সরকারি সংস্থার সমন্বয়হীনতায় পেঁয়াজে নিয়মিত সংকট

65

সমীকরণ প্রতিবেদন:
দেশে কয়েক বছর ধরেই আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে এসে পেঁয়াজের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে নিয়মিতভাবে। দেশী ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে পণ্যটির আমদানিতে ভারতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতাকে। এজন্য পেঁয়াজ আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের পাশাপাশি পণ্যটির উৎপাদন বাড়ানো, বিপণন ও তদারকি ব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য ঠেকানোসহ বেশকিছু সুপারিশ করা হয়। কিন্তু সরকারি যেসব সংস্থার এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা, সেগুলোর মধ্যকার সমন্বয়হীনতার কারণে এর কোনোটিই এখনো বাস্তবায়ন করা যায়নি। এ সমন্বয়হীনতার কারণে আমদানিতে এক দেশের ওপর নির্ভরশীলতা যেমন কাটানো যায়নি, তেমনি দূর করা যায়নি উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিপণনের প্রতিবন্ধকতাগুলোও। বাজার বিশেষজ্ঞরাও পেঁয়াজের বাজারে প্রতি বছর নিয়মিতভাবে সংকট তৈরির পেছনে মূলত সরকারি সংস্থাগুলোর এ সমন্বয়হীনতাকেই দায়ী করছেন। পেঁয়াজের মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ উৎপাদন হয় বাংলাদেশেই। তার পরও বাজারে প্রধান প্রভাবক হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত থেকে আমদানীকৃত পেঁয়াজ। বিষয়টিকে দেশের পেঁয়াজ বাজারের প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে ২০১৩ সালেই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি)। প্রতিবেদনে আমদানিতে ভারতের ওপর অতিনির্ভরশীলতার পাশাপাশি দায়ী করা হয় অক্টোবর ও নভেম্বরে বাজারে সরবরাহ ধরে রাখা নিয়ে সমন্বয়হীনতাকে। উপকরণ সহায়তা ও সমন্বিত নীতির প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে দ্রুত কাজে লাগিয়ে এ সংকটকে সহজেই মোকাবেলা করা সম্ভব বলে মত দেয়া হয় প্রতিবেদনে।
এর কয়েক বছরের মাথায় এ সংকট নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস)। সেটিতেও আমদানিতে একক দেশ-নির্ভরতার বিষয়টিকে বাজার অস্থিতিশীলতার জন্য দায়ী করা হয়। পাশাপাশি উঠে আসে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং মূল্য নিয়ন্ত্রণে তদারকির অভাব ও নানা দুর্বলতার কথাও। একই কথার পুনরাবৃত্তি দেখা যায় বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে। সমস্যা থেকে উত্তরণে এসব প্রতিবেদনে অত্যাবশ্যকীয় একটি ভোগ্যপণ্য হিসেবে পেঁয়াজের উৎপাদন, বিপণন ও আমদানি-সংক্রান্ত নানা সুপারিশও করা হয়েছে। কিন্তু এসব নীতি-সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নীতি-সমন্বয়হীনতার কারণে। ফলে কাটানো যাচ্ছে না পেঁয়াজের বাজার সংকটও। বছরের এ সময় বিশেষ করে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পেঁয়াজের বাজার মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে যায়। ভারত সরকার কোনো কারণে পণ্যটির রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা বা সীমা আরোপ করলেই বাংলাদেশে পেঁয়াজের মূল্য হয়ে ওঠে আকাশচুম্বী। বাজারের এ প্রবণতা সবচেয়ে প্রকট হয়ে উঠেছে ২০১২ সালের পর থেকে। গত এক দশকে বেশ কয়েকবার পণ্যটির রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ভারত। সর্বশেষ গত বছর এ নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশের বাজারে পেঁয়াজের কেজিপ্রতি দাম ৩০০ টাকায় উঠে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি বাজার তদারকির অভাব ও ব্যবসায়ীদের অতিমুনাফার প্রবণতাই ওই সময় পণ্যটির মূল্যকে অস্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল। আগের বছরগুলোতেও এ সংকট দেখা গিয়েছিল নানা মাত্রায়।
