সর্বনাশা বেকারত্বে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে

227

বেকারত্বে সামাজিক অস্থিরতা বাড়ছে দেশের বেকার সংখ্যার এই বৃদ্ধি কেন? এই প্রশ্নের অঢেল উত্তর থাকলেও আপাত দৃষ্টিতে বলা যাচ্ছে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ উদ্যোক্তা নেই। কারণ দেশের মানুষ ইনভেস্ট করতে ভয় পায়। তারা অন্যের ওপর নির্ভরশীল হতে চায়। তাই উদ্যোক্তা হওয়ার চেয়ে চাকরি করতে বেশি সুবিধাজনক মনে করেন। বেকারত্বের এই সমস্যা-সংকট দেশে একদিনে তৈরি হয়নি। আর এ কারণেই কম-বেশি বিশ্বের দেশে দেশে বেকারত্ব বাড়ছে। তবে আমাদের মতো দেশে এই শব্দটা শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত নির্বিশেষে সবার জন্য একটা বিষফোঁড়া। কিন্তু বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রের জন্য বেকারত্ব রীতিমতো ‘বিষফোঁড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই বেকার সমস্যা সবচেয়ে বেশি। দেশে নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ অনেক বেশি। সে কারণে লেখাপড়া শেষে এরকম পরিবারের সন্তানকে চাকরির জন্য বেরিয়ে পড়তে হয় দ্রুত। বেকারত্বের কারণে সমাজে অস্থিরতা, সহিংসতা, অপরাধপ্রবণতা, মরণ নেশা ইয়াবাসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মাদকের বিস্তার ঘটছে। বেকার যুবক-যুবতী, তরুণ-তরুণীসহ অনেক বয়স্ক মানুষ জড়িয়ে যাচ্ছে মরণ নেশা মাদক ইয়াবা সেবন ও এর ব্যবসায়। দেশে বেকারত্ব সম্পর্কে বলা যায়, চাহিদা অনুসারে দেশে হু হু করে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। এর চেয়ে অনেক বেশি হারে বাড়ছে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা। কিন্তু সম্পদের সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামো সমস্যা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট আর উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতায় বাড়ছে না বিনিয়োগ। সৃষ্টি হচ্ছে না আশাতীত হারে নতুন কর্মক্ষেত্র। ফলে কর্মসংস্থান হচ্ছে না প্রয়োজন অনুসারে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, বিশ্বে বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকায় ১২তম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে গত এক দশকে বেকারত্ব বেড়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। যুব মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে দেশে বর্তমানে ১৮ থেকে ৩৫ বছর পর্যন্ত যুব পুরুষ ও মহিলার সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটি। আগামী বছর এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় পাঁচ কোটিতে। ইউএনডিপি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে এদের মধ্যে বেকারের সংখ্যা সাড়ে তিন কোটি। তার মধ্যে শিক্ষিত বেকার হচ্ছে ২ কোটি ২০ লাখ। অন্যদিকে দেশে পরিবারের সংখ্যা সোয়া পাঁচ কোটি। প্রত্যেক পরিবার থেকে একজনকে চাকরি দিতে হলে সোয়া পাঁচ কোটি লোককে চাকরি দিতে হয়, যেটা বাংলাদেশের বাস্তবতায় খুবই কঠিন। দেশে বেকারের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। স্বল্পশিক্ষিতের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিত কর্মহীনের সংখ্যাও বাড়ছে। সেই সঙ্গে ছোট হয়ে আসছে কর্মসংস্থানের পরিধি। কাজের বাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা সংগতিপূর্ণ না হওয়ায় দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রতিবছরই উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক বেকার থাকছেন অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। বিবিএস শ্রমশক্তি জরিপ ২০১০ অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে শ্রমশক্তির পরিমাণ ৫ কোটি ৬৭ লাখ। এর মধ্যে ৫ কোটি ৪১ লাখ মানুষের কাজ আছে। এর অর্থ মাত্র ২৬ লাখ মানুষ বেকার। তবে পরিবারের মধ্যে কাজ করে কিন্তু কোনো মজুরি পান না, এমন মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ১১ লাখ। এ ছাড়া আছে আরো ১ কোটি ৬ লাখ দিনমজুর, যাদের কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রকৃতপক্ষে দেশে বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। এর সঙ্গে নতুন করে প্রতি বছর ১৩ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। এমনি অবস্থায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে চাপ পড়বে অর্থনীতির ওপর। অবশ্য আশার কথা হচ্ছে দেশে কর্মসংস্থানের হার ২ শতাংশ বাড়ানো গেলে প্রবৃদ্ধির হার ৮ শতাংশে উন্নীত হবে।