শান্তিপূর্ণ জনসভায় অশান্তির ঢেউ ২০০ নেতাকর্মী আটক

26

ভারতের সাথে চুক্তি বাতিল আবরার হত্যার বিচার ও খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি
সমীকরণ প্রতিবেদন:
ভারতের সাথে বাংলাদেশের চুক্তির সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দেয়ায় বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকা-ের ঘটনায় সারাদেশের মানুষ স্তম্ভিত। প্রতিবাদ করছেন সকলেই। রাজপথের বিরোধী দল বিএনপিও সংবাদ সম্মেলন, সভা-সেমিনারে ভারতের সাথে বাংলাদেশের চুক্তি স্বার্থবিরোধী উল্লেখ করে তা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে। প্রতিবাদ জানাচ্ছে আবরার হত্যাকান্ড এবং দাবি জানাচ্ছে হত্যাকারীদের বিচারের। একই দাবিতে গতকাল শনিবার নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জনসভার ঘোষণা দেয় দলটি। দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবেই জনসভার কর্মসূচি পালন করেছেন বিএনপি নেতা-কর্মীরা। কয়েক হাজার নেতাকর্মী এই জনসভায় উপস্থিত হয়ে ভারতের সাথে চুক্তি বাতিল, আবরার ফাহাতের হত্যাকান্ডের বিচার ও বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়েছে। অথচ এই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেই লেগেছে অশান্তির ঢেউ।
ভারত চুক্তি, আবরার হত্যাকান্ডের বিচার এবং খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে জনসভার অনুমতিই পায়নি বিএনপি। শুক্রবার রাতেই অনুমতি দেয়া হবে না বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়। গতকাল শনিবার সকালে বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী ও সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুস সালাম আজাদ অনুমতির বিষয়ে পুলিশের সাথে সাক্ষাত করে। কিন্তু তখনও অনুমতি দেয়া হয়নি। পরে বিএনপি নেতারাও জনসভা করার বিষয়ে অনঢ় থাকেন। সভার মঞ্চ করার জন্য ট্রাক আনতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয় বলে জানায় বিএনপি নেতারা। সভা শুরুর আগেই দুপুর ১২টা থেকে নেতাকর্মীরা আসতে থাকেন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের দিকে। কিন্তু তখন থেকেই শুরু হয় ব্যাপক ধরপাকড়। নয়াপল্টনের প্রবেশ পথ নাইটিঙ্গেল মোড় ও ফকিরাপুলে বিএনপি নেতা-কর্মীদের বাধা দেয়া হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, এই দুটি প্রবেশ পথে মিছিল নিয়ে আসতে চাইলেই পুলিশ বাধা দিয়েছেন। পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে কেউ আসতে চাইলে তাকে আটক করা হয়। এছাড়া যে কাউকে নেতাকর্মী সন্দেহ হলেই আটক করা হয়। এছাড়া নয়াপল্টন মসজিদ গলি, হোটেল ভিক্টরি গলি, পলওয়েল মার্কেটের পাশের গলিতেও পুলিশী পাহাড়া দেখা যায়। এসব জায়গা থেকে সভা শুরুর আগেই বিএনপির প্রায় ২০ শতাধিক নেতাকর্মী আটক করা হয় বলে অভিযোগ করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করে আমরা জনগণের ক্ষোভ নিয়ে কথা বলবো সেটারও অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। রাজনৈতিক দল পুলিশকে অবহিত করেই সমাবেশ করার কথা সেখানে বিএনপির একটি শান্তিপূর্ণ জনসভা থেকে দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ জনসভা অশান্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তবে বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করেই নির্ধারিত সময়ের আগে হাজার হাজার নেতাকর্মী উপস্থিত হন নয়াপল্টনে। সমাবেশ শুরুর পরপরই একদিকে ফকিরাপুল অন্যদিকে নাইটিঙ্গেল মোড় পর্যন্ত একপাশের রাস্তা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। তারা স্লোগান দিতে থাকেন- ‘দেশবিরোধী চুক্তি মানি না, মানবো না। ভারতের দালালেরা হুশিয়ার সাবধান। আবরার হত্যার বিচার চাই, করতে হবে। খালেদা জিয়ার মুক্তি চাই, দিতে হবে’।
জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকার ভারতের সাথে জাতীয় স্বার্থ বিরোধী চুক্তি করেছে। এর বিরুদ্ধে গণঐক্য গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, ফেনীর নদীর পানি সরবারহ, চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্র বন্দর ব্যবহার, বঙ্গোপসাগরের উপকূল পর্যবেক্ষণে যৌথ রাডার স্থাপন, আমদানিকৃত এলজিপি রপ্তানি করা- এই চারটি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বিরোধী বলে আমরা মনে করি। এই চারটি চুক্তির একটিও বাংলাদেশের জনগনের স্বার্থে নয়, জাতীয় স্বার্থে নয়। আপনাদের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি এবং ভারত তোষণেরনীতি হিসেবে আপনারা এসকল চুক্তি করে এসেছেন। উদ্দেশ্য একটাই গায়ের জোরে ক্ষমতায় থাকার জন্যে। দেশের গণতন্ত্রকে আপনারা হত্যা করেছেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ২৯ তারিখে ভোট ডাকাতি করেছেন, এই ডাকাতির সরকার আজকে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আমাদের স্বার্থ বিকিয়ে দিচ্ছেন।
ড. খন্দকার মোশাররফ বলেন, এদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের অধিকার আছে এসব চুক্তির প্রতিবাদ করার। আমরা বলতে চাই, আমরা এই প্রতিবাদ আর সমাবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকব না। এদেশের জনগণ যে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে যে দেশ স্বাধীন করেছিলো, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হতে পারে, সম্প্রসারণবাদ, আধিপত্যবাদ বাংলাদেশকে গ্রাস করতে পারে। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের মানুষ বসে থাকবে না। সরকারের ভারতপ্রীতি নীতির কঠোর সমালোচনা করে খন্দকার মোশাররফ বলেন, ২০০১ সালে আজকের প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, গ্যাস ভারতকে না দেয়ার কারনে আমি ক্ষমতায় আসতে পারি নাই। আজকে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন এসেছে, আপনি আপনার দেশের আমদানি করা এলপিজি দিয়ে তাহলে কী সেই ২০০১ সালে সেই যে আপনি গ্যাস দেন নাই সেটার আপনি খেসারত দিচ্ছেন কিনা। এই চুক্তি কত বড় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী চুক্তি এবং আমাদের দেশে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক চুক্তি। বুয়েটের মেধাবী ছাত্র সেটার প্রতিবাদ করে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলো। এজন্য আজকে তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। আবরারের এই স্ট্যাটাস এদেশের জনগণের মনের কথা, এদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষের কথা, আবরারের একথা এদেশে আধিপাত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা।
বিএনপির এই নেতা বলেন, আপনারা শুধু আবরারকে হত্যা করে নাই, তাকে হত্যা করে আপনারা বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থকে হত্যা করেছেন, আপনারা এদেশে আধিপত্যবাদকে বিস্তার করার জন্য আবরারকে হত্যা করেছেন। আজকে সারা বাংলাদেশের মানুষ, ছাত্র সমাজ ফুঁসে উঠেছে এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে। আবরার রক্ত দিয়ে আপনাদের পতনের বীজ বপন করে গেছে। বাংলাদেশের জনগণ, দেশপ্রেমিক, ছাত্রসমাজ তারা ঐক্যবদ্ধ হবে, তার রক্ত বৃথা যেতে দেবে না।
