৪৪ দিনে চুয়াডাঙ্গার সড়কগুলোয় ৮০টিরও বেশি দুর্ঘটনা

21
সড়কে অবৈধ যান বন্ধে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা, আজ থেকে লাগাতার অভিযান শুরু
ফলোচার্ট:
* ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার কারণ অবৈধ যানবাহন ও মোটরসাকেলের অদক্ষ চালক
* শুধু জানুয়ারিতেই ঘটেছে ৭০টি দুর্ঘটনা
*গুরুতর আহত ৭৭ জনের অনেকে এখন পঙ্গু
* গত ৪৪ দিনে সড়কে প্রাণ গেছে ৭ জনের
* চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও পথচারীদের অসচেতনতায়ও ঘটছে দুর্ঘটনা
* ৮০ শতাংশ অবৈধ যান কেনার অর্থ আসে এনজিওর ঋণ থেকে
* মানদণ্ডের ধারের কাছেও নেই এসব অবৈধ যানের যন্ত্রকৌশল
* সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন জরুরি 
রুদ্র রাসেল:
চুয়াডাঙ্গায় প্রতিনিয়ত বাড়ছে অবৈধ যানবাহন, পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা। গত ৪৪দিনে ৮০টিরও বেশি সড়ক দুর্ঘটনা শঙ্কিত করে তুলেছে জেলাবাসীকে। এসব দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটছে অবৈধ যানবাহন ও মোটরসাকেলের অদক্ষ চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও অতিরিক্ত গতির কারণে। শহরের রাস্তায় কিংবা আঞ্চলিক সড়কে আলমসাধু, নছিমন, করিমন, পাওয়ারটিলার, লাটাহাম্বারসহ বিভন্ন অবৈধযান বেপরোয়াভাবে চলাচল করে, ফলে প্রতিনিয়তই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এ সব যানবাহনের কোনটিই যন্ত্রকৌশল বা মোটরযান কৌশলের মানদণ্ডের ধারের কাছেও নেই। যার ফলে এসব গাড়িতে গতিনিয়ন্ত্রণে নেই উপযুক্ত ব্যবস্থা। সম্পূর্ণ খেলনা গাড়ির ডিজাইনে দেশের বিভিন্ন ওয়ার্কশপে এসব আলমসাধু, নছিমন, করিমন, লাটাহাম্বার তৈরি হয়। ফলে যত্রতত্র বিভন্ন সময় সড়কের ওপর  এসব যানের এক্সেলসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ বিকল হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। আবার মরার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো আছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা। এসব দুর্ঘটনায় ঝরছে তাজা প্রাণ এবং পঙ্গুত্ব বরণ করছে অনেকে।
এদিকে, ৪ দিনের সচেতনতামূলক মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি শেষ করেছে পুলিশ। আজ শনিবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) থেকে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক চুয়াডাঙ্গা জেলার প্রধান ৫টি সড়কসহ সব সড়ক থেকে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত সব ধরণের নসিমন, করিমন, আলমসাধু ও ভটভটি বন্ধে লাগাতার অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানা গেছে।
চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর জানুয়ারি মাসেই চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালসহ আলমডাঙ্গা হারদী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জীবননগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছে ৭০টি সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুত্বর আহতের ৭৭ জনের অধিক।
এ বছরে জানুয়ারি মাসে দুর্ঘটনায় মৃত্যু বরণ করেছে ২১ তারিখে জীবননগরে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় জীবননগর সুটিয়া গ্রামের জালাল উদ্দিন, ২৪ তারিখে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বোয়ালমারীতে আলমসাধু উল্টে আলমডাঙ্গা উপজেলার ভাংবাড়িয়া মাঠপাড়ার মারফত আলী, ২৯ তারিখে রেললাইনের লেবেল ক্রসিংয়ের ওপর মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন বিকল হয়ে ট্রেনের ধাক্কায় জীবননগর উপজেলার আন্দুলবাড়িয়া গ্রামের আবুল হাসেমসহ ৩১ জানুয়ারি জীবননগরের শেয়ালমারী পশুহাটে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় জীবননগর উপজেলার উথুলি ইউনিয়নের শেয়ালমারী গ্রামের ফিরোজা বেগম। চলতি মাসের ১০ তারিখ আলমডাঙ্গায় লাটাহাম্বারের চাকায় পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে আলমডাঙ্গা উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের।
ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ পর্যন্ত পত্রিকার হিসেব অনুযায়ী ১০টির বেশি সড়ক দুর্ঘটনা খবর নিশ্চিত হওয়া যায়। এরমধ্যে চলতি মাসের ১২ তারিখ সকাল ৭টার দিকে চুয়াডাঙ্গা-আলমডাঙ্গা সড়কের ছাগল ফার্মের নিকট আলমসাধুর এক্সেল ভেঙে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেলে হাবিব আলী (৪০) নামের এক আলমসাধুচালকের মৃত্যু হয়। নিহত হাবিব আলী চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার উথলি গ্রামের জমির উদ্দিন বিশ্বাসের ছেলে। একই দিনে দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা ফায়ার সার্ভিসের নিকট আরও একটি আলমসাধু এক্সেল ভেঙে উল্টে যায়। এ ঘটনায় গুরুতর জখম হয় দামুড়হুদা দশমীপাড়ার আব্দুস সালামের স্ত্রী জুলেখা বেগম (৩০)। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেন। জুলেখার বাঁ হাতের কবজি ও হাতের পাতা গুরুতর জখম হওয়ায় হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পঙ্গু ওয়ার্ডে রেফার্ড করেন। ১৩ তারিখ রাত ৮টার দিকে জীবননগরে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে এক মানসিক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধার। জীবননগর থানার পুলিশ নিহতের লাশ উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপতালের মর্গে নেয়। পুলিশের ধারণা, সন্ধার পরে কোনো একসময় ট্রাক বা কোনো যানবাহনের ধাক্কায় এই অজ্ঞাতনামা বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তাঁর পরিচয় মেলেনি। চুয়াডাঙ্গায় এ নিয়ে গত ৪৪ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় মুত্যু হয়েছে ৭ জনের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে সবার আগে দরকার সঠিক তথ্য। কিন্তু সরকারের কাছে সঠিক তথ্যই নেই। নেই উদ্যোগও। সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়ে সরকারি তথ্যের উৎস পুলিশ। সড়ক দুর্ঘটনার পর মামলা হলেই পুলিশ তথ্য সংরক্ষণ করে থাকে। ভুক্তভোগী কেউ মামলা না করলে কিংবা নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করে ফেললে পুলিশের খাতায় কোনো তথ্য থাকে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাছে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত, ধরন ও কারণ বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় পরিকল্পনা প্রণয়নে ঘাটতি থেকে যায়।
সড়কে চলাচলকারী এসব অবৈধ যান তৈরিতে খরচও কম নয়।  একটি নতুন আলমসাধু, নছিমন, করিমন বানাতে খরচ পড়ছে ৮০ হাজার থেকে এক লক্ষ টাকা। আর একটি লাটাহাম্বার বানাতে খরচ পড়ছে ৩ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা। যারা এসব গাড়ি বানাচ্ছেন, তাঁদের মূলধন আসছে বিভন্ন এনজিও বা গ্রামীণ ব্যাংকের লোন থেকে। অনেকেই আবার জমি বা গরু বিক্রি করে অধিক আয়ের আশায় বানাচ্ছে এসব অবৈধ যানবাহন। অন্য এক তথ্যে জানা গেছে, চুয়াডাঙ্গা জেলার অবৈধ যানবাহন আলমসাধু, পাওয়ারটিলার, লাটাহাম্বার রয়েছে ইটভাটা মালিকদের। ইটভাটার মাটি ও ইট বহনের কাজে এগুলো ব্যবহৃত হয়।
অবৈধ যানগুলোর মূলধন বিনিয়োগকারী সংস্থার একটি হলো আশা ফাউন্ডেশন। এ বিষয়ে জানকে চাইলে আশা ফাউন্ডেশনের চুয়াডাঙ্গা ব্রাঞ্চ ১ ও ২ ম্যানেজার বলেন, ‘আমরা ক্ষুদ্র ও বৃহৎ উভয় ধরনের ঋণ প্রদান করে থাকি। ক্ষুদ্র ঋণ ৩০ হাজার টাকা ও বৃহৎ ঋণ দুই লক্ষ টাকা পর্যন্ত প্রদান করি। ক্ষুদ্র ঋণ এর জন্য ঋণ গ্রহীতার অভিভাবক এবং গ্রহীতার পরিচয়পত্র নিয়ে আমরা ঋণ দিয়ে থাকি। তবে বৃহৎ ঋণের জন্য ঋণ গ্রহীতার আয়ের উৎস সবার আগে দেখা হয়। তাঁরা এই ঋণের কিস্তি সঠিক সময়ে দিতে পারবে কি না, তা বিবেচনা করা হয়। সে ক্ষেত্রে চাকরিজীবী হলে চাকরি বা ব্যবসায়ী হলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ও আয় বুঝে এ ঋণ প্রদাণ করা হয়।’ আশা ফাউন্ডেশন আলমসাধু বা লাটাহাম্বার কেনার জন্য কোনো ঋণ দেয় কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ঋণের কিস্তি সময় মতো দিতে পারবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে ঋণ প্রদান কার হয়। ঋণ নিয়ে লাটাহাম্বার কিনবেন, নাকি আলমসাধু কিনবেন, সে ঋণ গ্রহীতার বিষয়। এছাড়াও একাধিক এনজিও তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম পরিচয় গোপন রাখার সর্তে একই ধরণের বক্তব্য দেন।
