স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস আজ : কী ঘটেছিল সে দিন?

85

সমীকরণ প্রতিবেদন:
বাংলাদেশের এক শ্রেণীয় বুদ্ধিজীবী শফিক রেহমান ১৯৯২ সালে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি ‘ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বাংলাদেশে প্রচলন করেন একটি স্বার্থান্বেষী মহলকে সুবিধা দেওয়ার জন্য। এখন ভালোবাসা দিবসকে সামনে রেখে চলে নোংরা ব্যবসা আর লাভবান হয় শোষক শ্রেণী। এই দিবসের নোংরা স্রোতে ভেসে যায় ১৪ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’। এই গৌরবগাথা ইতিহাসকে ভুলে অপসংস্কৃতির জোয়ারে গা না ভাসিয়ে আসুন আমরা প্রকৃত ইতিহাস জানি। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি ইতিহাসের এই বীর আত্মত্যাগকারীদের।
১৪ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস, আসুন জানি পুরো ইতিহাস: ১৯৮২ সালের ২৪ শে মার্চ, লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। সবাই এ ব্যাপারে নীরব থাকলেও নীরব থাকেনি যুগে যুগে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর ছাত্রসমাজ। ’৫২, ’৬২, ’৬৬, ’৬৯, ’৭১-এর মতো আবারও প্রতিবাদের আগুন জ্বলে ওঠে ছাত্রসমাজের মধ্যে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রথম শুরু হয়েছিল স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। ২৪ শে মার্চেই কলাভবনে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পোস্টার লাগাতে গিয়ে গ্রেপ্তার ও সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন ছাত্রনেতা শীবলি কাইয়ুম, হাবিবুর রহমান ও আব্দুল আলী। এরপর ২৬ শে মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সাভার স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে গিয়ে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের নেতারা স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে বজ্রকণ্ঠে স্লোগান দেন। সেনাবাহিনী স্মৃতিসৌধেই ছাত্রদের ওপর চালায় নির্মম নির্যাতন। সরকারি ফরমান জারি করে ছাত্রদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অসম্ভব করে তোলা হয়। ছাত্ররা দেয়াল লেখে ও সামরিক সরকার তা মুছে দিতে থাকে। ছাত্রনেতারা সেপ্টেম্বরে প্রথম লিখিত প্রতিবাদ হিসেবে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বিবৃতি প্রদান করে।
সামরিক সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খান দায়িত্ব গ্রহণ করেই নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেন। শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই বাংলার সঙ্গে ইংরেজী ও আরবি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। ধর্মকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করাই ছিল উদ্দেশ্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন খর্ব ও পরীক্ষার ফল খারাপ হলেও যারা ৫০ শতাংশ শিক্ষার ব্যয়ভার দিতে সমর্থ তাদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয় এতে। শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার, যা সবার জন্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ মজিদ খানের ‘টাকা যার, শিক্ষা তার’ এই বৈষম্যমূলক নীতির কারণে দরিদ্ররা উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতো, তাই ছাত্ররা এর প্রবল বিরোধীতা করে।
১৯৮২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে এই শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে ছাত্র সংগঠনগুলো ঐক্যমত্যে পৌঁছায়। ২১ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং তারা শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও সারা দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জনমত তৈরির কাজ চালায়। এই আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি খন্দকার মোহাম্মদ ফারুককে গ্রেপ্তার করার প্রতিবাদে ছাত্ররা ২৭ ও ২৮ জানুয়ারি ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। এরপর ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচী হাতে নেয়। সে দিনই জন্ম নেয় এ দেশের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের।
১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, এ দেশের ইতিহাসে একটি নিকোষ কালো দিন। এ দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দী মুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি এবং গণমুখী, বৈজ্ঞানিক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির দাবিতে ছাত্র জমায়েত ডাকে। