রঙিন মাছে রঙিন স্বপ্ন

21

আশিকুর রহমান সোহাগ:
ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের এক কলেজছাত্র লেখাপড়ার পাশাপাশি রঙিন মাছ চাষ করে সফলতার স্বপ্ন দেখছেন। বাড়িতেই আটটি হাউসে রঙিন মাছ চাষ করছেন শিহাব উদ্দীন। শিহাব যশোর সিটি কলেজের বাণিজ্য বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ও উপজেলার হাসানহাটি গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে। শিহাব উদ্দীনের বাড়িতে গেলে দেখা যায়, ১০ ফুট লম্বা ও ৫ ফুট চওড়ার ৬টি এবং ৫ ফুট লম্বা ও ২ ফুট চওড়ার ২টিসহ মোট ৮টি হাউসে চাষ করা হচ্ছে বিদেশি জাতের রঙিন মাছ।
শিহাব উদ্দীন জানান, তাঁর বাবা একজন কৃষক। তাঁদের চার বিঘা চাষযোগ্য জমি আছে। তাঁদের তিন ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচ জোগানো তাঁর বাবার জন্য কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাই তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি অল্প পুঁজিতে স্বল্প সময়ে কিছু একটা করার কথা চিন্তা করেন। সেই চিন্তা থেকেই এ উদ্যোগ নেন তিনি। তিনি জানান, তাঁদের এলাকার হাট বারোবাজার দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে অন্যতম বড় মাছ চাষের অঞ্চল। কেননা এ অঞ্চলে রয়েছে হাজার হাজার পুকুর বা দিঘি। রয়েছে বেশ কয়েকটি বাঁওড়। যেখানে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করে কয়েক হাজার মৎস্যজীবী জীবিকা নির্বাহ করে থাকেন। একটি মাধ্যমে জেনে নিজে উৎসাহিত হয়ে এ জেলায় প্রথম রঙিন মাছ চাষের স্বপ্ন দেখা শুরু করেন শিহাব। এরপর এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সাতক্ষীরার কলারোয়ার মাছ ব্যবসায়ী সাইফুল গাজীর কাছ থেকে মা মাছ ও কিছু পুরুষ মাছ মিলে ৩০টি গাপ্পি মলি, গোল্ডফিস ১৮টি, কমেন্ট ১২টি, রেডটিকা ১২টি, কইকাপ ১৬টি, প¬াটি জাতের ৩০টি মোট ১৮ হাজার ৫ শ টাকার মাছ কিনে আনেন। পরে এগুলো বাড়ির পাশের হাউসে ছেড়ে দিয়ে পরিচর্যা শুরু করেন। এর মাত্র দুই মাস পরেই মা মাছগুলো ডিম ছেড়ে রেণু-পোনার জন্ম দিতে থাকে। প্রায় মাস খানেক এখানে রেখে এরপর রেণু-পোনাগুলো একটু বড় করতে অপেক্ষাকৃত বেশি পানির পুকুরে ঘন নেটের মধ্যে ছেড়ে দেন তিনি। এরপর সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই নেটের মধ্যে বেশ বড় হয় বাহারি রঙের এ মাছের রেণুগুলো। এরপর এখান থেকে ওই মাছগুলো উঠিয়ে বিক্রি করা হয়। বাসা-বাড়ি, বিভিন্ন অফিস-আদালত ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শোভাবর্ধনে শৌখিন মাছ চাষিরা কাচের তৈরি অ্যাকুরিয়ামে ছেড়ে পালন করছেন এসব মাছ।
শিহাব জানান, এ মাছ চাষে খুব বেশি খরচ হয় না। তারপরও স্থানীয় নিলয় ফাউন্ডেশন নামের একটি সেবামূলক সংস্থা তাঁকে আর্থিকভাবে বেশ সাহায্য করেছে। এ পর্যন্ত তাঁর ২৫ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে। কিন্তু ১৮ হাজার টাকার মাছ বিক্রি করেছে তিনি। এখনো যে পরিমাণের রেণু রয়েছে, তা কমপক্ষে ৬০ হাজার টাকার হবে। আবার রেণু জন্ম দেওয়া মাছগুলোও থেকে যাচ্ছে।
শিহাব আরও বলেন, ‘পড়াশোনার পাশাপাশি এটা করতে আমার খুব বেশি কষ্ট হয় না। শুধু শিং জাতীয় মাছের জন্য বাজারে যে খাবার পাওয়া যায়, তা অল্প পরিমাণে দিলেই হয়। এ মাছগুলোর জন্য প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ টাকার খাবার কিনতে হয়েছে। আর প্রতিদিন নজর রাখতে হয়, হাউসের পানি বিশুদ্ধ আছে কি না। পানির রং পরিবর্তন হয়ে একটু ঘোলা হলেই পানি পরিবর্তন করে বিশুদ্ধ পানি দিতে হয়। পানির পরিমাণ বেশি নয়, তাই বেশি সময় লাগে না। এ কাজগুলো সাধারণত কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে বিকেলে অথবা কলেজে যাওয়ার আগে সকালে করে থাকি।’ তিনি বলেন, ‘এখন প্রতিটি গাপ্পি, মলি, প¬াটি মাছের রেণু-পোনা ৬০ টাকা, গোল্ড ফিস ও অরেন্ডা গোল্ড ৮০ টাকা, কমেন্ট ৫০ টাকা, কই কাপ ৫০ টাকা, রেড টিকা ও মিল্কী কই ৬০ টাকা দরে বিক্রি করছি। এ থেকে যে টাকা আসছে, তা দিয়ে তিন ভাই-বোনের লেখাপড়ার খরচ চলে যাচ্ছে।’ তিনি আরও জানান, আগে এ অঞ্চলের মানুষ বাইরে থেকে রঙিন মাছ কিনে অ্যাকুরিয়ামে পালন করত। এখন সে মাছগুলো এলাকা থেকেই পাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বড় আকারের খামার করে এ মাছ উৎপাদন করার ইচ্ছা আছে তাঁর।
কালীগঞ্জ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাইদুর রেজা মুহম্মদ সেলিম জানান, ‘শিহাব উদ্দীন লেখাপড়ার পাশাপাশি বাড়িতে হাউসে রঙিন মাছের চাষ করছেন। কয়েকবার শিহাবের রঙিন মাছের হাউস দেখতে গিয়েছি। এলাকায় এ মাছ চাষ নতুন, তাই মৎস্য অফিসের পক্ষ থেকে তাঁকে সব সময় পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে।’