সুবিধা নিন ভূমিকা রাখুন

14

কোরবানি ঈদের আগে এবং পরে পশুর চামড়া নিয়ে সংশ্লিষ্টজনদের ভেতর শঙ্কা ও উৎকণ্ঠা কাজ করে। বিশেষ করে এতিমখানা কর্তৃপক্ষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা থাকেন দুশ্চিন্তায়। তারা সংগৃহীত চামড়ার ন্যায্যমূল্য পাবেন তো? অন্যদিকে আড়তদার ও ট্যানারি মালিক এবং চামড়া রফতানিকারকরা থাকেন সুযোগের অপেক্ষায়। জাত ব্যবসায়ীদের দৃষ্টিভঙ্গিই অবশ্য এমন যে, সর্বনিম্ন বিনিয়োগের মাধ্যমে সর্বোচ্চ মুনাফা লাভে সচেষ্ট থাকা। তবে তা নিশ্চয়ই এমন পর্যায়ে যাওয়া সমীচীন নয় যে, চামড়ার দাম এমনই নেমে যাবে যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষোভে দুঃখে চামড়া রাস্তায় ফেলে দেবেন! চামড়াশিল্পের বাজার গতিশীল রাখতে সরকার সচেতন থাকে এবং নানা ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু দুঃখজনক হলো অনেক সময় অসাধু সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার কারণে সদিচ্ছা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। লবণ ব্যবসায়ীরাও কখনও কখনও অসাধু সিন্ডিকেটের অংশ হয়ে ওঠে। লবণের দাম এক লাফে বাড়িয়ে দেয়া হয়। এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে গরিব ও স্বল্প আয়ের মানুষের ওপরেই।
এ বছরের হিসাব একটু অন্যরকম। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে অর্থনীতির বিপর্যস্ত দশা। তাই এবার কোরবানির চামড়া কিনতে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। কোরবানির পশুর চামড়া ক্রয়-বিক্রয় ও সংরক্ষণ কার্যক্রম সুষ্ঠু ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে অর্থপ্রবাহ সচল রাখার উদ্দেশ্যে এ খাতে খেলাপী ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ আট বছরের জন্য ঋণ পুনঃতফসিল করতে পারবেন চামড়া ব্যবসায়ীরা। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরাই এ সুবিধা পাবেন। এ ছাড়া কাঁচা চামড়া ক্রয়ে নতুন ঋণের আবেদনও করতে পারবেন সুবিধাভোগীরা। সরকারের এই উদ্যোগ চামড়াশিল্পের স্বার্থেই। এখন সুবিধা নিয়ে ব্যবসায়ীরা যথাযথ ভূমিকা রাখবেন সেটিই প্রত্যাশিত।
প্রসঙ্গত চামড়াশিল্প দেশীয় কাঁচামালভিত্তিক রফতানিমুখী শিল্প। জাতীয় প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং মূল্য সংযোজনের নিরিখে এটি একটি সম্ভাবনাময় খাত। চামড়াশিল্পে সারা বছর ধরে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রায় অর্ধেক জোগান আসে প্রতিবছর ঈদ-উল-আজহা উৎসবে কোরবানির পশুর চামড়া থেকে। এ সময় কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হলে একদিকে মূল্যবান কাঁচামাল সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে এবং কোরবানিকৃত পশুর চামড়া বিক্রির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আর্থিকভাবে উপকৃত হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের দাম বেশি। কেননা, কৃত্রিম চামড়ার কারণে প্রকৃত চামড়াজাত জুতাসহ অন্যবিধ পণ্য দ্রব্য বর্তমানে বিলাসপণ্য হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে এবার যেন কোন সিন্ডিকেট গড়ে উঠতে না পারে সেটিই প্রত্যাশা। বিগত দু’তিন বছরের চিত্র আশাপ্রদ ছিল না মোটেও। নির্ধারিত দর মেনে চামড়া বেচাকেনা হয়নি। প্রচুর পশু কোরবানি হয়েছিল। খুচরা বাজারে চামড়ার সরবরাহ ছিল আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু ট্যানারি মালিক, আড়তদার, চামড়া রফতানিকারক ও লবণ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট চামড়ার দাম নিয়ে কারসাজি করেছিল। ফলে কাঁচা চামড়া নিয়ে খুচরা ব্যবসায়ীদের বিপাকে পড়তে হয়েছিল। কয়েক বছর ধরেই ঈদ-উল-আজহায় আগের বছরের চেয়ে কমিয়ে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে। ফলে ব্যবসায়ীরা পানির দরে কাঁচা চামড়া কেনার সুযোগ পাচ্ছেন। এবার তার পুনরাবৃত্তি হবে না, এমনটাই শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের প্রত্যাশা। চামড়ার বাজার উন্নত ও স্থিতিশীল রাখা জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থেই প্রয়োজন।