মসজিদের জমিতে নির্মাণ হবে রাম মন্দির

11

ভারতের বহুল আলোচিত বাবরি মসজিদ মামলার রায়
সমীকরণ প্রতিবেদন:
ভারতের বহুল আলোচিত অযোধ্যার বাবরি মসজিদ মামলার রায় ঘোষণা করেছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। রায়ে ভেঙে ফেলা মসজিদের জমিতে মন্দির নির্মাণে তিন মাসের মধ্যে ট্রাস্ট গঠন করতে কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে অযোধ্যা শহরের ‘উপযুক্ত স্থানে’ পাঁচ একর জমি দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। গতকাল (শনিবার) দুপুরে প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ এ রায় দেন। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন, বিচারপতি এসএ বোবদে, বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়, বিচারপতি অশোক ভূষণ, বিচারপতি এস আব্দুল নাজির।
রায়ের পর সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের আইনজীবী জাফরাইব জিলানি বলেন, ‘আমরা সুপ্রিম কোর্টের রায়কে সম্মান জানাই। তবে এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা মনে করি এটা অন্যায্য। তবে, আমরা রায়ের সব অংশের সমালোচনা করছি না।’ তিনি জানান, তারা একটি বৈঠক করবেন। সেখানে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হবে কি না তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। অন্যদিকে হিন্দু মহাসভার আইনজীবী বরুণ কুমার সিংহ বলেছেন, ‘এটা ঐতিহাসিক রায়। এই রায়ের মধ্যে দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের বার্তা দিয়েছে।’
বাবরি মসজিদ বনাম রামমন্দির মামলার রায় প্রকাশের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এক টুইটার বার্তায় লিখেছেন, ‘অযোধ্যা মামলায় রায় দিয়েছেন মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট। এই রায় কোনো পক্ষের জয় বা পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। সে রামভক্তি হোক বা রহিমভক্তি, আমাদের একান্ত প্রয়োজন ভারতভক্তির ওপর জোর দেয়া। দেশবাসীর প্রতি আহ্বান, আপনারা শান্তি, সদ্ভাব ও ঐক্য ধরে রাখুন।’
রায়ে শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, বিতর্কিত মূল জমি পাবে ‘রাম জন্মভূমি ন্যাস’। এই জমিতে মন্দির তৈরিতে কোনো বাধা নেই। তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে একটি ট্রাস্ট গঠন করতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারকে। ওই ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানেই থাকবে বিতর্কিত মূল জমি। কিভাবে কোন পদ্ধতিতে মন্দির তৈরি হবে, তারও পরিকল্পনা করবে ট্রাস্ট।
রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, বাবরের সেনাপতি মির বাকিই যে মসজিদ তৈরি করেছিলেন, তার প্রমাণ রয়েছে। তবে সেটা কোন সালে, তা নির্ধারিত নয় এবং তারিখ গুরুত্বপূর্ণও নয়। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সমীক্ষা বিভাগের (এএসআই) খননে অন্য কাঠামোর প্রমাণ মিলেছে। তবে সেই কাঠামো থেকে এমনও দাবি করা যায় না যে, সেগুলি মন্দিরেরই কাঠামো। আবার সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের দাবি খারিজ করে শীর্ষ আদালত বলেছে, শুধুমাত্র বিশ্বাসের ভিত্তিতে কোনো অধিকার দাবি করা যায় না। জমির মালিকানা আইনি ভিত্তিতেই ঠিক করা উচিত।
ভারতের রাজনীতিতে সব থেকে স্পর্শকাতর এ মামলার রায়কে কেন্দ্র করে গোটা উত্তরপ্রদেশকে নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে দেয়া হয়। সেখানে চার হাজার আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। ৭৮টি রেল স্টেশনের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। আগামীকাল সোমবার পর্যন্ত উত্তর প্রদেশের সমস্ত স্কুল, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। লক্ষেèৗ এবং অযোধ্যায় দুটি হেলিকপ্টার মোতায়েন রাখা হয়েছে। শুক্রবার রাত থেকেই গোটা উত্তর প্রদেশে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, অযোধ্যায় ২ দশমিক ৭৭ একর বিতর্কিত জমির মালিকানা দাবি করে আসছিল মুসলিম ও হিন্দু দু’পক্ষই। মুসলিমদের পক্ষে বলা হয়েছে, সেই জায়গায় মন্দির থাকার কোনো প্রমাণ নেই। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙে দেয় উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। তাদের বিশ্বাস, পুরনো মন্দির ভেঙে দিয়ে সেই জায়গায় মসজিদ গড়ে তোলা হয়েছে, যে জায়গাটি ছিল রামচন্দ্রের জন্মভূমি।
২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বিতর্কিত জমিটিকে তিনভাগে ভাগ করে দেয় সুন্নি ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া এবং রাম লালার মধ্যে। তবে এই রায়ে অসন্তুষ্ট হয়ে সুপ্রিম কোর্টে যায় তিনপক্ষই। টানা ৪০ দিন শুনানির পর গত ১৬ অক্টোবর রায় স্থগিত করে দিয়েছিলেন প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ।
সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড-এর পক্ষে কামাল ফারুকি বলেছেন, ‘এর বদলে ১০০ একর জমি দেওয়া হলেও আমাদের কোনও লাভ নেই। ইতোমধ্যেই আমাদের ৬৭ একর জমি দখল করা হয়েছে, তাহলে আমাদের কী দান করা হচ্ছে? আমাদের ৬৭ একর জমি নেয়ার পরে ৫ একর দেয়া হচ্ছে। এটা কেমন সুবিচার?’
