রায় দিয়ে আবেগ আপ্লুত বিচারক : নিঃসন্তান মায়ের ভরলো কোল

216

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে জন্মের পর ফেলে যাওয়া সেই শিশু কন্যা অবশেষে নতুন ঠিকানায়

নিজস্ব প্রতিবেদক: চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ফেলে যাওয়া শিশু কন্যাটি অবশেষে আশ্রয়সহ পেল পিতামাতার ঠিকানা। গতকাল দুপুরে আদালত ভবনের নিজ কার্যালয়ে উপস্থিত নিঃসন্তান দম্পত্তি আব্দুল আলীম ও জান্নাতুল ফেরদৌসি ডলির কোলে শিশুটিকে তুলে দেন চুয়াডাঙ্গা জেলা ও দায়রা জজ-২ আদালতের বিজ্ঞ বিচারক শাহানাজ সুলতানা। তিনি বলেন, ‘একটি ঠিকানাহীন শিশুর ভাগ্য নির্ধারণ করে রায় দিতে আমার অনেক কষ্ট হয়েছে। যদি সুযোগ থাকত তবে আমি আবেদনকারী তিনজনকেই ওই শিশুর দায়িত্ব দিতাম। কিন্তু ভাগ্যক্রমে নিঃসন্তান দম্পত্তি আলিম-ডলির জন্যই মনে হয় সৃষ্টিকর্তা তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এবং তাদের হাতে বাচ্চাটিকে তুলে দেওয়ার গুরুদায়িত্ব আমার উপরেই অর্পিত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত যোগ্য মা-বাবার কোলে তুলে দিতে পারলাম ফুটফুটে কন্যা শিশুটিকে। তিন দম্পত্তির মধ্যে একজনের পক্ষে রায় দেওয়াটা আমার পক্ষে খুবই কষ্টের একটি বিষয় ছিল। তবে রায় যাদের পক্ষে আসেনি তাদের জন্য দোয়া করি আল্লাহ যেন তাদের সন্তানের অভাব দুর করে দেন।’
সন্তান কোলে নিয়ে আবেগ আপ্লুত মা জান্নাতুল ফেরদৌসি ডলি বলেন, ‘আমার সন্তান ছিল না; আজ আমার সন্তান হয়েছে। আমি তাকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবো। একই সাথে মানুষের মত মানুষ করে তুলবো।’ এ সময় তিনি অশ্রুসজল নয়নে অপলক দৃষ্টিতে শিশুটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন এবং বার বার আদর সোহাগ করতে থাকেন। তবে শিশু কন্যার নাম এখনও ঠিক করা হয়নি। ইসলামি শরীয়াহ মোতাবেক আকিকা দেওয়ার পর নাম রাখা হবে তার।
উল্লেখ্য, গত ২ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার) সকালে এক কিশোরী নিজেকে সাধারণ রোগী পরিচয় দিয়ে হাসপাতালের মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়। পরের রাতেই ওই শিক্ষার্থী হাসপাতালের গাইনী ওয়ার্ডে এক ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দেয়। অজ্ঞাত কারণ বশত পরদিন ভোরে ওই প্রসূতি তার সন্তানকে হাসপাতালে ফেলে রেখে সটকে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পত্রপত্রিকায় গুরুত্বসহকারে সংবাদ প্রকাশিত হলে ডজন খানেক দম্পত্তি এগিয়ে আসে সন্তানের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। তবে শেষ পর্যন্ত হাসপাতাল তত্ত্বাবধায়কের কাছে আবেদন করে সন্তান দত্তক নিতে ইচ্ছুক তিন দম্পত্তি। পরে সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসকের নির্দেশে ওই শিশুটিকে সমাজ সেবার তত্ত্বাবধানে হস্তান্তর করেন। ওইদিন চুয়াডাঙ্গা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন অফিসার বশির আহম্মেদ তিন জনের আবেদন নিয়ে উদ্ধারকৃত শিশুটির একটি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেন। গত রবিবার চুয়াডাঙ্গা শিশু ও নারী নির্যাতন দমন আদালতে ওই শিশুকে দত্তক নেওয়ার জন্য তিন দম্পতির আবেদন আমলে নিয়ে শুনানির জন্য দিন ধার্য করেন। তবে সেদিন দাখিলকৃত কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকায় বুধবার শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়। গত বুধবার বিকাল ৩টায় শুনানির নির্ধারিত দিনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের বিজ্ঞ বিচারক অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-২ শাহানাজ সুলতানা প্রায় দুই ঘন্টা ধরে উভয়পক্ষের আইনজীবীর মাধ্যমে আবেদনকারীদের কাগজপত্র পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। পরে আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, আবেদন করা তিনটি দম্পতির মধ্যে দুই দম্পতি নিঃসন্তান। এমন একটি দূর্লভ মানবিক বাস্তবতার মুখে রায় দিতে বিচারক অনেকটা ভেঙে পড়েন। আদালতের এমন পর্যবেক্ষণের পর আব্দুল জব্বার-সুলতানা ও নাঈম-সীমা দম্পতি তাদের আবেদন প্রত্যাহার করেন। ফলে যোগ্য পিতা-মাতা হিসেবে বিচারিক আদালত আব্দুল আলিম-জান্নাতুল ফেরদৌসী দম্পতিকে ওই শিশুকে লালন পালনের দায়িত্ব দেন।