রোহিঙ্গাদের ঢুকতে দেবে না বাংলাদেশ

262

ggggggসমীকরণ ডেস্ক: নতুন করে কোনো রোহিঙ্গাকে ঢুকতে দেবে না বাংলাদেশ। রাখাইন রাজ্যে চলমান নির্যাতন অব্যাহত থাকলে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশের চেষ্টা বাড়তে পারে- এমন আশংকায় সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এরই মধ্যে তিন প্লাটুন বিজিবি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি জোরদার করা হয়েছে কোস্টগার্ডের টহল। গত কয়েকদিনে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করার সময় প্রায় তিন শতাধিক রোহিঙ্গাকে পুশব্যাক করেছেন বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষীরা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ২৩ ও ২৪ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় মিয়ানমারের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক স্থগিত করেছে বাংলাদেশ। জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শনিবার বলেন, ‘আমরা কাউকে ঢুকতে দিচ্ছি না। মিয়ানমার নিজেরাই এ সমস্যার সমাধান করুক। কিংবা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে পাঠিয়ে দিক। আমাদের দেশে এমনিতেই লাখ লাখ রোহিঙ্গা আছেন। তাদের নিয়েই আমরা বিপদে আছি। নতুন কোনো রোহিঙ্গা আশ্রয় দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।’ শুক্রবার ইউএনএইচসিআর এক বিবৃতিতে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। মিয়ানমারের সরকারকে সেখানে নিয়ম অনুযায়ী মানুষদের রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে সেখানকার সহিংস পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে যারা বাংলাদেশে আসার চেষ্টা করছে তাদের জন্য বাংলাদেশ সরকার যেন নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে, সে বিষয়ে আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক স্থগিত করেছে বাংলাদেশ। আগামী ২৩ ও ২৪ নভেম্বর মিয়ানমারের রাজধানী নেপিতোতে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এ ব্যাপারে গত সপ্তাহে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিয়ো মিন্ট থান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে বৈঠক করার ব্যাপারে আগ্রহ নিয়ে এজেন্ডা জানিয়েছিলেন। রাষ্ট্রদূত এও বলেছিলেন, রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনী যে অভিযান পরিচালনা করছে, সেটা নিয়ম মেনেই করা হচ্ছে। শনিবার ঢাকায় সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এত কম সময়ে বাংলাদেশের পক্ষে বৈঠকের প্রস্তুতি গ্রহণ করা সম্ভব নয়। ফলে আমরা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে বৈঠকটি স্থগিত করে নতুন দিনক্ষণ নির্ধারণ করতে বলেছি। ঢাকার কর্মকর্তারা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দু’দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক থেকে তেমন কোনো অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। বর্তমানে সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে অভিযান পরিচালনা করছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। এ অভিযান চলাকালে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের হত্যা, বাড়িঘরে আগুন এবং নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। রাখাইন রাজ্যে ৯ অক্টোবর সীমান্ত চৌকিতে সমন্বিত হামলায় মিয়ানমারের ৯ জন সীমান্তরক্ষী পুলিশ (বিজিপি) এবং পাঁচজন সেনা সদস্য নিহত হওয়ার জেরে এ অভিযান চালাচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনী। রাখাইন রাজ্যের মংডুতে সকাল-সন্ধ্যায় কারফিউ চলছে। রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলীয় গ্রামগুলোয় অভিযান পরিচালনাকালে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে অন্তত নয়জন রোহিঙ্গা মুসলমানকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে। ৯ অক্টোবর মিয়ানমারের রাখাইন সীমান্ত চৌকিতে এক হামলার জেরে অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। এর পর থেকেই সেখান থেকে নাফ নদী পার হয়ে বাংলাদেশের টেকনাফে ঢোকার চেষ্টা করে অনেকে। এদিকে নাফ নদী পারি দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকার সম্ভাব্য সব পথে নজরদারি জোরদার করেছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড।