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচীতে হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ ও সুশৃংখল মিছিল যায় হাইকোর্টের গেট ও কার্জন হল-সংলগ্ন এলাকায়। মিছিলটির সম্মুখ ভাগ যখন হাইকোর্ট গেটে পৌঁছে, তখন এর শেষ ভাগ ছিল টিএসসিতে। এখানে পুলিশ কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে মিছিলের গতিরোধের চেষ্টা করে। এ সময় মেয়েরা ব্যারিকেডের সামনে বসে পড়ে। নেতারা কাঁটাতারের ওপর উঠে বক্তৃতা শুরু করলে পুলিশ বিনা উস্কানীতে একপাশের কাঁটাতারের ব্যারিকেড সরিয়ে রায়ট কার ঢুকিয়ে রঙিন গরম পানি ছিটাতে থাকে। সেই সঙ্গে বেধড়ক লাঠিচার্জ, ইট-পাটকেল ও বেপরোয়া গুলি ছুড়তে শুরু করে। এখানেই গুলিবিদ্ধ হন জয়নাল। এরপর গুলিবিদ্ধ জয়নালকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়। জয়নালকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করার পর আরও ফুঁসে ওঠে ছাত্ররা। এ সময় শিশু একাডেমীতে চলমান এক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আসা শিশু দীপালিও গুলিবিদ্ধ হয় এবং পুলিশ তার লাশ গুম করে ফেলে। সেখানে ছাত্র, শিশু ও অভিভাবকদের ওপর চলে নির্মম নির্যাতন, লাশের স্তূপ গড়ে ওঠে শিশু একাডেমীতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিহত ও আহত মানুষদের অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে নিয়ে আসতে চাইলে ঢুকতে দেয়নি খুনী বাহিনী। সব লাশ গুম করে ফেলে তারা। পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে, এমন অপপ্রচার চালিয়ে সামরিক সরকার উস্কে দেয় পুলিশকে। ওই দিন নিহত হয়েছিলেন জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালিসহ আরও অনেকেই।
ওই দিন বেলা তিনটা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা। নোয়াখালীর চাটখিল থানার দোলাইপাড় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি থেকে এসেছিল যে প্রতিবাদী যুবকটি, সে এখন গুলিবিদ্ধ লাশ। সংগ্রামী জয়নালকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছাত্র-শিক্ষক ও ক্ষুব্ধ জনতার ঢল নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায়। জানাজায় অংশ নিতে আসা হাজার হাজার ছাত্র-জনতার ওপর আর্মড পুলিশ, বিডিআর, মিলিটারি রায়টকার ও শত শত সাজোয়া গাড়ি নিয়ে আবারও হিংস্রভাবে ঝাপিয়ে পড়ে। অপরাজেয় বাংলার সমাবেশে নির্বিচারে চলে গ্রেপ্তার, বুটের আঘাত ও লাঠিচার্জ। শিক্ষক ও অভিভাবকেরাও আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি। ছাত্র-ছাত্রীদের কলাভবন ও উপাচার্যের কার্যালয়ে ঢুকে টেনেহিঁচড়ে বের করে হাত-পা ভেঙে গ্রেপ্তার করে ট্রাকভর্তি করে নিয়ে যাওয়া হয়। চোখের সামনে সন্তানতুল্য ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর এমন নির্মম নির্যাতন সইতে না পেরে এ ঘটনার প্রতিবাদে উপাচার্য অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী পদত্যাগ করেন। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা খ ম জাহাঙ্গীরকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় আক্রমণের পর জয়নালের লাশ মুহসীন হলের ডাইনিংয়ে রাখা হয়, পরদিন ভোরবেলা প্রতিবাদ মিছিলে নিয়ে যাবার জন্য। লাশের সন্ধানে পুলিশ নির্যাতন চালায় চারুকলার শিক্ষার্থীদের ওপর। পোশাকে রঙিন পানির দাগ দেখে ধরে নিয়ে যায় অনেককে। সরকারি মতেই গ্রেপ্তার করা হয় ১৩৩১ জন ছাত্র-জনতাকে, বাস্তবে এই সংখ্যা আরও অধিক ছিল। তাদের শাহবাগের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ও ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গিয়ে চালানো হয় অকথ্য নির্যাতন। এখানেই মেরে ফেলা হয় অনেককে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রবল চাপে পড়ে ১৫-১৬ তারিখের মধ্যেই তাদের ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় সামরিক সরকার। অনেকে থাকে নিখোঁজ, যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি আজও।
১৫ ফেব্রুয়ারি জগন্নাথ কলেজের মোড়ে গুলি চালিয়ে দুই তরুণকে হত্যা করা হয়। সদরঘাটে এক শিশুকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলা হয়। পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের দুই ছাত্রকে ছাদ থেকে ফেলে মারা হয়। বুয়েট, ঢাকা মেডিকেলসহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রাবাস থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ছাত্রদের। এই ঘটনার জোয়ার এসে লাগে চট্টগ্রাম শহরেও। মেডিকেল ও অন্যান্য কলেজের শিক্ষার্থীদের মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও গুলি চালালে নিহত হয় কাঞ্চন।
ছাত্রদের তিনটি মৌলিক দাবিতে গড়ে ওঠা প্রবল আন্দোলনের মুখে ১৮ ফেব্রুয়ারি শিক্ষানীতি স্থগিত হয়ে যায় ও ছাত্র-বন্দীদের মুক্তির দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বে আটক তিন ছাত্রনেতা মুক্তি পান। ঘরোয়া রাজনীতির অধিকার দিতে বাধ্য হয় সামরিক সরকার। ১ হাজার ২১ জনকে ছেড়ে দেয় ১৭ ফেব্রুয়ারি ও আটক রাখে ৩১০ জনকে। সেই থেকে জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালীসহ আরও অনেকের রক্তস্নাত দিন ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। কিন্তু আজ আমরা দেখতে পাই, এ দেশের এমন একটি গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস জনগণ ভুলে গেছে। এত মহৎ একটা ঘটনা একদিন এদেশে ঘটেছিল, অথচ আজ সেই দিনটার কথা, সেই আত্মত্যাগের কথা কেউ স্মরণও করে না! ‘স্বৈরাচার বিরোধী দিবস’ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন না করে ‘ভালোবাসা দিবস’ নামক অপসংস্কৃতিতে যুবসমাজ নির্লজ্জভাবে মেতে উঠেছে। আমাদের ভালোবাসা কি এতটাই ক্ষুদ্র, যে তা অন্যকে ভালোবাসতে শেখায় না; দেশকে, দেশের মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় না; অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, সংগ্রাম করতে শেখায় না! ভালোবাসা কি শুধু একজন ব্যক্তিকে ঘিরেই গড়ে উঠবে? এই সমাজ, এই দেশ, দেশের মানুষ, তাদের জন্য যদি আমাদের ভালোবাসা না-ই থাকে, তাহলে ভালোবাসা শব্দটারই কি অপমান হয় না!