মানুষের কল্যাণে পেনশনের টাকা দানকারী কালীগঞ্জবাসীর রেজা ভাইয়ের নামে সড়কের নামকরণ

24

রিয়াজ মোল্যা:
বাবার অভাবের সংসারে চিকিৎসক হয়েছিলেন। চাকরির কারণে ডাক্তার রেজাকে সময় দিতে হয়েছে ঢাকাতে। কিন্তু মা মাটি মানুষকে তিনি ভুলে যাননি। কেননা ছাত্রজীবনের কষ্টের কথা সারা জীবনই বুকে ধারণ করে তিনি পথ চলেছেন। এলাকার বেশিরভাগ গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীকে অভিভাবকের মতো লেখাপড়ার খরচ জুগিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকে আজ লেখাপড়া শেষ করে দেশের বিভিন্ন দপ্তরের উচ্চপদের কর্মকর্তা। এলাকায় লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়া বেশ কয়েকটি গ্রামে ‘বাঁচার জন্য সংগ্রাম’ নামের পাঠাগার স্থাপন করে শিশুসহ সব বয়সী মানুষের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছেন। নিজে জটিল রোগে আক্রান্ত থাকলেও কেউ চরম অসুস্থতা নিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছালে পরিবারের মানুষের মতো সব ধরনের সাহায্য করেছেন তিনি। ‘কল্যাণ’ নামের একটি কল্যাণকর সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রতিবছর তিন ইউনিয়নের অত্যন্ত গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাছাই করে শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে আসছেন। নিজের এমন কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি ছিলেন এলাকার সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আত্মার আত্মীয়। চাকরির পেনশনের টাকাও দান করে গেছেন মানব কল্যাণে। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে গরীবের ডাক্তার খ্যাত এ মানুষটি ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর থেকে এলাকার মানুষ তাঁদের একজন অভিভাবককে হারিয়েছেন। কিন্তু এ মানুষটির জন্য আজও তাঁদের ভালোবাসার ঘাটতি নেই। তাঁরা চেয়েছিলেন ভালোবাসার মানুষটির স্মৃতি আগামী প্রজন্মের মধ্যে যুগযুগ ধরে বয়ে যাক। তাঁদের সে চাওয়াটা পাওয়ায় পরিণত হয়েছে। গুণী এ মানুষটির প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে চাপরাইল হতে কালীগঞ্জ পর্যন্ত সড়কটি প্রফেসর ডা. রেজাউল ইসলাম সড়ক নামকরণ করা হয়েছে। স্থানীয় সাংসদ আনোয়ারুল আজিম আনার গত শুক্রবার চাপরাইল বাজারে এ সড়কের ফলক উন্মোচন করেন। প্রফেসর ডা. রেজাউল ইসলাম রেজা ঝিনাইদহ কালীগঞ্জের চাপরাইল গ্রামের মৃত আবুল কাশেম মালিতার পুত্র।
কল্যাণকামী সংগঠন ‘কল্যাণ’-এর সাধারণ সম্পাদক মাস্টার দলিলুর রহমান জানান, এক সময় এলাকার মানুষ তাঁদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার প্রতি খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না। এটি ছিল ডাক্তার রেজার দৃষ্টিতে নিজেদের ধবংসের সামিল। এ অবস্থা থেকে বাঁচাতে তিনি নিজের গাঁটের টাকা দিয়ে এলাকার কয়েকটি গ্রামে পাঠাগার নির্মাণ করে নাম দিয়েছিলেন ‘বাঁচার জন্য সংগ্রাম’। যে পাঠাগারগুলোর কর্মকাণ্ড এখনও চলমান রয়েছে। এখানে সুন্দর পরিবেশে বসে শিক্ষার্থীসহ এলাকার সব বয়সী মানুষ আজ জ্ঞান অর্জন করছেন। শিক্ষার্থীরাও সময় পেলেই এ লাইব্রেরিতে বসে জ্ঞান চর্চা করে থাকে। আর্থিকভাবে ডাক্তার রেজার তেমন একটা স্বচ্ছলতা না থাকলেও সারাটা জীবন রোজগারের বেশির ভাগই ব্যয় করেছেন জনকল্যাণে। তাই ডা. রেজাউল ইসলাম রেজা এলাকার সবার অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। সব শ্রেণির মানুষই ছিলেন তাঁর অন্ধভক্ত। ডা. রেজাউল ইসলাম রেজা সর্বশেষ আজগর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রফেসর ছিলেন। তাঁর সহধর্মিনী জাকিয়া রেজা ঢাকা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সহকারী অধ্যাপক। বড় ছেলে শোভন রেজা একজন মেডিকেল অফিসার ও ছোট ছেলে সুমন রেজা প্রকৌশলী। ডা. রেজা তাঁর চাকরি জীবনের পেনশনের টাকা দিয়ে এলাকায় গড়ে তুলেছেন একাধিক কল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান।
এলাকাবাসীর মধ্যে শিক্ষক স্বপন কুমার ভট্টাচার্য্য বলেন, ‘রেজা ভাই ছিলেন এলাকাবাসীর কাছে পরম শ্রদ্ধার পাত্র। তিনি সবাইকে নিজের পরিবারের মানুষ ভাবতেন।’ এটা বলতে বলতে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। তবে ডাক্তার রেজার স্মৃতিকে ধরে রাখতে তাঁর নামের সঙ্গে সড়কের নামকরণ করায় তাঁরা খুশি।
স্থানীয় সাংসদ আনোয়ারুল আজিম আনার জানান, প্রফেসর ডাক্তার রেজাউল ইসলাম রেজা ছিলেন সত্যিকারের একজন সমাজসেবক। তিনি এলাকার সব শ্রেণির মানুষের অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন। শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তাঁর নামানুসারে সড়কের নামকরণ করা হয়েছে।