সাদা শার্ট পরিহিত অবস্থায় সিলেটে পৌঁছাবে। ওই কথোপকথনের পর আব্দুর রহমান মোবাইল বন্ধ করে দেয় এবং মোবাইল হতে সিম কার্ডটি খুলে ফেলেন। আব্দুর রহমান একতা নামক বাসে করে সিলেটে পৌঁছার পর ওই তিন জনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। নিরাপত্তার সার্থে তারা কোন হোটেলে অবস্থান করেনি। তারা চারজনই হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজারে এবং মাজারের আশপাশে ঘোরাঘুরি করে সময় অতিবাহিত করেন। সংবাদ সম্মেলনে আত-তামকীন সম্পর্কে মুফতি মাহমুদ খান বলেন, এটি জেএমবি পরিচালিত একটি জঙ্গী ওয়েব সাইট। এ দেশীয় জঙ্গীরা তাদের বিভিন্ন জঙ্গী হামলার সংবাদ ও ছবি ‘আত্-তামকীন’ নামক একটি সাইটের মাধ্যমে প্রকাশ করে। বিভিন্ন হামলা সংগঠনের পর অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে হামলা সংক্রান্ত সংবাদ ও ছবি ‘আত্-তামকীন’-এ আপলোড করে থাকে। এছাড়াও এ সাইটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং প্রচার-প্রসার এর জন্য আইএস কর্তৃক সংগঠিত বিভিন্ন হামলার সংবাদ বাংলায় অনুবাদ করে নিয়মিতভাবে প্রচার করে থাকে। আইএস-এর বরাত দিয়ে দায় স্বীকারের উদ্দেশ্য মূলত প্রচার বেশি পাওয়া এবং ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা। এবিটি এবং জেএমবি এর শীর্ষ নেতাদের নেতৃত্বহীনতার কারণে তারা নিজেদের মধ্যে এক রকমের সমঝোতায় আসে এবং ‘দাওলাতুল ইসলাম’-এর ব্যানারে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। এ ক্ষেত্রে ‘আত্-তামকীন’ এই সংগঠনের মিডিয়ার কাজ করে আসছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন- জেএমবির দুটি গ্রুপ দাওলাতুল ইসলামের ব্যানারে হলি আর্টিজান রেস্তরাঁ ও শোলাকিয়ায় নাশকতা সংগঠিত করে। জেএমবি’র এরকম আরও বেশ কিছু গ্রুপ নাশকতার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েছিল। এমন তথ্যের ভিত্তিতেই মঙ্গলবার রাতে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন থেকে জাহিদ আনোয়ার ও পরাগকে আটক করা হয় । পরে তাদের দেয়া তথ্যে গাবতলী আল-আরাফাত খাবার হোটেল থেকে (২) মোঃ তাজুল ইসলাম তাজুল, জাহিদ হাসান মাঈনকে (২১) আটক করা হয়। বুধবার ভোরে শাহআলী মাজারের পিছনের একটি ভাড়া বাসা (বাসা নং ১২, রোড-২, উত্তর বিসিল, ওয়াড-৮, ব্লক-খ, থানা-শাহআলী, মিরপুর-১) থেকে দাওলাতুল ইসলামের মুখপাত্র ‘আত্-তামকীন’ জঙ্গী সাইটের এ্যাডমিন ইঞ্জিনিয়ার মোস্তাফিজুর রহমান সিফাত ও মোঃ নয়ন হোসেনকে আটক করা হয়। তাদের আরও বেশ কজন নারী সদস্যকে ধরার জন্য র‌্যাব তৎপর রয়েছে।