মরার উপর খাড়ার ঘা ‘লো-ভোল্টেজ’

230

প্রচন্ড দাবদাহের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে অতিষ্ঠ মানুষ : চাহিদা মেটাতে হিমশিম

পয়েন্ট আউট-
তাপমাত্রা ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস
হাপিয়ে উঠছেন রোজাদাররা
হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা
পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ফ্যান ও এসির সংখ্যা
বন্ধ ভেড়ামারা ৪১০ মেগাওয়াট পাওয়ার প্ল্যান্ট

শিগগিরই চুয়াডাঙ্গায় ৩৩ কেভি লাইন নির্মাণ
ক্রেতাশুন্য বিপনি বিতান ও বাজার
বেড়েছে নিরাপদ পানির চাহিদা
পৌরসভাকে আরও পাম্প চালু করতে হবে
স্থায়ী সমাধান চান চুয়াডাঙ্গা জেলাবাসী

এসএম শাফায়েত:
প্রচন্ড দাবদাহে চরম দুর্বিসহ জীবনযাপন করছে চুয়াডাঙ্গার প্রাণীকূল। গরমে বিপাকে পড়েছে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র-ছাত্রী, অফিস-আদালতগামী মানুষ। প্রতিদিন সকালের রোদের আলোয় জানিয়ে দেয় সারা দিনের দাবদাহ কেমন হবে। এবার রমজানের শুরু থেকেই এ জেলায় গরমের মাত্রা যেনো বেড়েই চলেছে। গরমের তীব্রতায় ডায়রিয়া, নিউমোনিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুসহ অনেকেই। তারমধ্যে লোডশেডিংয়ের ভোগান্তিতো আছেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ‘সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চাপ বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের মূল কারণ। এ ছাড়া প্রচন্ড গরমে ফ্যান ও এসির সংখ্যা বেশি হওয়ায় সরবরাহের তুলনায় চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে খুলনা অঞ্চলে পাওয়ার স্টেশন না থাকাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অন্তরায় হয়ে দাড়িয়েছে। সম্প্রতি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ৪১০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ সমস্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি চালু থাকলে দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলায় বিদ্যুতের ঘাটতি থাকতো না।’
এদিকে, প্রখর রোদ্রের সঙ্গে তাপ প্রবাহ যেনো কেড়ে নিয়েছে সাধারণ মানুষের স্বস্তি। রোজাদাররাও হাপিয়ে উঠছেন বেলা শেষ হওয়ার আগেই। ইফতারির পর কিছুটা প্রাণচাঞ্চল্যতা ফিরে পাচ্ছেন তারা। জেলাজুড়ে গরমের তাপমাত্রা বাড়তি থাকায় শহরের ব্যস্ততম সড়কগুলো বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা ফাঁকা হয়ে যায়। কেউ গাছের ছায়ার নিচে আবার কাউকে রাস্তার পাশে শরবতের দোকানে আশ্রয় নিতে দেখা যাচ্ছে। সেখান থেকে কিছুটা শীতল হয়ে ফিরলেও তা বেশিক্ষণ ধরে রাখা সম্ভব হয় না। অপরদিকে এ গরমে সাধারণ যানবাহন রিকশা ও ভ্যান সড়কে তেমন একটা দেখাই মিলছে না। এতে শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি আয় কমেছে খেটে খাওয়া মানুষের। গতকাল চুয়াডাঙ্গা জেলায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী দু-তিনদিন এ অবস্থা বিরাজ করার পর বৃষ্টি হতে পারে।
শহর ঘুরে কয়েকজন পথচারী ও রাস্তার পাশের ফুটপাতের বিভিন্ন ধরণের দোকান নিয়ে বসা ব্যবসায়ীরা বলেন, বেচা কেনা দূরের কথা রোদের তাপে সড়কের পাশে বসাই যাচ্ছে না। গরমের তাপে অতিষ্ঠ হয়ে দুপুরের আগেই বাড়িতে চলে যাওয়া লাগে। ঈদের বাজারে ক্রেতাদের যখন সমাগম বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ঠিক সেই মুহূর্তেই পুরো বাজার ফাঁকা।