মিয়ানমারের মুসলিম অধ্যুষিত রাখাইন প্রদেশের গ্রামগুলোয় ৯ অক্টোবরের পর অন্তত ৬৯ জনকে হত্যা করার কথা স্বীকার করে দেশটির সেনাবাহিনী। রাখাইন প্রদেশে সম্প্রতি শুরু হওয়া বিদ্রোহ দমনের অংশ হিসেবে এ অভিযান চালানো হয়েছে বলে উল্লেখ করছে সেনাবাহিনী। অপরদিকে রাখাইন রাজ্যে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিচ্ছে আইনশৃংখলা বাহিনী। রোহিঙ্গাদের হাত থেকে আত্মরক্ষার নামে এভাবে অস্ত্র তোলে দেয়ায় জাতিগত সহিংসতা বৃদ্ধির আশংকা করা হচ্ছে।
এদিকে সহিংস পরিস্থিতির কারণে হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টার বিষয়টিকে অস্বীকার করেছে মিয়ানমার। দেশটির রাষ্ট্র পরিচালিত ইংরেজি দৈনিক নিউ লাইট অব মিয়ানমার বলেছে, তদন্ত করে তারা জেনেছেন, মিয়ানমার থেকে মুসলিম সংখ্যালঘুদের পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রমের ব্যাপারটি সত্য নয়। এদিকে মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) নেত্রী অং সান সুচি রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার সুরক্ষায় কোনো অবস্থান নিতে ব্যর্থ হওয়ায় তার নোবেল পুরস্কার ফিরিয়ে নিতে করা এক আবেদনে এক লাখের বেশি মানুষ সই করেছেন।
নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের চেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা শনিবার বলেছেন, ‘নতুন রোহিঙ্গা গ্রহণ করব কিনা সে ব্যাপারে আমাদের নতুন কোনো অবস্থান নেই। বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর হওয়ায় এ ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো অবস্থান নিচ্ছে না। আমাদের অবস্থান আগের মতোই আছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পক্ষে রোহিঙ্গাদের গ্রহণের কোনো সামর্থ্য নেই। তবে খুবই মানবিক ও স্পর্শকাতর ইস্যু হওয়ায় এ নিয়ে আমাদের সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি নেই।’
রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপারে বাংলাদেশের নির্বিকার থাকার কোনো সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, এ সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে মিয়ানমারের নতুন এনএলডি সরকারকে সহযোগিতা দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে বাংলাদেশের কাজ করা উচিত। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ড. আবদুল মোমেন মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্সের মতো বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সুচির সরকারের সখ্যতা রয়েছে। এসব দেশ সুচির সরকারকে রোহিঙ্গাদের প্রতি সংবেদনশীল হতে বলা উচিত। সুচি যেন রোহিঙ্গাদের দুরবস্থা দূর করার ব্যাপারে পদক্ষেপ নেন। কারণ মিয়ানমারের সরকারের ওপর তাদের প্রভাব রয়েছে। মিয়ানমারে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত এনএলডি সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার পর বাংলাদেশ সম্পর্ক জোরদারে উদ্যোগী হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারের কোনো বিদ্রোহীকে আশ্রয় দিচ্ছে না।
সীমান্ত চৌকিতে হামলা চালিয়ে মিয়ানমারের বিজিপি ও সেনাদের হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানের ব্যাপারে বাংলাদেশকে অবহিত করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত মিয়ো মিন্ট থান। তিনি সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক ডেস্কের মহাপরিচালক মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে মিয়ানমারের নিয়মমাফিক অভিযান চলছে বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, যারা হতাহত হয়েছেন, তারা মূলত হামলায় জড়িত।
উল্লেখ্য, মিয়ানমারে বর্তমানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় আট লাখ। মিয়ানমার সরকার তাদেরকে নাগরিকত্ব দেয়নি। তাদের কোনো ভোটাধিকারও নেই। মিয়ানমারে তাদেরকে রোহিঙ্গা নামে ডাকাও নিষিদ্ধ করেছে দেশটির সরকার। কারণ রোহিঙ্গা শব্দের মানে হল আদিবাসী। তাই রোহিঙ্গা নামে ডাকলে তাদের অধিকারের প্রশ্ন জড়িত থাকে। এ ছাড়া বাংলাদেশে তিন থেকে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বিভিন্ন সময়ে অনুপ্রবেশ করেছে।