উল্লেখ্য, ১৯৯২-এ বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়ার পরে ১৯৯৬-এ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ইশতেহারে প্রথম রামমন্দিরের প্রতিশ্রুতি দেয়। তারপর থেকে সাম্প্রতিক লোকসভা নির্বাচন পর্যন্ত বিজেপির ইশতেহারে রামমন্দিরের কথা একবারও বাদ যায়নি। ২০১৪ সালের পর ২০১৯-এও বিজেপি তার সঙ্কল্প-পত্রে বলেছে, সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে থেকে রামমন্দির তৈরির সব সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হবে।
সুপ্রিম কোর্টে মামলাতেও মোদি সরকার রামমন্দির তৈরির রাস্তা সহজ করার চেষ্টা করেছে। বাবরি মসজিদ ভাঙার পরে ১৯৯৩-এ উত্তরপ্রদেশে প্রেসিডেন্টের শাসনের মধ্যেই কেন্দ্রের নরসিংহ রাও সরকার বিতর্কিত ২.৭৭ একর জমিকে ঘিরে মোট ৬৭.৭০৩ একর জমি অধিগ্রহণ করে। তার মধ্যে রাম জন্মভূমি ন্যাসের ৪২ একর জমি ছিল। মোদি সরকার সুপ্রিম কোর্টে বলে, মুসলিমরা তো বাবরি মসজিদের ০.৩১৩ একর চাইছে। বাকি জমি আসল মালিকদের কাছে ফেরত যাক। বিশেষত রাম জন্মভূমি ন্যাসকে ৪২ একর ফিরিয়ে দেয়া হোক। বিতর্কিত জমিতে যাওয়া-আসার জন্য রাস্তা খোলা থাকুক।
উদ্দেশ্য স্পষ্ট। জমি ফিরে এলে রাম জন্মভূমি ন্যাস পূজাপাঠ, মন্দির তৈরির কাজ শুরু করতে পারবে। এর পরে বাবরি মসজিদের জমির অধিকার মুসলিমরা ফিরে পেলেও চার পাশে হিন্দু মন্দিরের মাঝখানে এক চিলতে জমিতে নতুন করে কি আর মসজিদ তৈরি হতে পারবে?
সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের আইনজীবী জাফরইয়াব জিলানি বলেছেন, ‘আমরা রায়কে সম্মান জানাই। কিন্তু এতে আমরা সন্তুষ্ট নই। আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে চিন্তা ভাবনা করব।’ তবে এ নিয়ে তারা কোনওরকম বিক্ষোভ বা প্রতিবাদ করবেন না বলেও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন। দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা মুফতি আবুল কাসিম নোমানী বাবরি মসজিদ সম্পর্কিত সুপ্রিম কোর্টের রায় ‘অত্যন্ত আশ্চর্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, মামলাটি বিতর্কিত জমির মালিকানা নিয়ে ছিল এবং আদালত জমির মালিক কে তা স্পষ্ট করেনি। মাওলানা নোমানী দেশের মুসলমানদের শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন যে, যেকোনো অবস্থাতেই শান্তি বজায় রাখা সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। যা নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয় এবং কারও উসকানিতে কোনও ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় মুসলিমদের এমন কাজ না করা উচিত।
অল ইন্ডিয়া মজলিসে ইত্তেহাদুল মুসলেমিন প্রধান ব্যারিস্টার আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এমপি বলেন, যারা বাবরি মসজিদ ভেঙেছিল, আদালত তাদেরকেই বলছে ট্রাস্ট করে মন্দির নির্মাণ করতে! মসজিদটি যদি সেখানে থাকত এবং শহীদ না হতো, তাহলে কি এই সিদ্ধান্ত নেয়া হতো? আমি জানি না। কংগ্রেসের সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধী বলেছেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে সম্মান জানিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যে সদ্ভাব বজায় রাখতে হবে। এটা সব ভারতীয়র মধ্যে বন্ধুত্ব, প্রেম আর ভ্রাতৃত্বের সময়।’
এ প্রসঙ্গে গতকাল সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মাদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘বাবরী মসজিদ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দেয়া রায় অপ্রত্যাশিত এবং দুর্ভাগ্যজনক! বাবরী মসজিদের পেছনে পাঁচশ’ বছরের এক ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট সেই বিষয়টি না দেখে ঐতিহাসিকভাবে যার বাস্তবতা নেই, সেই কাল্পনিক বিষয়ের ওপরে ভিত্তি করে যেভাবে অযোধ্যায় বাবরী মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির গড়ার সিদ্ধান্ত দিলেন এতে গোটা বিশ্ব অবাক হয়েছে! আমরাও হতবাক!’
এদিকে অযোধ্যা মামলার রায়ের সময় নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পাকিস্তান। সম্পূর্ণ বিষয়টিকে ‘অসংবেদনশীল’ বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরাইশি। কর্তারপুর করিডোর ঘিরে যখন অনন্দময় পরিবেশ, তখনই বিতর্কিত জমি মামলার রায়দানের বিষয়টিকে ভালোভাবে দেখছে না ইমরান খানের সরকার। সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি, পার্স টুডে।