দেশে প্রতি বছর গড়ে ৮-১০ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে। আমদানিতে ব্যয় হচ্ছে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। পণ্যটির মোট আমদানির ৭৫-৮০ শতাংশই আসছে ভারত থেকে। চীন থেকে আসে ১৫-১৯ শতাংশ। এর বাইরে মিসর, অস্ট্রেলিয়া, মিয়ানমার, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য দেশ থেকে আনা হয় যৎসামান্য পরিমাণে। এ একাধিপত্যের কারণে ভারতে উৎপাদন কমে যাওয়া, শুল্কারোপ, বন্দর জটিলতা ইত্যাদি যেকোনো সমস্যা দেখা দিলেই তা বাংলাদেশে পেঁয়াজের মূল্যে খুব দ্রুত প্রভাব ফেলছে। এ কারণে দ্রুত পণ্যটির আমদানি বাজার বহুমুখী করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি বিপণন প্রক্রিয়ার সমন্বয় সাধন করা গেলেই এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকায় তা কাটিয়ে ওঠা যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন তথ্য নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উপাত্তে বেশ গরমিল রয়েছে। এ গরমিলের কারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য আমদানি-সংক্রান্ত সঠিক ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণও বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পণ্যটির উৎপাদন তথ্যের গরমিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সঙ্গে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পেঁয়াজের উৎপাদন তথ্যের দূরত্ব কয়েক বছর ধরে ক্রমেই বেড়ে চলেছে। গত কয়েক বছরে সে পার্থক্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় তিন-পাঁচ লাখ টনে। বিবিএসের হিসাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ১৮ লাখ টন। ডিএইর হিসাবে তা প্রায় ২৩ লাখ টন। এক্ষেত্রে বৈদেশিক বাণিজ্যের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে এখন পোস্ট হারভেস্ট লস ও অন্যান্য ক্ষতি বাদ দিয়ে বিবিএসের হিসাবের কাছাকাছি তথ্যই গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে উৎপাদন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও মানসম্মত বীজের অভাব। তথ্যমতে, দেশে পেঁয়াজ উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে শ্রমিকদের পেছনে, যা মোট উৎপাদন খরচের প্রায় ৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন ও বিপণনে বেসরকারি খাতকে খুব একটা আকৃষ্ট করা যাচ্ছে না। আবার সরকারিভাবেও বীজ উৎপাদনে খুব বেশি নজর নেই। অথচ এসব বিষয়ে যথাযথ নীতিসহায়তা পেলেই দেশকে পেঁয়াজ উৎপাদনে স্বয়ম্ভর করে তুলতে পারতেন কৃষকরা। উন্নত জাতের ভালো বীজ কাজে লাগিয়ে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে দেশে। কিন্তু সেখানেও রয়েছে সংকট। দেশে প্রতি বছর পেঁয়াজ বীজের চাহিদা রয়েছে ১ হাজার ১০০ টন থেকে ১ হাজার ৩০০ টন পর্যন্ত। কিন্তু সরকারিভাবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) উৎপাদন করে পাঁচ-সাত লাখ টন। অন্যদিকে বেসরকারিভাবে প্রধানত কয়েকটি কোম্পানি ৫০-৫৫ টন বীজ উৎপাদন করে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) সাবেক মহাপরিচালক ড. আবুল কালাম আযাদ বলেন, পেঁয়াজ এখন রাজনৈতিক পণ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশেই উৎপাদনের মাধ্যমে স্বয়ম্ভরতার কোনো বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে চালের মতো সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আশার বিষয় হলো দেশে গত কয়েক বছরে যে হারে উৎপাদন বেড়েছে, তাতে ১০-১২ লাখ টনের ঘাটতি খুব