৩৪ বছর পর মায়ের মমতায় সিক্ত হলেন মেয়ে রুকসানা : দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর মা-মেয়ের এই পুনঃমিলন যেনো পরস্পরের কাছে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়া

310

এস এম শাফায়েত: ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ১০টা। দর্শনা জয়নগর চেকপোস্টে স্বামী-সন্তান নিয়ে মায়ের অপেক্ষায় মেয়ে। চোখেমুখে উত্তেজনার ছাপ, ৩৪ বছর পর দেখা পাবে মায়ের। বহু প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে মমতাময়ী মায়ের যখন দেখা মিললো তখন দুপুর ১টা। ওপারে থাকা তার আরো এক ভাই ও বোনকে সাথে নিয়ে মা এসে পৌছালেন জয়নগর চেকপোস্টে। দু’জন দু’জনের দিকে কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে থাকলেন। এরপর জড়িয়ে ধরলেন একে অপরকে। ভেঙে পড়লেন কান্নায়। তবে এ কান্না ছিল আনন্দের। ভাষা গত ব্যবধানও হার মানল মাতৃত্বের কাছে।
এরা দু’জন হলেন মা খাইরুন নেছা (৭০) ও মেয়ে রুকসানা আক্তার (৫০)। মা খাইরুন নেছা থাকেন কোলকাতা নারকেলডাঙ্গায়। আর মেয়ে রুকসানার ঠিকানা এখন চুয়াডাঙ্গা পৌর শহরের সিএন্ডবি পাড়ায়। প্রায় ৩৪ বছর পর মা-মেয়ের দেখা হলো গত ৬জুলাই বৃহস্পতিবার।
খুলনা দৌলতপুর উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের খাইরুন নেছা ও উসমান আলী দম্পতির ১ম সন্তান রুকসানার জন্ম ১৯৬৭ সালের দিকে। এ সময় তারা খুলনাতেই থাকতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মেয়ে রুকসানাকে তার খালার কাছে রেখে বাবা-মা ভারতে চলে যান। তখন থেকে বাংলাদেশে থেকে যায় রুকসানা আক্তার। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৮৩ সালে মেয়ে রুকসানার বিয়েতে আসেন মা খাইরুন নেছা। নিজ হাতে মেয়েকে তুলে দেন জামাই হাশেম আলীর হাতে। মেয়েকে বিদায় জানিয়ে তিনিও বিদায় নেন। এরপর আর দেখা হয়নি মা-মেয়ের, যোগাযোগ নেই দীর্ঘ ৩৪ বছর। কিছুদিন আগে রুকসানার খালাতো বোনের ছেলে চিকিৎসার জন্য ভারতে গেলে অনেক খোঁজাখুঁজির পর সন্ধান মেলে মা খাইরুন নেছার। জানতে পারেন তিনি ৪ ছেলে ও ৩ মেয়েকে নিয়ে কোলকাতার নারকেলডাঙ্গায় থাকেন। এরপর যোগাযোগ করা হয় মায়ের সাথে। মেয়ে এখন চুয়াডাঙ্গায় আছে শুনে আর দেরি করেননি মা। বড় ছেলে সুলতান ও মেয়ে সাবানাসহ নাতনিকে নিয়ে চলে আসেন এপার বাংলায়।
অনেকদিন পর মায়ের দেখা পেয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন রুকসানা আক্তারও। তিনি বলেন ‘আমি ভীষণ খুশি। মাকে দেখার অপেক্ষা আর সইছিল না। আর দেখার পর যে আনন্দ তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। অনেকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, চিঠিও দিয়েছি। আজ দীর্ঘ ৩৪ বছর পর হলেও মায়ের দেখা পেয়েছি, এ যেন শিকড়ের সন্ধান পাওয়া।’
দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় মা খায়রুন নেছার ভাষা বদলেছে। এখন আর তিনি সাবলিলভাবে বাংলা বলতে পারেন না। সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে হিন্দি। আবেগ কান্না উচ্ছাসের তো কোন ভাষা নেই। তাই মা-মেয়ের এই মহামিলনে ভাষা কোন বাঁধা হয়ে দাড়াতে পারেনি।
আলাপ চারিতায় খাইরুন নেছা বলেন, ‘সব সময় মনে হতো একদিন না একদিন ওর সাথে দেখা হবেই। ওর খবর পাওয়ার পর ঠিকমতো খেতে পারিনি, রাতে ঘুমাতে পারিনি। সব সময় ভেবেছি, কখন আমার মেয়ের সঙ্গে দেখা হবে। আজ যেন আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছি।’
তিনি পূর্ব স্মৃতি হাতড়ে বলেন, প্রথম কয়েক বছর জন্মভূমি বাংলাদেশের কথা খুব মনে পড়ত। মন ছটফট করতো মেয়ের জন্য। ছেলেকে বারবার বলেছি আমাকে বাংলাদেশে পাঠাতে। আত্মীয়স্বজন লোক মারফতে কয়েক বছর চিঠিপত্রের আদান প্রদানও হয়েছে। তাতে সাড়া পাওয়া যায়নি। কিন্তু মেয়ের কথা কিছুতেই ভুলতে পারিনি। সব সময় মেয়ে, প্রতিবেশী ও এলাকার কথা মনে পড়লেও বাংলাদেশে আসার সুযোগ হয়নি।
বাংলাদেশে জন্ম হলেও বর্তমান ঠিকানা তার ওপার বাংলার কোলকাতার নারিকেলডাঙ্গায়। স্বামী উসমান আলী অনেক আগে পরলোকগমন করেছেন। সেখানে ৪ ছেলে-সুলতান, সোবহান, নওশার, মুন্না ও ৩ মেয়ে- সাবানা, ফারজানা, আফসানাসহ ৮ নাতি-নাতনিকে নিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় পার করেন তিনি।
এদিকে চুয়াডাঙ্গা পৌর শহরের সিএন্ডবি পাড়ায় থাকেন বড় মেয়ে রুকসানা আক্তার। এখানেও জামাই ও ৮ নাতি-নাতনি রয়েছে তার। মেয়ে-জামাই ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে কাটানো এ সময় টুকু খায়রুন নেছার কাছে ৩৪বছর পর সামান্য ফাল্গুনি হাওয়ার মতোই। তবে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সকলকে সাথে নিয়েই থাকতে চান তিনি। দেখে যেতে চান নাতি-নাতনিদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। মেয়ের বাড়িতে আর কিছুদিন থাকবেন। তারপর আবার ফিরে যাবেন তারকাটা পেরিয়ে ওপার বাংলার ঠিকানায়।