এ প্রসঙ্গে সমবায় নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ী সুমন পারভেজ খান (নন্দন) বলেন, ‘প্রতি বছর রমজানের শুরু থেকেই ক্রেতাদের ভিড় বাড়তে দেখা যায়। ঈদের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই সাধারণ মানুষ তাদের পছন্দের পোশাক কিনতে বাজারে আসে। কিন্তু এ বছরের চিত্র পুরোপুরি ভিন্ন! রোদ্রের তীব্রতা উপেক্ষা করে কেউ যেন মার্কেটে আসতেই চাইছে না। প্রায় সারাদিনই ক্রেতাশুন্য বাজারে পসরা সাজিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে আমাদের। আশা করছি আর দু’একদিন পর থেকে ক্রেতাদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাবে।’
রিকশা চালক নজরুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গরমের কারণে তারা দীর্ঘ সময় ধরে রিকশা চালাতে পারে না। ব্যাটারি চালিত হলেও তা অতিরিক্ত তাপে বিকল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই তাপমাত্রা বাড়ার আগ পর্যন্ত ও বিকালের দিকে যে ভাড়া পাওয়া যায় তা নিয়েই অনেককে বাসায় ফিরতে হয়।
অপরদিকে, ব্যস্ততা বেড়েছে নিরাপদ পানি সরবরাহকারী জেলা শহরের ৫টি কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। মোরগ ডাঁকা ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত বিরতিহীন ভাবে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ ও বাসাবাড়িতে পানি সরবরাহ করতে হচ্ছে তাদের। রমজান মাস শুরু হওয়ার পর থেকে তাপদাহ যত বৃদ্ধি পাচ্ছে পানির চাহিদা ততোই বাড়ছে। ইতিমধ্যে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভা পানির সরবরাহ বাড়াতে একটি ডিপ পাম্প উদ্বোধন করেছে। যা প্রতিদিন এক লাখ লিটারের কিছু বেশি পানি উৎপাদন করতে সক্ষম হচ্ছে। তবে আরও বেশ কয়েকটি পাম্প স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন নাগরিকরা। প্রয়োজনে ৩৭ জেলা শহর পানি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত পানি শোধনাগারটি দ্রুত চালু করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে পৌর মেয়র বলেন ওবায়দুর রহমান চৌধুরী জিপু বলেন, ‘বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা পৌরসভায় নিরাপদ পানির ঘাটতি নেই বললেই চলে। যেটুকু সমস্যা রয়েছে তা সমাধানে ইতিমধ্যে একটি পাম্প চালু করা হয়েছে। শিগগিরই অন্যান্য এলাকা জরিপের মাধ্যমে তাদের পানি সমস্যা ও চাহিদা জেনে আরও পাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হবে। এ ক্ষেত্রে নাগরিকরা নিয়মিত পানি ও বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করলে যথাযথ সেবা প্রদান করা আমাদের জন্য আরও সহজ হবে। কারণ প্রতিমাসে পানি সরবরাহ বাবদ যে টাকা ব্যয় করতে হয় তার অধিকাংশই বকেয়া থেকে যায়। যে কারণে চরম লোকসানের মুখে পড়তে হয় পৌর কর্তৃপক্ষকে।’
চিকিৎসকরা বলছেন, ‘তীব্র গরমে শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম ঝরছে। এতে শরীর থেকে লবণ বের হয়ে যায়। ফলে শরীরের রক্তচাপ কমে যায়, দুর্বল লাগে, মাথা ঝিমঝিম করে। যারা বাইরে কাজ করেন, প্রয়োজনীয় পানি পানের সুযোগ পান না, তারা মারাত্মক পানিস্বল্পতার শিকার হচ্ছেন। শ্রমজীবী মানুষই এর শিকার হচ্ছেন বেশি।’
অন্যদিকে তাপদাহের কারণে সর্দি, কাশি আর নিউমোনিয়াসহ জেলায় বেড়েছে শিশুদের নানা রোগ। হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। গত এক সপ্তাহে ডায়রিয়া জনিত কারণে ৯০ জন, নিউমোনিয়ায় ২ জনসহ প্রায় শতাধিক রোগী চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়। প্রতিদিন বর্হিবিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যাও কয়েক শতাধিক।
