মুক্তি পেলেন খালেদা জিয়া

14

সমীকরণ প্রতিবেদন:
দুই বছর এক মাস ১৬ দিন অর্থাৎ ৭৪৬ দিন পর মুক্তি পেলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল দুটি শর্তে দ- ছয় মাস স্থগিত করে সরকার তাঁকে মুক্তি দিয়েছে। শর্ত দুটি হচ্ছে- এই সময়ে খালেদা জিয়াকে ঢাকায় নিজের বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে হবে এবং তিনি বিদেশে যেতে পারবেন না। দুর্নীতির মামলায় ২৫ মাস সাজা ভোগের পর ‘মানবিক বিবেচনায়’ সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পান তিনি। একই সঙ্গে মুক্ত হলেন তাঁর গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমও। গতকাল বিকাল ৪টা ১২ মিনিটের দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রিজন সেল থেকে কারা কর্তৃপক্ষ ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের জিম্মায় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে মুক্তি দেয়। মুক্তির পর খালেদা জিয়াকে নিয়ে যাওয়া হয় গুলশানের বাসভবন ‘ফিরোজা’য়। সেখানে তিনি শামীম এস্কান্দারের জিম্মায় থাকবেন। তাঁর মুক্তির সময় বিএনপি ও খালেদা জিয়ার পরিবারের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খালেদা জিয়ার ভাই শামীম এস্কান্দার, বোন সেলিনা ইসলাম এবং খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান জামান বিন্দু। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, মির্জা আব্বাস, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ভাইস চেয়ারম্যান এ জেড এম জাহিদ হোসেন, যুগ্মমহাসচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, শামা ওবায়েদ, সুলতানা আহমেদ, মাসুদ আহমেদ তালুকদার, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়া মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও ইশরাক হোসেন এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
কিছুদিন আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। এ নিয়ে কিছুদিন সরকারের তরফ থেকে কোনোরকম সাড়াশব্দ না পেলেও গত মঙ্গলবার বিকালে আকস্মিক এক সংবাদ সম্মেলনে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান, সরকার শর্তসাপেক্ষে ছয় মাসের জন্য দন্ড স্থগিত করে বেগম জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর পর থেকেই তৎপর হয়ে ওঠে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো। গতকাল বেলা দেড়টার দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির কাগজপত্র আসার পর কারা কর্তৃপক্ষ খালেদা জিয়াকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেয়। বেলা পৌনে ৩টার দিকে কয়েকজন কারারক্ষীকে সঙ্গে নিয়ে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবীর চৌধুরী মুক্তির ছাড়পত্রসহ বিএসএমএমইউ হাসপাতালের কেবিন ব্লকে প্রবেশ করেন। এর আগে বেলা আড়াইটার দিকে খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম এস্কান্দারের গাড়ি হাসপাতাল চত্বরে ঢোকার পরই কয়েক শ নেতা-কর্মী সেখানে জড়ো হন। স্বজনরা সেখানে পৌঁছানোর মিনিট দশেক আগে আসেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিকাল ৪টা ১২ মিনিটের দিকে বিএসএমএমইউর কেবিন ব্লকের ষষ্ঠ তলার ৬২১ ও ৬২২ নম্বর কক্ষ থেকে খালেদা জিয়া লিফটে করে হুইল চেয়ারে নিচে নেমে আসেন। এ সময় তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্য, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, হাসপাতালের নার্স ও আনসার সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। ৪টা ২০ মিনিটে তাঁকে নিয়ে স্বজনরা হাসপাতাল থেকে গুলশানের উদ্দেশে রওনা হন। মুক্তির সময় তাঁর পরনে ছিল গোলাপি রঙের শাড়ি, চোখে সানগ্লাস আর মুখে মাস্ক। ছোট ভাইয়ের স্ত্রী কানিজ ফাতেমাও এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন।
কারা অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক কর্নেল আবরার হোসেন বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে এমন খবর জানার পর থেকেই আমরা সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। গতকাল বেলা ১টার পর এ-সম্পর্কিত কাগজপত্র মন্ত্রণালয় থেকে এলে আমরা তা মেইলে এবং বাহকের মাধ্যমে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দিই। পরে সেখান থেকে জেল সুপার বিএসএমএমইউ হাসপাতালে গিয়ে বেগম জিয়াকে কারাবিধি অনুযায়ী মুক্ত করে তাঁর স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেন।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুল হক বলেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসনকে আমরা বেলা ৩টার দিকে ডিসচার্জ সার্টিফিকেট দিয়েছি। প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি বিকাল সোয়া ৪টার দিকে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান।’ মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সংবাদ সম্মেলন থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির ঘোষণা এলে দলের নেতা-কর্মীরা বিএসএমএমইউর সামনে জড়ো হন। গতকাল বেলা ১২টায় প্রথমে বিএনপিপন্থি চিকিৎসক সংগঠনের সদস্য ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা আসতে শুরু করেন। খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের দুর্নীতির মামলায় সাজা ভোগ করে আসছিলেন। শারীরিক নানা সমস্যা নিয়ে প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। শারীরিক অসুস্থতার কথা তুলে ধরে আইনজীবীরা একাধিকবার খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন করেন। প্রতিবারই তা নাকচ হয়ে যায়। ওই দুই মামলায় ১৭ বছরের কারাদন্ড নিয়ে বন্দী ছিলেন খালেদা জিয়া। প্রথমে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হলেও গত বছর ১ এপ্রিল থেকে তাঁকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। এমন এক সময়ে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হলো, যখন নভেল করোনাভাইরাসের মহামারীতে বিশ্বজুড়ে চলছে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা; নানা বিধিনিষেধে বাংলাদেশও রয়েছে প্রায় অবরুদ্ধ অবস্থায়। এ প্রসঙ্গ টেনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মঙ্গলবার বলেছিলেন, ‘আমরা কিছুটা আবেগাপ্লুত তো বটেই, কিছুটা স্বস্তিও বোধ করছি। আবার কিছুটা আতঙ্কিত বোধ করছি এজন্য যে, এই ভয়ঙ্কর সময়ে ম্যাডামের মুক্তিতে তাঁর কোনো ক্ষতি না ঘটে।’
কারাগার থেকে হাসপাতাল :
খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পরই অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর ২০১৮ সালের ১ এপ্রিল স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য বিশেষ মেডিকেল বোর্ড কারাগারে গিয়ে তাঁর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। এরপর ৭ এপ্রিল বেলা ১১টা ২০ মিনিটে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে বের করে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওই দিন কেবিন ব্লকের ৫১২ নম্বর কক্ষে অবস্থান করেন খালেদা জিয়া। ফের ফিরিয়ে নেওয়া হয় কারাগারে। এরপর ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর তাঁকে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ভর্তি ও চিকিৎসাসেবা শুরু করতে পাঁচ সদস্যের একটি বোর্ড গঠনের নির্দেশ দেয় হাই কোর্ট। দুই দিন পর ৬ অক্টোবর ফের একই হাসপাতালে আনা হয় বেগম জিয়াকে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার বয়স ও অসুস্থতার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সিআরপিসির ৪০১(১) ধারাবলে তাঁর সাজা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেছেন। আর গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘দন্ড স্থগিত করে খালেদা জিয়াকে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।’ শর্ত ভঙ্গ করলে দন্ড স্থগিতের আদেশ বাতিল হবে কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।’ তিনি জানান, মুক্তির এই সময়ে (ছয় মাস) খালেদা জিয়া কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অংশ নিতে পারবেন না। এদিকে দীর্ঘ ২৫ মাস ১৬ দিন পর শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেয়ে গুলশানের ভাড়া বাসা ‘ফিরোজা’য় ওঠেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী পরিবেষ্টিত স্লোগানের মধ্যে বিকাল ৫টায় তিনি গুলশানের বাসায় পৌঁছান। অন্য একটি গাড়িতে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের সঙ্গেই গুলশানে যান গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমও। রাতেই কয়েকজন চিকিৎসক তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। আপাতত ‘ফিরোজা’য় থাকলেও পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি রাজধানীর কোনো বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারেন। ‘ফিরোজা’য় খালেদা জিয়া প্রবেশের পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘ম্যাডাম অসুস্থ। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া তাঁকে বাসায় নিয়ে এলাম। বাসায় নিয়ে তাঁর সুস্থতার বিষয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা কিছুটা আবেগাপ্লুত তো বটেই, কিছুটা স্বস্তিও বোধ করছি। আবার কিছুটা আতঙ্কিত বোধ করছি এজন্য যে, এই ভয়ঙ্কর সময়ে ম্যাডামের মুক্তিতে তাঁর কোনো ক্ষতি না ঘটে।’
ফিরোজায় পৌঁছার পর সেজ বোন সেলিমা ইসলাম, বোনের স্বামী রফিকুল ইসলাম, প্রয়াত সাঈদ এস্কান্দারের স্ত্রী নাসরিন এস্কান্দার, জোবায়দা রহমানের বড় বোন শাহিনা খান জামান বিন্দুসহ পরিবারের সদস্যরা তাঁকে পুষ্পস্তবক দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। সেজ বোন ও ছোট ভাইয়ের স্ত্রীর হাতে ভর করে গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে বসেন খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া বিএসএমএমইউ থেকে বের হওয়ার পর তাঁর গাড়িবহরের সঙ্গে নেতা-কর্মীদের কেউ কেউ মোটরসাইকেলে এবং একটি বড় অংশ হেঁটে এগোতে থাকে। কারও কারও হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড। নেতা-কর্মীর ভিড়ের কারণে খালেদা জিয়াকে বহনকারী গাড়ি ধীরগতিতে এগোচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে একপর্যায়ে পুলিশ বিএনপি নেতা-কর্মীদের লাঠিপেটা শুরু করে।