সহজে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পূরণ করা সম্ভব। এজন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বীজ সরবরাহ বৃদ্ধি ও কৃষকের কাছে তা পৌঁছাতে হবে। দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এমন জাত আবাদ জনপ্রিয় করতে হবে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে আবাদযোগ্য বারি-৫, বারি-২ ও বারি-৩ জাতকে কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় করা যেতে পারে। শীতকালে আবাদ এলাকা বাড়াতে হলে তাহেরপুরী জাতের পাশাপাশি বারি-১ জাতটিরও সম্প্রসারণ করতে হবে। এছাড়া কৃষকের আর্থিক উদ্দীপনা হিসেবে ৪ শতাংশ সুদে যে ঋণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, সেটি প্রকৃত পেঁয়াজ চাষীদের কাছে পৌঁছাতে হবে। পাশাপাশি জাতীয়ভাবে চালের মতো পেঁয়াজের মজুদাগার নির্মাণ বা কৃষক পর্যায়ে সংরক্ষণাগার তৈরিতে নজর বাড়াতে হবে।
এ বিষয়ে ইফপ্রির কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. আখতার আহমেদ বলেন, চাহিদা যে হারে বাড়ছে ঠিক সে হারে উৎপাদন না বাড়ার কারণেই আমদানি নির্ভরশীলতা থেকে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ। পণ্যটির আমদানিতে ভারতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতার কারণে রফতানিকারক দেশটি দাম বাড়ানোয় সুযোগ নিচ্ছে। অন্যদিকে সরবরাহ সংকট দেখিয়ে দেশের মধ্যস্বত্বভোগীরা দাম বাড়ায়। ফলে একদিকে আমদানি পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিমুনাফার প্রবণতার কারণে বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। দেশের বাজারে একটি নির্দিষ্ট সময়েই পেঁয়াজের দাম হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে উৎপাদনে জোর দেয়ার পাশাপাশি অবশ্যই আমদানির বাজার বহুমুখী করতে হবে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে পণ্যটির মজুদ বাড়াতে হবে। বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারি ব্যবস্থাপনা জোরদার করা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অযৌক্তিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারের উদ্যোগ দৃশ্যমান করতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে কৃষকের উন্নত বীজ ও উন্নত প্রযুক্তি সরবরাহ করতে হবে। আবার উৎপাদন মৌসুমে কৃষককে দামের সুরক্ষাও দিতে হবে। তবে আশার আলো দেখাচ্ছে নতুন এক গবেষণার তথ্য। এতে বলা হয়েছে, দেশে আবাদি জমি না বাড়িয়ে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। বিশেষ করে শীতকালে আখের সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে আবাদ করা যেতে পারে পণ্যটি। আবার গ্রীষ্মকালে আদা, হলুদ ও মরিচের সঙ্গেও উৎপাদন করা সম্ভব। কৃষকের পণ্যের দামের নিশ্চয়তা দেয়ার পাশাপাশি মজুদ সক্ষমতা বাড়ানো গেলে পেঁয়াজের উৎপাদনে স্বয়ম্ভরতা অর্জন কয়েক বছরের মধ্যেই সম্ভব।
এ বিষয়ে ডিএই মহাপরিচালক ড. মো. আবদুল মুঈদ বলেন, সব ধরনের তথ্যগত বিষয়গুলো সমাধান করা হয়েছে। পোস্ট হারভেস্ট লস বাদ দিয়ে প্রকৃত বা শুকনো পেঁয়াজের উৎপাদনের তথ্য হিসাবে নেয়া হচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে স্থানীয় উন্নত জাত, বিশেষ করে তাহেরপুরী ও ফরিদপুরী জাত সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন হাইব্রিড বীজ কৃষকের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। কম জমিতে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়াতে আমরা তৎপর। ফসল ওঠার মৌসুমে কৃষক যাতে দাম পায়, সে ব্যবস্থাও আমরা করছি। পাশাপাশি গত মৌসুম থেকে গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে ব্যাপক আকারে পেঁয়াজের উৎপাদনে জোর দেয়া হচ্ছে।