রাজনৈতিক বিভেদের সুযোগ নিতে পারে উগ্রপন্থি জঙ্গিরা

270

জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে বিপর্যয়ের সৃষ্টি
সমীকরণ ডেস্ক: বাংলাদেশের প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আবারো উগ্রপন্থি জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি)। অর্থ কেলেঙ্কারিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠানোর বিষয়ে সংস্থাটি বলেছে, এটি ইঙ্গিত দেয় যে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত চলা রাজনৈতিক সংঘাত আবারো শুরু হতে পারে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দুর্নীতি ও অন্যান্য মামলায় বিএনপির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিএনপিকে কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে। এ বছর ৮ই ফেব্রুয়ারি এ দলের প্রধান খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করে ৫ বছরের জেল দেয়া হয়েছে। ফলে গণতান্ত্রিক সর্বোচ্চ প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নির্মূল করা হয়েছে। উৎসাহিত করা হচ্ছে জিহাদিদের বেড়ে উঠাকে। বিএনপি মাঝে মাঝেই ভয়াবহ সহিংসতার আশ্রয় নিয়েছে। অথবা সহিংসতা করে এমন গ্রুপগুলোকে সমর্থন দিয়েছে। এতে রাজনৈতিক বিদ্বেষকে উস্কে দেয়া হচ্ছে ও গভীর হচ্ছে বিভেদ।
অভিযোগ রয়েছে, জঙ্গি কার্যক্রম বন্ধের জন্য সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল নেয়ার পরিবর্তে সরকার দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড, জোরপূর্বক গুম ও ঢালাওভাবে বিরোধী দলের ওপর অভিযান চালানোতে মনোনিবেশ করছে। ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়, কিছুটা পরোক্ষভাবে হলেও রাজনৈতিক মেরুকরণও জঙ্গিবাদের উত্থানে ভূমিকা রেখেছে। সংস্থাটি বলেছে, জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে যে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে, ইসলামপন্থি জঙ্গিরা এর সুযোগ নিতে পারে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতে বিরোধীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহারও অব্যাহত রেখেছে সরকার। গতকাল বুধবার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার বিষয়টি জানিয়েছে তারা। এতে বলা হয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সহিংসতা বন্ধের বিষয়টি সাময়িক হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। বাংলাদেশে এখন জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণ করে নিষিদ্ধ সংগঠন জামা’আতুল মুজাহেদীন ও আনসার আল ইসলাম। এর আগে ২০০৪ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জঙ্গিদেরকে সফলতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে বাংলাদেশ। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত নির্বাচনের পরে সৃষ্ট তীব্র রাজনৈতিক বিভেদ জঙ্গিবাদের জন্য পুনরায় দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আইসিজি’র প্রতিবেদনে বলা হয়, জেএমবির একটি অংশ আইএস-এর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। এছাড়া আনসার আল ইসলামকে আল কায়েদার দক্ষিণ এশিয়া শাখা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
আইসিজি’র প্রতিবেদনে ২০১৬ সালের ১লা ও ২রা জুলাই ঢাকার কূটনৈতিক এলাকায় হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে হামলার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। ওই হামলায় ২০ জন নিহত হয়েছিলেন। এর মধ্যে বেশির ভাগই ছিলেন বিদেশি। বাংলাদেশে জিহাদীদের পুনরুত্থানের পেছনে এদেশের কলহপূর্ণ জাতীয় রাজনীতির ভূমিকা রয়েছে। আইসিজি’র রিপোর্টে বলা হয়, ত্রুটিপূর্ণ বিচারের সঙ্গে বাংলাদেশে গভীরভাবে মেরুকরণ হয়ে আছে রাজনীতি। তার ওপর আওয়ামী ঘরানার সরকার ব্যবস্থায় জঙ্গিবাদের উত্থানে অবদান রাখছে। ওই রিপোর্টে বলা হয়, ২০১৩ সালের মধ্যভাগে বাংলাদেশের হাই কোর্ট জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষিদ্ধ করে জামায়াতে ইসলামীকে। এটা কোনো রাজনৈতিক রায় না হলেও এই রায়ের ফলে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ একটি মিত্রকে বাদ দেয়া হয়েছে। এর ফলে ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সহিংসতায় যুক্ত হওয়ার জামায়াতে ইসলামীকে ঠেলে দেয়া হয়। এরপর নির্বাচন যত এগিয়ে আসতে থাকে বিএনপি ততই আপত্তি তুলতে থাকে। অন্যদিকে নির্বাচনকে ক্রমশ সামনে ঠেলে দিতে থাকে সরকার। অবশেষে নির্বাচনের আগের দিন বিএনপি ঘোষণা দেয়, তারা নির্বাচন বর্জন করবে। ফলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মনোযোগ চলে যায় বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের দিকে।
রিপোর্টে আরো বলা হয়, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে বাংলাদেশের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো স্থানীয় জিহাদী ও সিরিয়ায় বাংলাদেশি যোদ্ধাদের মধ্যে যোগাযোগের তথ্য উদঘাটন করে, যদিও তারা এ ক্ষেত্রে বেশি তথ্য উদ্ধার করতে পারেনি। ওই রিপোর্টে আরো বলা হয়, ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর পরই (সাবেক) বাংলাদেশ রাইফেলসে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এতে ৭৪ জন নিহত হন। এর মধ্যে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা। ২০০৯ সালের নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাতিজা আওয়ামী লীগের এমপি শেখ ফজলে নূর তাপসকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত ৫ জন ও সাবেক ৬ জন সেনা কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। ২০১২ সালে অভ্যুত্থান চেষ্টার অভিযোগে ১২ জন সেনা কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। তবে কারো বিচার করা হয়নি। বেশির ভাগকেই নানা কারণে বরখাস্ত করা হয়েছে।