শেখ হাসিনার অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না : খালেদা জিয়া

691

‘বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনতার ¯্রােত

সমীকরণ ডেস্ক: বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, বিএনপি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। শেখ হাসিনার অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না, হতে পারে না। যারা সামান্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই ভোট চুরি করে জিততে চায় তাদের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের মতো বৃহৎ দায়িত্ব কোন ভাবেই নিরপেক্ষ হতে পারে না। নির্বাচনে ইভিএম বাতিল ও সেনা মোতায়েন করতে হবে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দলের সমাবেশে খালেদা জিয়া এ কথা বলেন।
গতকাল রবিবার দুপুর ২টায় বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আউয়াল খানের কোরআন তেলোওয়াতের মধ্য দিয়ে জনসভার কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তরের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা মিছিল নিয়ে জনসভাস্থলে আসে। নানামুখী বাধা সত্ত্বেও ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও হাজারো নেতা-কর্মী সমাবেশে উপস্থিত হয়। বেলা তিনটার মধ্যেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মাঠ ও এর চারপাশ লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। কোথাও তিল পরিমান ঠাঁই ছিলো না। জনসভা রূপ নেয় জনসমুদ্রে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনের মূল ফটকের সামনে, মৎসভবন থেকে শাহবাগ সড়কেও জন¯্রােত গিয়ে পৌঁছায়। বেগম খালেদা জিয়া মঞ্চে উঠেন বেলা সাড়ে ৩ টায়। মুহুর্মুহু করতালির মধ্যে মঞ্চে উঠেন অফ হোয়াইট রঙের শাড়ি পরিহিতা বিএনপি চেয়ারপারসন। হাত নেড়ে নেতা-কর্মীদের অভিবাদনের জবাব দেন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসন উপস্থিত হওয়ার পর দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ভাইস চেয়ারম্যানরা প্রত্যেকে দুই মিনিট করে বক্তব্য দেন। এরপর বিকেল চারটায় প্রধান অতিথির বক্তব্য শুরু করেন খালেদা জিয়া।
প্রধান অতিথি হিসেবে ৫১ মিনিট স্থায়ী বক্তব্যে খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন, সরকারের দুর্নীতি-অপশাসন, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার পদত্যাগ, রোহিঙ্গা ইস্যুসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন সরকারের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনাদের যদি সত্যিকারের নেতা-কর্মী থাকে, তাহলে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দিন। হাসিনার অধীনে তো নির্বাচন হবেই না।’ তিনি বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নয়, যেকোনো জায়গায় সমাবেশ হলে বিএনপির নেতা-কর্মী এবং জনগণ আসবে। মানুষ বিএনপিকে ভালোবাসে। জনগণই বিএনপির ভরসা।
খালেদা জিয়া বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দিতে হবে। এ জন্য নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) ব্যবস্থা নিতে হবে। নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। এখানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের বিষয়ে সরকারকে বোঝাতে হবে। এ জন্য নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার চলবে না এবং নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের জন্য ইসিকে ভূমিকা রাখতে হবে।
সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী দেশ ও জনগণের স্বার্থে সরকারকে জাতীয় ঐক্য গড়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সরকার গণতন্ত্রকে, জনগণকে ভয় পায়। বাকশালের মতো করে অঘোষিতভাবে বাকশাল গঠন করতে চায়। গত ১০ বছরে সরকার যেসব অন্যায়-জুলুম করেছে, তার হিসাব করুক। তিনি বলেন, ‘আমি বলেছি ক্ষমা (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে) করে দেব, কিন্তু জনগণ ক্ষমা করবে না। আমরা দেশে গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে চাই।’
দেশের মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সরকারের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, দেশের মানুষ পরিবর্তন চায়। নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে এই পরিবর্তন আসবে। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে হবে। জনগণ যাকে খুশি, তাকে ভোট দেবে। তিনি বলেন, ‘হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না, হতে পারে না। এই সরকারের আমলে বিভিন্ন নির্বাচনে সরকার চুরি করে  যেভাবে নির্বাচিত হয়েছে, তা-ই প্রমাণ করে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।’
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আশ্বাস দিয়ে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, সরকার সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের হয়তো বলে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাদের বিরুদ্ধে হামলা-মামলা হবে। বিএনপি হিংসার রাজনীতি করে না। তিনি বলেন, ‘আমরা দক্ষতা-যোগ্যতা দেখব। বিএনপি বা আওয়ামী লীগ বলে কিছু নেই। দক্ষতা-যোগ্যতা দেখা হবে। বিএনপি লোক হত্যার রাজনীতি করে না। লোক হত্যার রাজনীতি করে আওয়ামী লীগ।’
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারকে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের জন্য একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা যাচাই করুন। তিনি বলেন, ‘আমরা সহিংসতার রাজনীতি করি না। আমরা আপনাদের (আওয়ামী লীগ) শুদ্ধ করব। আপনারা যে মানুষ মারেন, গুম, খুন করেন এগুলো বাদ দিয়ে আপনাদের শুদ্ধ বানাব।’
বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘চুরি করে জেতার মধ্যে আনন্দ নেই। আমরা জনগণকে নিয়ে রাজনীতি করি। জনগণের জন্য আমাদের ভালোবাসা। আমরা জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে চাই। সেই পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই।’
ইসির কাছে বিএনপি তাদের দাবির কথা বলে এসেছে জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ইসির কাছে সব দাবি বলে এসেছে বিএনপি। সুষ্ঠু নির্বাচন করতে হলে নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। তিনি বলেন, ‘সিইসি কেন ইভিএমের কথা বলেন? এর মানে তাঁরা সরকারের কথা শোনেন? ইভিএম হবে না। ভোটে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে জবাব চেয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘এই সরকার দেশ ধ্বংস করে দিয়েছে। ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়াতে চয়েছিল। আজ ৭০ টাকা চালের কেজি। মানুষ কেন ৭০ টাকায় চাল কিনে খাচ্ছে, জবাব চাই হাসিনা।’ তিনি বলেন, প্রতিটি সবজির দাম ৭০ টাকার ওপরে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এসব বন্ধ করতে সরকার কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
সরকারের কিছু ‘টাউট-বাটপার’ দেশে সংকট তৈরি করছে অভিযোগ করে খালেদা জিয়া বলেন, সরকার কৃষককে বিনা মূল্যে সার দেওয়ার কথা বলেছিল। সেখানে এখন কৃষকদের মারার ব্যবস্থা করেছে সরকার। সরকারের কাছ থেকে কৃষি ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না কৃষক। জনগণের জীবন এখন দুর্বিষহ।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মওদুদ আহমদ, জমিরউদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, অবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, খন্দকার মাহবুব হোসেন, আমানউল্লাহ, শাহজাহান ওমর, বরকত উল্লাহ বুলু, মো. শাহজাহান, এ জেড এম জাহিদ, আজম খান প্রমুখ।