যাচ্ছে ইলিশ আসবে না পেঁয়াজ

24

সমীকরণ প্রতিবেদন:
বন্ধুদেশে ইলিশ পাঠানোর সিদ্ধান্তের পর পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে ভারত। এমন খবরে দেশে প্রতি কেজি পেঁয়াজে বেড়ে গেছে ১০ টাকা। এদিকে, আমদানি বন্ধের খবরে আড়তগুলোতে পেঁয়াজের বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। গত বছরের চেয়ে তিনগুণ বেশি ইলিশ পাঠানোর ঘোষণার পর হঠাৎ ভারত থেকে পেঁয়াজ বন্ধের সিদ্ধান্তকে নেতিবাচক মনে করছে দেশের সংশ্লিষ্ট মহল। এর আগেও ভারত বাংলাদেশকে পেঁয়াজ না দেয়ায় দেশকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এবারো সেই ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা দাবি করেন, আমরা ভারতকে সবকিছু দিই, কিন্তু পাই না। আমরা যখন বন্ধুত্ব বাড়াতে দিতে থাকি, তখন ভারত একতরফা বন্ধ করে দেয়। এটাই ভারত-বাংলাদেশের বন্ধুত্বে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। এর আগেও দেখা গেছে, আমাদের যখন পেঁয়াজ খুব বেশি প্রয়োজন ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে ভারত আমাদের পেঁয়াজ দেয়নি। ফলে দেশে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত পেঁয়াজের দাম উঠেছিল। আমাদের প্রধানমন্ত্রী পেঁয়াজের জন্য ভারতকে বিশেষ অনুরোধ করার পরও ভারত পেঁয়াজ দেয়নি। বিভিন্ন দেশ থেকে বিমানে করে বিশেষ ব্যবস্থায় পেঁয়াজ এনে দেশের চাহিদা মেটাতে হয়েছে। আসলে আমরা শুধু দিতে থাকি, বিনিময় কী পাচ্ছি তার হিসাবে একেবারেই অসন্তোষ। আমাদের দরকারের সময় ভারত পাশে থাকছে না, দিন দিন এমন ঘটনা বেশি বাড়ছে। যা কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। মূল কথা হচ্ছে, ভারত যদি আমাদের কিছু না দেয় আমরা কিচ্ছু করতে পারি না। এবারো যখন তারা পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে, আমাদের কিছুই করার হয়তো নেই; তবে যারা ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খুলেছেন তাদের কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, প্রতি বছরের মতো ভারতে বিশেষ সময়ে এবারো এক হাজার ৪৫০ টন ইলিশ যাচ্ছে। ইতোমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সমপরিমাণ ইলিশ রপ্তানির জন্য ৯টি দেশি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। গত বছরও সরকার শারদীয় শুভেচ্ছা হিসেবে ভারতে ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল। এবার প্রতি কেজি ইলিশ ৮০০ টাকা দরে ভারতে রপ্তানি হবে বলে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে সরকার। এই দরে রপ্তানি করা প্রতিটি ইলিশের ওজন হবে এক হাজার (এক কেজি) থেকে এক হাজার ২০০ গ্রাম (এক কেজি ২০০ গ্রাম)। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর ভারতে ইলিশ রপ্তানির জন্য ২০০টি প্রতিষ্ঠান থেকে আবেদন জমা পড়েছিল। যাচাই-বাছাই করে ৯টি প্রতিষ্ঠানকে ইলিশ রপ্তানির জন্য চূড়ান্ত করেছে। এসব প্রতিষ্ঠান অধিক পরিমাণে ইলিশ স্থলপথে, বিশেষ করে বেনাপোল স্থলবন্দর ব্যবহার করে রপ্তানি করবে। তবে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান অন্য যেকোনো স্থলবন্দরও ব্যবহার করতে পারবে।
এ বিষয়ে মাছ আমদানিকারক সমিতির সেক্রেটারি সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০০ রপ্তানিকারক ভারতে মাছ রপ্তানির জন্য সরকারের কাছে অনুমতি চেয়েছিল। এর মধ্যে কেবল ৯টি প্রতিষ্ঠানকে অনুমতি দেয়া হয়েছে। এক হাজার ৪৫০ টন ইলিশ আগামী সপ্তাহের মধ্যেই কলকাতায় যাবে। এর চালান বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করবে। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, এবার বাংলাদেশ পূজা উপলক্ষে ভারতকে গত বছরের চেয়ে তিনগুন বেশি ইলিশ দেবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ইলিশ রপ্তানি-সংক্রান্ত অনুমতিপত্র সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর হাতে পৌঁছেছে। দিল্লি থেকে ‘স্যানিটারি ইমপোর্ট পারমিট’ আদায় করে মাছ দ্রুত আমদানির তোড়জোড় চলছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, পূজার উপহার হিসেবে ১০ অক্টোবরের মধ্যে এক হাজার ৪৫০ মেট্রিক টন ইলিশ পাঠানো যাবে। গতবার ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ পাঠানোর ছাড়পত্র মিলেছিল। এবার ৯টি সংস্থাকে কম করে ১৫০ মেট্রিক টন করে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে ঢাকা। এদিকে অতিবৃষ্টি ও বন্যায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়ায় নিজ দেশের বাজারে দাম বৃদ্ধি ঠেকাতে বাংলাদেশে বন্ধু দেশ ভারত পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে। হিলির কাস্টমস কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সিএন্ডএফ অ্যাজেন্ট শংকর দাস গণমাধ্যমেকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
