স্বাস্থ্যবিধি মেনে মসজিদে মসজিদে ঈদের জামাত

62

ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যে দিয়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্যাপন
নিজস্ব প্রতিবেদক:
করোনাকালে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্যে দিয়ে চুয়াডাঙ্গায় পবিত্র ঈদুল আজহা উদ্যাপন করা হয়েছে। করোনাভাইসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনা মেনে শারীরিক ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঈদের নামাজ আদায় করে যাদের পশু কোরবানি ছিল, তাঁদের বেশিরভাগ মানুষই এবার বাড়িতে পশু কোরবানি করেছেন। তবে কোরবানি শেষে প্রতিবছরের মতো এবারে আর ঘুরতে যাওয়া হয়নি অনেকের। সবমিলিয়ে করোনাভাইরাসের কারণে উৎসাহ আর উদ্দীপনার কমতি ছিল এবারের ঈদে।
ঈদের জামাত ঐতিহ্য অনুযায়ী ঈদগাহে হওয়ার রেওয়াজ থাকলেও, গত ঈদুল ফিতর ও এবারের ঈদুল আজহা দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো মসজিদে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার বেশ কয়েকটি মসজিদে খবর নিয়ে জানা গেছে, সেখানে একাধিক জামাতের আয়োজন করা হয়েছে, যাতে ভিড় বেশি না হয়। প্রথম জামাত সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। সবাইকে মাঝখানে অন্তত এক ফুট জায়গা রেখে দাঁড়াতে বলা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার প্রতি মসজিদেই ঈদের জামাত হলেও এর দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। আগে থেকেই জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে ঈদের নামাজকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী মুসল্লিদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে তাঁদের নামাজ পড়তে দেখা গেছে। তবে অনেকেই শারীরিক ও সামাজিক দূরুত্বের কথা চিন্তা করে মসজিদে নামাজ পড়তে যাননি।
কোর্ট পাড়ার সেলিমুল হাবিব বায়তুল মামুর জামে মসজিদে ঈদের নামাজ পড়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমি মসজিদে নামাজ পড়েছি। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সবাই নামাজে অংশ নিয়েছি। মসজিদের প্রবেশপথে জীবাণুনাশক টানেল বসানো হয়েছিল। কোনো কোলাকুলি বা এ ধরণের কিছু আমরা কেউ করিনি। এমনকি আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীদের বাড়িতে যেমন যাইনি, তেমনি আমাদের বাড়িতেও সেটা নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।’
এদিকে, ঈদের আগে নতুন কাপড়-চোপড় কেনা এবং ঈদের দিন সেগুলো পড়ে বের হওয়া একটা প্রচলিত ব্যাপার। কিন্তু এই ঈদে সেখানেও ব্যতিক্রম হয়েছে। অনেক পরিবারের সদস্যরা পুরোনো কাপড় পড়েই এই বছর ঈদ উদ্যাপন করছেন। ঈদের দিন বড়দের সালাম করে সালামি আদায় যেন ঈদের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ। এবারের ঈদ দিয়ে পর পর দুটি ঈদে করোনাভাইরাসের কারণে ঈদ সালামি পায়নি অনেক শিশু।
অপর দিকে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে বিনোদন কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকায় এবারে বেড়াতে যাননি সচেতন মানুষেরা। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ভয় উপেক্ষা করে বহু বিনোদনপিপাসু অসচেতন মানুষকে দেখা গেছে বিএডিসি, চুয়াডাঙ্গা কেঁটের বিলপাড়সহ খোলামেলা প্রাকৃতিক বিভিন্ন পরিবেশে। ঈদের দিন গরম বেশি থাকায় সারা দিন এসব স্থানে কম মানুষ হলেও বিকেলেই পদচারণা বেড়েছে। একই সঙ্গে ফুসকা ও চায়ের দোকানগুলোতে ছিল মানুষের ভিড়।
এদিকে, চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারেও ঈদ আনন্দের কমতি হয়নি। বন্দীরা সকালে মুড়ি, পায়েস আর সেমাই দিয়ে ঈদের দিন শুরু করেছেন। রাতে তাঁদের গরু ও খাশির মাংস দিয়ে খাবার পরিবেশ করা হয়। চুয়াডাঙ্গা সরকারি শিশু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঈদের আনন্দভাগাভাগি করেছেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার। এবারের ঈদে নিজ কর্মস্থলেই ছিলেন তিনি। চুয়াডাঙ্গা কালেক্টরেট জামে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় শেষে চুয়াডাঙ্গা সরকারি শিশু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করেছেন তিনি। এরপর পরিবারের সঙ্গে সরকারি বাসভবনেই ঈদ উদ্যাপন করেছেন তিনি। ফেসবুক ও মুঠোফোনের মাধ্যমে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ঈদ শুভেচ্ছাবিনিময় করেছেন তিনি।
করোনাভাইরাসের কারণে পুলিশ প্রশাসনের কাজ বেড়েছে প্রথম থেকেই। চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার জাহিদুল ইসলাম প্রথম থেকেই পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিক কাজ করছেন। তিনি লকডাউনে ঘরে ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দেওয়াসহ পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে ঈদ উপহার দিয়েছেন অসহায় ও কর্মহীন মানুষদের। ঈদের আগেই শরীরে করোনা উপসর্গ দেখা দেওয়ায় তিনি নমুনা দিয়েছিলেন। নমুনা দেওয়ার কারণে ঈদের দিন বাইরে বের হননি তিনি। পরিবারের সঙ্গে চুয়াডাঙ্গায় সরকারি বাসভবনে ছিলেন তিনি। ঈদের দিনই সন্ধ্যার কাছাকাছি সময়ে তাঁর করোনা রিপোর্ট পজিটিভ আসে। তিনি বর্তমানে হোম আইসোলেশনে আছেন।
এদিকে, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সামনের সারিতে থেকে লড়াই করে চলেছেন চিকিৎসকেরা। পরিবার-পরিজনের মায়া দূরে ঠেলে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে করোনা রোগীদের সেবায় চিকিৎসকদের এই ত্যাগ মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চুয়াডাঙ্গার সিভিল সার্জন ডা. এ এস এম মারুফ হাসানের ওপর অনেক দায়িত্ব। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে চুয়াডাঙ্গার স্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান হিসেবে তিনি রাত-দিন কাজ করে চলেছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে তিনি এবার নিজ কর্মস্থলেই ঈদ উদ্যাপন করেছেন।