স্লিপে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে টাকা উত্তোলন

222

জীবননগরের বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জীবননগর উপজেলার বেশ কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির যোগসাজশে স্লিপের টাকা এবং বিদ্যালয় সংস্কারকাজের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। জানা গেছে, শিক্ষার মানোন্নয়নে জীবননগর উপজেলার ৬৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্লিপের টাকার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন উপকরণ ক্রয় করা হয়। তা ছাড়া জরাজীর্ণ বিদ্যালয়গুলো সংস্কার, বৃক্ষরোপণসহ বিদ্যালয়ের নানা ধরনের উন্নয়মূলক কাজের জন্য সরকারিভাবে দুই লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয়গুলোয় নামমাত্র রংচং ও দায়সারা কাজ করে বাকি টাকা নিজেদের পকেট ভরেছেন ওই সব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদের সভাপতিরা বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জীবননগর উপজেলার বেশির ভাগ স্কুলগুলোতে উন্নয়নমূলক কাজ না করে পুরাতন বছরের কিছু জিনিসপত্র আর বাজার থেকে কিছু ভুয়া ভাউচার-বিল তৈরি করে প্রধান শিক্ষক ও সভাপতির স্বাক্ষর দিয়ে এসব স্লিপের টাকা আত্মসাৎ করা হয়। শিক্ষা অফিসের কিছু কর্মকর্তার উদাসীনতা ও সঠিকভাবে কাজের কোনো তদারকি না থাকায় শিক্ষকেরা এ টাকা আত্মসাৎ করে থাকেন বলে অভিযোগ উঠেছে। জীবননগর উপজেলার সীমান্ত ইউনিয়নের মেদিনীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উন্নয়নমূলক কাজের যে চাহিদা দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে একটি ডিজিটাল হাজিরা মেশিনের বাজার মূল্য ১০ থেকে ১১ হাজার টাকা থাকলেও সেখানে দেখানো হয়েছে ১৫ হাজার ৯ শ টাকা, একটি প্রিন্টার মেশিন, যার বাজার মূল্য ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা, সেখানে দেখানো হয়েছে ১০ হাজার টাকা। একটি গাছের দাম ১০ থেকে ২০ টাকা, সেখানে দেখানো হয়েছে ২ হাজার টাকা। শুধু তাই নয়, এ রকম আরও জিনিসপত্রের ক্রয়মূল্য বেশি করে দেখানো হলেও, এসব জিনিসের প্রকৃত বাজারমূল্য অনেক কম।
একই অবস্থা গঙ্গাদাশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তারিনীবাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সোন্দাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উমাপুর সীমান্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং হাবিবপুর, বেনীপুর, ধান্যখোলা, হাসাদহসহ উপজেলার অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতেই। এসব বিদ্যালয়ে একটি ডিজিটাল হাজিরা মেশিনের দাম দেখানো হয়েছে ১৪ হাজার টাকা ও একটি প্রিন্টার মেশিনের দাম দেখানো হয়েছে ৭ হাজারও বেশি টাকা বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে মেদিনীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুন্নাহারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। ধান্যখোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমি নিজে বাজার থেকে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন কিনেছি ১৪ হাজার ৫ শ টাকা দিয়ে এবং প্রিন্টার মেশিন কিনেছি ৯ হাজার টাকা দিয়ে। তা ছাড়া সব মালামাল আমি নিজেই কিনেছি।’ উমাপুর সীমান্ত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইন্তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের শিক্ষা অফিস থেকে যেভাবে লিস্ট করতে বলেছে, আমরা তাই করেছি। এখানে আমাদের কোনো হাত নেই।’ উমাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আজিমউদ্দিন বলেন, ‘যারা ডিজিটাল হাজিরা মেশিন লাগাতে এসেছিল, তারা বলল, মেশিনের দাম ১৪ হাজার টাকা। আমরা তাদের বলেছিলাম, এ মেশিনের দাম ১০ হাজার টাকা। কিন্তু তারা আমাদের বলে, ১৪ হাজার টাকার ভাউচার করতে হবে। তা না হলে মেশিন দেওয়া সম্ভব হবে না। তাদের কথা মতো আমরা স্বাক্ষর করেছি।’
এ প্রসঙ্গে জীবননগর কম্পিউটার প্লাসের স্বত্বাধিকারী মিণ্টুর সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, ‘একটি ডিজিটাল বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিনের দাম ১৩ হাজার ৫ শ টাকা এবং একটি প্রিন্টার মেশিনের দাম সাড়ে ৯ হাজার টাকা। আমি এই দামই নিয়েছি।’
জীবননগর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ‘স্লিপের টাকা স্কুলে দেওয়া হয় স্কুলের উন্নয়নমূলক কাজের জন্য, আর ডিজিটাল বায়োমেট্রিক হাজিরা মেশিন ও প্রিন্টার মেশিনগুলো টেন্ডারের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। এগুলোর দামের বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’