আলমডাঙ্গা উপজেলার জেহালা ইউনিয়নের মুন্সিগঞ্জ গ্রামের রুবেল হোসেন নামের এক আলমসাধু চালক বলেন, তিনি তিন মাস আগে আশা সমিতি থেকে আলমসাধু কেনার কথা বলে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নেন এবং গোছানো ১০ হাজার টাকাসহ মোট ৫০ হাজার টাকা দিয়ে একটি পুরোনো আলমসাধু কিনে চালাচ্ছেন। প্রতিদিন প্রায় ৪ শ থেকে ৫ শ টাকা রোজগার হয়। এ দিয়ে তাঁর পরিবার বেশ ভালোভাবেই চলছে। আলমসাধুচালক রুবেল হোসেনের কাছে সরকারের অনুমতি ছাড়াই চলাচল করা এ সব অবৈধ যান সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়ে যানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আলমসাধু, নছিমন চলতে দেখছি। তাই কিছু না ভেবেই রোজগার করতে লোন তুলে আলমসাধু কিনেছি। তবে আলমসাধু চলাচল বন্ধ করে দিলে আমরা বিপাকে পড়ব। পাঁচ সদস্যের সংসার খরচ, ঋণের কিস্তির টাকা কোথা থেকে আসবে। আলমসাধু না চললে আমাদের মতো মানুষদের না খেয়ে মরতে হবে।’
চুয়াডঙ্গা দৌলাতদিয়াড় কোরিয়াপাড়ার সাইদুল ইসলাম নামের এক পাখিভ্যানচালক বলেন, আলুকদিয়া গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি পাখিভ্যান কিনেছেন তিনি। তিনি এই পাখিভ্যানের উপার্জনের টাকা দিয়ে ধীরে ধীরে পরিশোধ করছেন ঋণের বোঝা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা নিরাপদ সড়ক চাই সংস্থার সভাপতি অ্যাড. আলমগীর হোসেন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় মেধাবী ও কর্মক্ষম জনসম্পদ হারিয়ে দেশের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে। সরকার সঠিক কর্মসূচি গ্রহণ করলে এক বছরে সড়ক দুর্ঘটনা ৯০ শতাংশ কমানো সম্ভব। তিনি মনে করেন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের দাবিগুলো বাস্তায়নের উদ্যোগ নিলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটাই কমে আসবে।
সড়ক দুর্ঘটনা সর্ম্পকে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসান বলেন, শহরের রাস্তায় অবৈধ আলমসাধু, নছিমন, করিমন, ফিটনেসবিহীন গড়ি, চালকের অদক্ষতা, পথচারীদের ট্রাফিক আইন না মানাসহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে সবার প্রথমে সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে ট্রাফিক আইন। শহরের রাস্তায় অবৈধ আলমসাধু, নছিমন, করিমন ইত্যাদি গড়ি চলাচলে এলাকাভিত্তিক সীমাবদ্ধকরণ করা হলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটা কমানো সম্ভব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম বলেন, চুয়াডাঙ্গা জেলাতে সড়ক দুর্ঘটনার হার একেবারে কম নয়। চালকের বেপরোয়া মনোভাব, পথচারীদের অসচেতনতা ও সড়কের ত্রুটির কারণেই এসব দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে অবৈধ যানবাহন ও মোটরসাইকেলই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ। চুয়াডাঙ্গার সব সড়ক থেকে অবৈধ যানবাহন বন্ধে পুলিশের সচেতনতামূলক মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক জেলার প্রধান ৫টি সড়কসহ সব সড়ক থেকে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত সব ধরণের নসিমন, করিমন, আলমসাধু ও ভটভটি বন্ধে আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে লাগাতার অভিযান শুরু হবে। তার আগে এসব যানবাহনের মালিক ও ব্যবহারকারীদেরকে সচেতন করতে আমরা ৪ দিন সচেতনতামূলক মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ কার্যক্রম চালাচ্ছি। শহরের রাস্তায় অবৈধ যান চলাচল বন্ধ হলে সড়ক দুর্ঘটনার হার কমবে এবং শহরের রাস্তায় এসব অবৈধ যান চলাচল বন্ধে প্রয়জনীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।