সংকটে পড়ে কাহিল মধ্যবিত্ত

34

মানুষকে প্রতিদিন খাবার খেতে হয়। খাবার কেনার মতো অর্থ থাকুক আর না থাকুক খাবারের সংস্থান তাকে করতেই হয়। খাবারের জন্য প্রয়োজনে যাদের অন্যের সামনে হাত পাততে হয় তাদের আমরা ভিক্ষুক বলি। নিয়মিতভাবে হাত পাততে পাততে একসময় তাদের কাছে ব্যাপারটি সহনীয় হয়ে যায়। ভিক্ষা করা তাদের জন্য আর কোনো সমস্যা হয়ে ওঠে না। দেশে খাদ্যপণ্যের দাম অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এটি এখন এমন পর্যায়ে রয়েছে, যা নিম্নবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের জন্যও বিপদ ডেকে এনেছে। নিত্যখাদ্যপণ্যের প্রায় প্রতিটির দাম মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তের হাত পাতার কোনো জায়গা নেই। চাল চুলা তাদের ঠিকই আছে; কিন্তু প্রয়োজনীয় চাল-ডাল তরিতরকারির সংস্থান করতে গিয়ে তারা ফতুর হয়ে যাচ্ছেন। এতে করে মধ্যবিত্ত নামক যে ধরাণাটি রয়েছে সেটির পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ মধ্যবিত্ত মানে স্থিতিশীল চলনশীল জীবনযাপনকারী, যারা সমাজের ভারসাম্য রক্ষা করে। সংবাদমাধ্যমে মধ্যবিত্তের বর্তমান কাহিল অবস্থান নিয়ে উপর্যুপরি প্রতিবেদন প্রকাশ হচ্ছে।
মধ্যবিত্তের বর্তমান সংকটটি আমরা অনুধাবন করতে সমর্থ হবো যদি নিত্যপণ্যের দাম অব্যাহত বাড়ার গতি ও বিপরীতক্রমে আয় উপার্জন কমে যাওয়ার ধারাবাহিক চিত্রটি লক্ষ করি। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যে জানা যাচ্ছে, গত এক সপ্তাহে যেসব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে সেগুলো হলো- চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মাছ, মুরগি, দুধ ও ডিমসহ একান্তই জীবন নির্বাহকারী খাদ্যপণ্য। এসব পণ্যের দাম বৃদ্ধির তালিকায় রয়েছে বছর ধরে। অর্থাৎ এগুলোর দাম একবার বৃদ্ধির পর সেটি আবার পুরনো দামে স্থিত হচ্ছে না। বরং একবার বাড়ার নির্ধারিত কিছু দিন পর আবার সেটির দাম বাড়ছে। এর সাথে শাকসবজি নিত্যদিনের তরকারির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। শীতের সময়ে কিছু সবজির প্রচুর ফলন হয়। এ সময় বাজারে প্রাচুর্য থাকায় তার দাম সহনীয় থাকে।
বাস্তবতা হলো, এখন আর আগের মতো শীতের মৌসুমি সবজির দাম কমে না। সবসময় পাওয়া যায় এমন সবজির দামও আগের তুলনায় বাড়তি। করলা, বরবটি, চিচিঙ্গা, ঝিঙাসহ সাধারণ অনেক সবজির দাম এখন প্রায় আকাশ ছোয়া। অথচ এসব সবজি মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজন। এগুলোর দাম এখন মাছের দামের পর্যায়ে উঠে এসেছে। অন্য দিকে, মাছের দামও এর সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে। এসব সবজির দাম কৃষক পর্যায়ে বাড়লে এর সুফল কৃষিতে পড়বে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, উৎপাদকরা বাড়তি দাম পাচ্ছে না। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাত রয়েছে। মূলত বাড়তি দামটি তাদের পকেটে যায়। এখন শুধু খাদ্য কিনতে গিয়ে মধ্যবিত্ত কুপোকাত হয়ে যাচ্ছে। নিত্যদিনের অন্যসব চাহিদা তাদের পক্ষে আর পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
আমরা দেখেছি, বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তেমন বাড়ছে না। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান। মধ্যবিত্তের আয় উপার্জনের পথগুলো সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। ঠিক এ সময় নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে চলেছে। এর নেতিবাচক প্রভাবে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি দিশেহারা অবস্থার মধ্যে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে সমাজে অস্থিরতা জন্ম নিতে পারে, যা বাংলাদেশের সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ বিকাশের পথে অন্তরায় হতে পারে।
আমরা মনে করি, নিত্যপণ্যের দাম যাতে অন্যায়ভাবে বাড়ানো না হয়, সে জন্য বাজার ব্যবস্থায় কঠোর মনিটরিং থাকা দরকার। অসাধু সুবিধাভোগীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে মধ্যবিত্তের আয়ের পথগুলো খুলে দেওয়ার জন্য সরকারকে আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।