সূর্যনিশি

317

অমিতাভ মীর
বাবার একমাত্র সেই ছোট্ট মেয়েটি বাড়ির সবার খুব প্রিয় ছিলো। ছোটবেলায় মেয়েটি খুবই মেধাবী ছিলো। ওর বুকের ভেতর জমাট বাঁধা কষ্ট ছিলো। দাদীমার কাছে আদর-আহ্লাদে সে বেড়ে উঠছিলো। ও দাদীমার চোখের নয়নতারা ছিলো। বাবা তার কষ্টের কারণগুলো জানতো বলেই প্রচ- জেদী মেয়েটির সব চাওয়া-পাওয়া বিনা বাক্যব্যয়ে মিটিয়ে যাচ্ছিলো। মেয়েটি কেমন হঠাৎ করে পাল্টে গিয়ে পড়াশুনায় অমনোযোগী হলো। নিজেকে খুব চালাক ভাবতে শুরু করলো। আসলে মেয়েটি ছিলো প্রচ- রকমের বোকা। বাবার মনে অজানা আশঙ্কা ভর করলো।
মেয়েটি যখন কিশোরীবেলায় পা রাখলো, চোখের তারায় স্বপ্নছায়া উঁকি দিলো। মেয়েটি প্রথম প্রেমে পড়লো। কালে কালে অনেক প্রেমিক বদল হলো। ওর সহপাঠী সমবয়সীরা মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং, মাস্টার্স কমপ্লিট করে ফেললেও এখনো ও স্নাতকের গ-ী পেরোনোর শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কলেজের কথা বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় কার সাথে ঘুরে বেড়ায়, কি যে করে বেড়ায়; জানার উপায় নেই। বাবা ওকে কলেজে আনা-নেয়া করতে চাইলে মেয়েটি খুব বিরক্ত হয়। ছেলে বন্ধু নিয়ে ঘোরাফেরা করার দৃশ্য কারও চোখে পড়লেও রীতিমত গলা চড়িয়ে সব অস্বীকার করে যেতো। মিথ্যা বলার প্রবনতা ওর খুব বেড়ে গেল। বাবার সাথেও মিথ্যে বলা শুরু করলো।
একদিন জানা গেল, মেয়েটি এক বিবাহিত যুবকের ফাঁদে পড়েছে। মিষ্টি কথা আর দৈহিক ঘনিষ্ঠতার প্রভাবে মেয়েটি অন্ধ হয়ে গেলো। বিবাহিত ছেলেটির পাল্লায় পড়ে ওর জীবনটাই বরবাদ হয়ে যেতে পারে বাবার এমন আশংকা, সাবধানবাণী ও পরামর্শ তাকে আরও উদ্ধত করে তুললো। গুরুজনদের সাথে ও বেয়াদবের মতো আচরণ করতে লাগলো। পারলে, গুরুজনদের গায়ে হাত তোলে, তার শরীরের ভাষা এমনটাই হয়ে দাঁড়ালো।
প্রকৃতির নিয়মেই দিন-রাত্রির আসা-যাওয়া চলছে। সুখের আতিশয্যে ভেসে যাচ্ছে কত সংসার, কত মেয়ের জীবন। একটু সচেতন থাকলেই সুখ হাতের মুঠোয়। অথচ, সেই মেয়েটি, যে কিনা সূর্যের মত জ্বলে উঠে বুকের জমাটবাঁধা কষ্টগুলোকে গলিয়ে দিয়ে শিক্ষাজীবন শেষ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে বাবার মুখ উজ্জ্বল করতে পারতো, সে নিজেও দারুণ সফল ও সুখী হতে পারতো। তার হাতের কাছেই সেসব সুযোগ ছিলো। কিন্তু, মেয়েটি বোকার মত এ কি করলো?
এদিকে, সময় গড়িয়ে চলেছে আপন গতিতে। একসময় বিবাহিত লম্পট ছেলেটিকে মুখে মিষ্টি বচন আর ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে জনারণ্যে মাধুকরীতে প্রচ- ব্যস্ত থাকতে দেখা গেল।
অথচ, গোঁয়ার মেয়েটিকে কোথাও আর দেখা গেল না।