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. শামীম কবির জানান, গেলো এক সপ্তাহ ধরে সর্দি, জ্বর, কাশি নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে অনেকে। এরমধ্যে ডায়রিয়া ও গরম জনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ, ঔষধ প্রদানসহ প্রয়োজনে তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে।
এদিকে, গরম আর রোগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে জেলায় বিদ্যুতের ভোগান্তি। চুয়াডাঙ্গার চার উপজেলার নাগরিকদের বিদ্যুৎ সরবরাহ সেবাদান করছে মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোং লিঃ ও পিজিসিবি। তারপরেও টানা লোডশেডিং ও মাত্রাতিরিক্ত লো-ভোল্টেজে নাকাল এখানকার মানুষ। গরমে হাঁসফাঁস করে বাঁচলেও বিদ্যুতের এ ভোগান্তি যেন এখানকার জনসাধারণকে ভোগাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এ ভোগান্তির চাপ পড়েছে শিশুদের পড়া-লেখায়ও। বিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যুৎ চলে গেলে বন্ধ হয়ে যায় ফ্যান ও লাইট। এরপর দুর্বিসহ সময়ের মোকাবেলা করতে হয় শিক্ষার্থীদের, তারা প্রহর গুনতে শুরু করে আবার কখন আসবে বিদ্যুৎ! তাদের অনেকেই প্রচন্ড গরমে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তবে জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় মেহেরপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলায় লোডশেডিং নেই।’ বিদ্যুৎ নিয়ে প্রকট এ সমস্যা কাটাতে শিগগিরই চুয়াডাঙ্গা রুটে ৩৩ কেভি লাইন নির্মাণ হবে বলে নিশ্চিত করেছে ওজোপাডিকো লিঃ। তবে এসব নিয়ে পিজিসিবি’র এখনও কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিদ্যুতের এমন ভোগান্তির কথা স্বীকার করে এ সমস্যার কারণ তুলে ধরেছেন চুয়াডাঙ্গা ওজোপাডিকো’র নির্বাহী প্রকৌশলী সবুক্ত গীন। তিনি বলেন, ‘রমজান মাসে সারাদিন পর সন্ধ্যায় সরবরাহ লাইনে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। যা বিদ্যুতের লো-ভোল্টেজের মূল কারণ। এ ছাড়া প্রচন্ড গরমে ফ্যান ও এসির সংখ্যা বেশি হওয়ায় সরবরাহের তুলনায় চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে খুলনা অঞ্চলে পাওয়ার স্টেশন না থাকায় ভেল্টোজে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। সম্প্রতি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা ৪১০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল পাওয়ার প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এ সমস্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি চালু থাকলে দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলায় বিদ্যুতের ঘাটতি থাকতো না।’
তিনি রমজান মাসে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত সকল গ্রাহককে তাদের হেভি লোডেড ইলেকট্রিক মেশিন যেমন আয়রন, ওভেন, পানির পাম্প, মটর চালিত মেশিন, রাইস কুকার, লেদ, ওয়েল্ডিং মেশিন না চালানোর অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘এই সময়ে একসঙ্গে সকলে বিদ্যুৎ ব্যবহার করায় ভোল্টেজ কমে যায়। এ ব্যাপারে মিল/কল/ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি, চিঠি দিয়েছি। তারা এই সময়টুকু তাদের কার্যক্রম বন্ধ রাখলে ভোল্টেজ নিয়ে সমস্যা হবে না।’ এ ছাড়া এসির তাপমাত্রা ২৪ ডিগ্রির উপরে রাখার অনুরোধ জানান তিনি।
তবে এখন তাপদাহের সাময়িক যন্ত্রণা সহ্য করে নিলেও বিদ্যুৎ ভোগান্তির স্থায়ী সমাধান চান চুয়াডাঙ্গা জেলাবাসী।