সাত সমস্যায় স্থবির উপজেলা পরিষদ

41

স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না উপজেলা চেয়ারম্যানরা
সমীকরণ প্রতিবেদন:
‘বিদ্যমান আইন অনুযায়ী হস্তান্তরিত উপজেলা পর্যায়ের ১৭ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মকাণ্ড দেখভাল করার কথা উপজেলা পরিষদের। এসব বিভাগের উপজেলা পর্যায়ের কমিটি প্রধান হওয়ার কথা উপজেলা চেয়ারম্যানদের। কিন্তু বাস্তবতা হল উল্টো। বর্তমানে উপজেলা পর্যায়ের কমবেশি ১২০টি কমিটির সভাপতিই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। কমিটির সদস্য সচিব এসব বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ফলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েও উপজেলা চেয়ারম্যানদের কোনো আর্থিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই।’ অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে কথাগুলো বললেন জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সোলায়মান হোসেন। সোলায়মান হোসেনের সঙ্গে একমত পোষণ করেন জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবু নাসের বাবুল। তিনি বলেন, আইনের ২৫ ধারা অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংশ্লিষ্ট উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা হবেন এবং পরিষদ উপদেষ্টার পরামর্শ গ্রহণ করবেন। আইনের ৪২ ধারার একটি অংশে বলা হয়েছে, পরিষদ তার প্রতিটি উন্নয়ন পরিকল্পনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের সুপারিশ গ্রহণ করে এর অনুলিপি সরকারের কাছে পাঠাবে।
এছাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারও (ইউএনও) প্রত্যক্ষ প্রভাব থাকে পরিষদ পরিচালনায়। এর মাধ্যমে উপজেলা পরিষদের কার্যত কোনো ক্ষমতা থাকে না। সংসদ সদস্যের কথার বাইরে এবং ইউএনও’র ইচ্ছার বিরুদ্ধে চেয়ারম্যানরা কিছুই করতে পারেন না। তাদের মতে, স্থানীয় সংসদ সদস্য, ইউএনও’র নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না উপজেলা চেয়ারম্যানরা। পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছেও অনেকাংশেই জিম্মি স্থানীয় সরকারের এই স্তরটি। সংসদ সদস্যদের পরামর্শ ছাড়া পরিষদ কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। আবার ইউএনও পরিষদকে সাচিবিক সহায়তা দেয়ার কথা থাকলেও মূলত তারাই আর্থিক ও প্রশাসনিক অধিকাংশ ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। ফলে চেয়ার থাকলেও হাতে ক্ষমতা নেই উপজেলা চেয়ারম্যানদের। এমতাবস্থায় উপজেলা পরিষদকে কার্যকর ও গতিশীল করতে সাতটি সমস্যা চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশন। এসব সমস্যার সমাধান চেয়ে আজ (মঙ্গলবার) দুপুরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী তাজুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন তারা। অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হারুন অর-রশীদ হাওলাদার ও সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে উপজেলা চেয়ারম্যানরা মন্ত্রীর সঙ্গে মাঠপর্যায়ের নানা সমস্যা তুলে ধরবেন।
হারুন-অর-রশীদ হাওলাদার বলেন, ‘উপজেলা পরিষদ শক্তিশালী হওয়ার প্রধান অন্তরায় বিদ্যমান আইন। আইন সংবিধানকে লঙ্ঘন করতে পারে না। আবার পরিপত্র দ্বারা আইনকে রদ করা যায় না। কিন্তু উপজেলার ক্ষেত্রে এমনই হচ্ছে। আমরা ৭টি সমস্যা চিহ্নিত করেছি। এসব নিয়ে প্রথমবারের মতো স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছি আমরা। সেখানে মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো তুলে ধরা হবে।’ জানা যায়, উপজেলা পরিষদ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে যে ৭টি সমস্যার কথা তুলে ধরা হবে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- সংবিধানের সঙ্গে স্থানীয় সরকার (উপজেলা) আইনের সাংঘর্ষিক দিক। ওই আইনের কিছু ধারা পরিপত্র ও প্রজ্ঞাপন দ্বারা বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। উপজেলা পরিষদের কার্যক্রম বাস্তবায়নে বড় বাধা পরিপত্র দ্বারা গঠিত প্রায় ১২০টি কমিটি। অধিকাংশ কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও সদস্য সচিব সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা। কমিটিগুলোতে চেয়ারম্যানদের কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। উপজেলা পরিষদ আইনের তৃতীয় তফসিলের উপজেলাধীন ১৭টি বিভাগ, বিভাগসমূহের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও তাদের কার্যাবলি উপজেলা পরিষদের কাছে সুস্পষ্টভাবে হস্তান্তরিত। কিন্তু তাদের বিষয়ে আর্থিক ও প্রশাসনিক কোনো ক্ষমতা নেই চেয়ারম্যানদের। কিছু কমিটিতে চেয়ারম্যানকে উপদেষ্টা রাখা হয়েছে। যার কোনো আইনি বিধান নাই। উপজেলা পরিষদের রাজস্ব তহবিল ব্যবস্থাপনার নীতিমালার ৪ ধারায় আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা হিসেবে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে করা হয়েছে। অথচ ইউনিয়ন পরিষদের চৌকিদার দফাদারদের বেতন ভাতাদির যে অংশ এখান থেকে পরিশোধ করা তার আয়ন-ব্যয়ন কর্মকর্তা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা প্রকৌশলী। এসব সমস্যা সমাধান করতে আইন সংশোধনের দাবি জানানো হবে।
এ প্রসঙ্গে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘উপজেলা পরিষদের গঠন ত্রুটিপূর্ণ এবং নিয়ন্ত্রিত বলেই এটি একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়ায়নি। কারণ স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং ইউএনওরাই পুরো পরিষদ নিয়ন্ত্রণ করছেন। চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যান কার্যত ক্ষমতাহীন। তাদের চেয়ার আছে, কিন্তু ক্ষমতা নেই। আমি ২০০৭ সালে ড. শওকত আলীর নেতৃত্বে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী ও গতিশীলকরণের কমিটিতে ছিলাম। সেখানে আমরা উপজেলা পরিষদে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের পরিবর্তে প্রতি ইউনিয়ন থেকে একজন করে সদস্য সরাসরি ভোটে নির্বাচিত করার সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু সরকার তা আমলে নেয়নি। আমি মনে করি সেটাই হওয়া উচিত। কারণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা নিজেদের স্বার্থে ইচ্ছা করলে উপজেলা পরিষদকে অকার্যকর করে দিতে পারেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা এমনও বলেছে- উন্নয়ন যা করার ইউনিয়ন পরিষদ করছে, উপজেলা পরিষদে কোনো কার্যক্রমের দরকার নেই। দেশে এমনও নজির রয়েছে যে, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানরা অনাস্থা প্রস্তাব দেয়ায় উপজেলা চেয়ারম্যান পদত্যাগে বাধ্য হয়েছেন।