স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, এই সরকার দুর্নীতিতে ডুবে গেছে। তারা এমন ফাঁদে পড়েছে, সেই ফাঁদ থেকে তাদের কোনো নিষ্কৃতি নাই, এই ফাঁদ থেকে তারা উঠে আসতে পারবে না। এই সরকারের পতন এখন সময়ে ব্যাপার। এই দেশের মানুষ কখনো এই ধরনের সরকারকে বরদাশ করতে পারে না। তিনি বলেন, এমন কোনো হল নাই, ডরমেটরি নাই বাংলাদেশে তাদের টর্চার সেল নাই। আজকে এই আবরারের হত্যাকান্ড সারা দেশের মানুষকে অবাক করেছে, মর্মাহত করেছে। একজন আবরার হত্যা করে কোনো লাভ হবে না, তার মতো শত শত আবরারের জন্ম দেবে। ভারতের সাথে সম্পাদিত চুক্তিরও সমালোচনা করেন সাবেক আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, তিনি বাংলাদেশের কোনো স্বার্থ বিক্রি করেন নাই। কিন্তু দেশের মানুষ বোকা নয়, তারা জানে আপনি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে বিক্রি করে এসেছেন ভারতে গিয়ে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, দুই দেশের মধ্যে বিনিময়ে চুক্তি হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী একতরফা দান করে দিয়ে আসলেন। আমি অত্যন্ত লজ্জিত যখন দেখলাম ভারতের বিমানবন্দরে লাল কার্পেট নাই, এক প্রতিমন্ত্রী তাকে (শেখ হাসিনা) অভ্যর্থনা জানাচ্ছেন। আমি লজ্জা পেয়েছি, জাতি লজ্জা পেয়েছে, দেশ লজ্জা পেয়েছে। সেখানে শেখ হাসিনা ওয়াজেদ আপনি দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গেছেন, সেখানে আমাদের ইজ্জতে লেগেছে, আমাদের মানহানী হয়েছে। তিনি বলেন, এই ধরনের নতজানু পররাষ্ট্রনীতি যদি সরকারের থাকে সেই সরকার কোনো দিন প্রতিষ্ঠা আদায় করতে পারবে না, দেয়া ছাড়া। তবে আবরারের মতো লক্ষ-কোটি আবরার জন্ম নেবে আপনার (প্রধানমন্ত্রী) অপকর্ম বাংলাদেশে সফল হতে দেবে না।
সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মুক্ত থাকলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতকে এক বিন্দু পানিও দিতে পারতেন না। এজন্য তাকে কারাবন্দি করে রাখা হয়েছে। বার বার বলার পরও তাকে মুক্তি দেয়া হচ্ছে না। তার আত্মীয়-স্বজনরা জানিয়েছেন- বেগম জিয়ার মুমূর্ষূ অবস্থা। তার হাতের আঙুল ফুলে গেছে, পা ফুলে গেছে। সমস্ত শরীরে ব্যাথা। রিজভী ভারতের সাথে করা সব চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়ে বলেন, আজকে বাংলাদেশের উপকূলে ২০টি রাডার স্থাপন বসিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হবে। আমাদের সমুদ্র বঙ্গোপোসাগর, আমাদের পানির সীমানা সেখানে পর্যবেক্ষণ করবেন ভারতীয়রা। বাহ্! আর এই চুক্তি করলেন প্রধানমন্ত্রী। কি দেশপ্রেম? অবশ্য তার কাছে এমন চুক্তি আশা করা যায়। আবরার হত্যার বিচার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে রিজভী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমি আবরার ফাহাদের মা, আমি এর বিচার করবো’। আমরা তো বিচার দেখেছি, দেখিনি? বিশ্বজিতের বিচার দেখেছি, বিএনপির উপজেলা চেয়ারম্যান নূর আহমেদ বাবুর বিচার দেখেছি। ইলিয়াস আলীর স্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘ইলিয়াস আলী গুম হয়েছে, এটা আমি দেখবো’। প্রধানমন্ত্রী এধরণের কথা সব সময় বলে এসেছেন। আপনারা দেখবেন, ৬ মাস থেকে ১ বছর পর আবরার হত্যার যারা আসামী তারা সবাই ছাড়া পাবে। জনগণের মধ্যে ধোয়াশা তৈরির জন্য এধরণের কথা প্রধানমন্ত্রী বলছেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর বিএনপির সভাপতি হাবীব উন নবী খান সোহেলের সভাপতিত্বে এবং মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার ও উত্তরের সাধারণ সম্পাদক আহসান উল্লাহ হাসানের পরিচালনায় জনসভায় বক্তব্য রাখেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবুল খায়ের ভূইয়া, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, কেন্দ্রীয় নেতা ফজলুল হক মিলন, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, আজিজুল বারী হেলাল, আবদুস সালাম আজাদ, আমিরুল ইসলাম খান আলিম, অঙ্গসংগঠনের আফরোজা আব্বাস, সাইফুল আলম নিরব, শফিউল বারী বাবু, মুন্সি বজলুল বাসিত আনজু, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, সাদেক আহমেদ খান, আবদুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল, মোরতাজুল করিম বাদরু, হাসান জাফির তুহিন, হেলেন জেরিন খান, ফজলুর রহমান খোকন, ইকবাল হোসেন শ্যামল।