সঙ্কটে শিক্ষা

61

করোনা মহামারীর দুঃসহ সংক্রমণে স্বাস্থ্যঝুঁকির বিপন্নতার মাঝেও সবচেয়ে বেহাল অবস্থায় রয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীরা। ৮ মার্চ থেকে সংক্রমণ শুরু হলে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১৭ মার্চ একযোগে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর পর থেকেই দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নেমে আসে স্থবিরতা। অগণিত শিক্ষার্থী তাদের মূল্যবান সময় ব্যয় করছে ঘরে বসেই। শিক্ষা পাঠক্রম থেকে বঞ্চিত হওয়া ছাড়াও নিয়মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেয়া সেও এক অচলায়তনের মোড়কে। ইতোমধ্যে সংসদ টিভির মাধ্যমে সরকারী নির্দেশে অনলাইনভিত্তিক ক্লাস নেয়া শুরু হলেও তা কতখানি সফল এবং সর্বজনীন হয়েছে, বলা মুশকিল। প্রশ্ন উঠেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার্থী থাকলেও অনেকের বাসায় টিভি নেই। আবার যাদের টিভি আছে সেখানে তথ্যপ্রযুক্তির বিপন্নতায় সংসদ টিভি দেখাও যায় না। সঙ্গত কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে সেভাবে যুক্ত হতে পারছে না। বেসরকারী সংস্থা ব্র্যাকের এক পরিসংখ্যান জরিপে দেখা যায়, সংসদ টিভি ও অনলাইনে ক্লাস অধিকাংশ শিশুকে পাঠক্রমের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করেছে। প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাসে তেমন আকর্ষণ বোধ করছে না। ব্র্যাক আরও জানায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবিধিকে মেনে চলে সিংহভাগ ঘরে থাকলেও ১৮% শিশু-কিশোর বাইরে যাচ্ছে। আর ৫৬% শিক্ষার্থীই অনলাইন ক্লাসে মনোযোগী হতে পারছে না। ঈদ-উল-আজহা পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের ছুটি বাড়ানো হয়েছে। আবার করোনার বহুল সংক্রমণ বিবেচনায় ছুটির শেষ কোথায় তাও অনিশ্চিত। মফস্বলের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পাঠ্যক্রম বিপন্নতার প্রভাব পড়ছে সবচেয়ে বেশি। সংসদ টিভিতে ক্লাস দেখছে মাত্র ৪৪%। বাকিরা দেখতে পারছে না। আবার কেউ কেউ মনোসংযোগের অভাবে শিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে ব্যর্থ হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতে লোডশেডিংয়ের প্রকোপ বেশি থাকায় সংসদ টিভির কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ আছে।
করোনাভাইরাস সার্বিক অর্থনীতিতেও যে বিপর্যয় ডেকে এনেছে সেখানে হতদরিদ্র আর বেকার সমস্যার আশঙ্কাও প্রতিনিয়ত দৃশ্যমান হচ্ছে। সুবিধাবঞ্চিত নিম্নবিত্তের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার আশঙ্কাও আছে। ‘বাংলাদেশের শিক্ষার ওপর কোভিড-১৯ এর প্রভাব’ শিরোনামে ব্র্যাক তথ্য- উপাত্ত নিয়ে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সেখানেই সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনার এমন অসঙ্গতির চিত্র উঠে আসে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের অবস্থাও রয়েছে সঙ্কটে। মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ পেলেও ভর্তির কোন কার্যক্রম দৃশ্যমান হয়নি। একাদশ শ্রেণীর পরীক্ষাও আটকে আছে। উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষাও অনিশ্চয়তার কবলে। উচ্চ শিক্ষার পাদপীঠ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম বন্ধ থাকার আশঙ্কার মাঝে সেশন জটের দুর্গতিকেও আমলে নিতে হচ্ছে। বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদিও অনলাইনভিত্তিক ক্লাস ও পরীক্ষা গ্রহণে এগিয়ে গেছে। বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ্যক্রম এখন অবধি দৃশ্যমান হয়নি। ক্লাস শুরু করার কোন সিদ্ধান্ত কিংবা কর্মসূচীও দেখা যাচ্ছে না। বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর শুক্র-শনি ছুটির দিনে বাড়তি ক্লাস নিয়ে পাঠ্যক্রমের ঘাটতি পোষানোর পদক্ষেপ নেয়া হবে। সেখানেও রয়েছে অনিশ্চয়তার দুর্গম প্রাচীর। করোনার দুর্যোগ সর্বব্যাপী ও সর্বগ্রাসী সন্দেহ নেই। তবে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা যত না বিপর্যস্ত ততধিক অধোগতির শিকার হচ্ছে সার্বিক শিক্ষা কার্যক্রম। যে মূল্যবান সময়টুকু পার করছে আপামর শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে কিংবা অলস জীবনযাপন করে, তার মূল্য যে কিভাবে দিতে হতে পারে তা ধারণা করাও কঠিন। প্রতীয়মান হচ্ছে শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি বিপন্নতার শিকার হবে আগামীতে।