শংকর দাস বলেন, ‘সম্প্রতি ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে অতিবৃষ্টি ও বন্যা হওয়ায় যেসব অঞ্চলে পেঁয়াজ উৎপাদন হতো সেখানে পেঁয়াজের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। যে কারণে পেঁয়াজের সরবরাহ কমায় ভারতের বাজারেই পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। এ অবস্থায় পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি রুখতে গতকাল সোমবার দুপুর ১২টার দিকে ভারত সরকার হিলি কাস্টমসকে এ তথ্য জানিয়েছে। সে মোতাবেক কাস্টমস কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছে, সোমবার থেকে সব ধরনের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ থাকবে পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত। এ সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন এখনো জারি হয়নি, তবে অচিরেই জারি হবে বলে জানিয়েছে। একই সঙ্গে পেঁয়াজ আমদানির জন্য যেসব এলসি খোলা রয়েছে এবং টেন্ডার-প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে সেগুলোর বিপরীতেও কোনো পেঁয়াজ রপ্তানি হবে না।
হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ভারতীয় রপ্তানিকারক ও সিএন্ডএফ অ্যাজেন্ট আমাদের জানিয়েছে, ভারত কোনো পেঁয়াজ রপ্তানি করবে না। ভারত সরকার নাকি কাস্টমসকে নিষেধ করেছে পেঁয়াজ রপ্তানি না করতে। তাদের এই সিদ্ধান্তের কারণে আমাদের অনেক আমদানিকারকের বিপুল পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খোলা রয়েছে। আমরা তো এখন বিপাকে পড়ে গেছি। আমরা তাদের বলেছি, আমাদের যেসব এলসি খোলা রয়েছে সেগুলোর পেঁয়াজ রপ্তানির জন্য। আমাদের অনেক এলসির বিপরীতে অনেক ট্রাক মাল নিয়ে সড়কে দাঁড়িয়ে আছে। এখন যদি তারা পেঁয়াজ না দেয় তাহলে আমাদের এই পেঁয়াজের কী অবস্থা হবে সেই চিন্তায় পড়েছি। এই যে আমাদের ক্ষতি, কার কাছে ক্ষতিপূরণ চাইবো? তাই বিষয়টি অতিসত্ত্ব্বর সরকারি পর্যায়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবু আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা ভারতকে সব কিছু দিই, কিন্তু পাই না। আমরা যখন বন্ধুত্ব বাড়াতে দিতে থাকি, তখন ভারত একতরফা বন্ধ করে দেয়। এটাই ভারত-বাংলাদেশের বড় সমস্যা। আমরা সবসময় নরম থাকি, এটাই আমাদের জন্য বড় সমস্যা। কূটনৈতিক সম্পর্ক ও দেশের স্বার্থ আদায়ে এত নরম হলে কোনো কিছু আদায় করা যায় না। এর আগেও আমরা দেখেছি, আমাদের যখন পেঁয়াজ খুব বেশি প্রয়োজন ছিলো ঠিক সেই মুহূর্তে ভারত আমাদের পেঁয়াজ দেয়নি। ফলে আমাদের এখানে ৩শ থেকে ৪শ টাকা পর্যন্ত পেঁয়াজের দাম বেড়েছিল। আমাদের প্রধানমন্ত্রী পেঁয়াজের জন্য ভারতকে বিশেষ অনুরোধ করার পরও ভারত পেঁয়াজ দেয়নি। আমাদের বিভিন্ন দেশ থেকে বিমানে করে বিশেষ ব্যবস্থায় পেঁয়াজ এনে দেশের চাহিদা মেটাতে হয়েছে। আসলে আমরা শুধু দিতে থাকি, বিনিময় কী পাচ্ছি তার হিসাবে একেবারেই অসন্তোষ। আমাদের দরকারের সময় ভারত পাশে থাকছে না, দিন দিন এমন ঘটনা বেশি বাড়ছে। যা কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা প্রতি বছরই বিশেষ সময়ে ভারতকে ইলিশ দিয়ে থাকি। তবে আমরা কোনো মাগনা দিই না। একটা নির্দিষ্ট অংকের অর্থের বিনিময়ে ভারতকে ইলিশ দিয়ে থাকি। এ বছরও সেই নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। তবে যেটি হচ্ছে, তাদের দেশে চাহিদা সঙ্কট থাকায় ফের পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করেছে। এর একটা প্রভাব আমাদের এখানে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আসলে মূল কথা হচ্ছে ভারত যদি আমাদের কিছু না দেয় আমরা কিচ্ছু করতে পারি না। এবারো যখন তারা আবারো পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছে; আমাদের কিছুই করার হয়তো নেই; তবে যারা ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির জন্য এলসি খুলেছেন তাদের কিছুটা ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।’
এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, ‘আজ মনে হয় ভারত এ বিষয়ে নিজেদের করণীয় ঠিক করতে বৈঠকে বসেছে। হয়তো রপ্তানির মূল্য পরিবর্তন নাকি করবে, দেখা যাক। ভারতের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ অব্যাহত রাখছি। তবে আমরা এখনো জানি না পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ হয়েছে কি-না। একজনের কাছে শুনলাম। আমরা এখন বিষয়টা চেক করছি। তবে বন্ধ করে দিয়েছে এমন খবর আমাদের কাছে নেই। আমরা আজকেই চেক করে জানবো আসলে কী হয়েছে।’