মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিম্নবিত্ত হওয়ার পথে

66

বৈশ্বিক মহামারী হানা দেয়ার পর আমাদের দেশের অর্থনীতি পুরোপুরি বদলে গেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে মধ্যবিত্ত সবারই আয়-ব্যয়ের মাঝেও কিছু সঞ্চয়ের মানসিকতা গড়ে উঠছিল। বেসরকারি একটি ব্যাংকে পাঁচ হাজার টাকা করে দুটি ডিপিএস খুলেছিলেন অনেকে। সব মিলিয়ে ব্যবসায়ী-শ্রমিক, চাকরিজীবী সবার আয়-ব্যয়ের মাঝেও একটা অর্থনৈতিক সচ্ছলতা বিরাজ করছিল। তবে করোনা মহামারী শুরুর পর ধসে যায় সে অর্থনীতির বুনিয়াদ। ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো না, চাকরিতে ছাঁটাই বা বেতন অর্ধেক করে দেয়া সব মিলিয়ে এসব মানুষের সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। টানা তিন মাস কিস্তির টাকা জমা দিতে পারেননি তারা। কত দিনে অবস্থা ঠিক হবে, তা নিয়ে নিশ্চয়তা থেকে ডিপিএস ভেঙে ফেলেছেন অনেকেই। মধ্যবিত্ত-নিম্ন মধ্যবিত্তদের অনেকেই এখন আমানতের টাকা তুলে সংসার চালাচ্ছেন। জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে জমানো টাকা তুলে নিচ্ছেন হরহামেশা। আমানত উত্তোলন বেড়ে যাওয়া এবং নতুন আমানত কমে যাওয়ায় এখন ঋণের চাপ না থাকলেও ব্যাংকের দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে আন্তঃব্যাংক কলমানি ও বাংলাদেশ ব্যাংকে ধরনা দিচ্ছে কোনো-কোনো ব্যাংক। গতকাল একটি সহযোগী দৈনিকে এ খবর প্রকাশ হয়েছে।
গত কয়েক বছরে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের পাশাপাশি রিকশাচালক, দিনমজুর, মুদি দোকানি, হোটেল কর্মচারী, অনানুষ্ঠানিক খাতের চাকরিজীবীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের একটা মনোভাব গড়ে উঠেছিল। ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পরিমাণের অর্থ মাসিক ভিত্তিতে সঞ্চয় করছিলেন অনেকে। আবার একবারে হাতে ৫০ হাজার, এক লাখ বা যেকোনো পরিমাণ টাকা এলে তা মেয়াদি আমানত হিসেবে জমা রাখছিলেন। তবে করোনা ভাইরাসের কারণে এখন হঠাৎ অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। আয় না থাকায় অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরছেন। এমন অবস্থায় সংসার চালাতে মাঝপথে সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন। চাকরি হারানোয় কেউ কেউ টাকা তুলে নিজেই ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন। কেউ আবার তুলনামূলক বেশি লাভে অন্য কোথাও বিনিয়োগ করছেন। আরেকটি শ্রেণি আছে যাদের আয় না কমলেও কখন কী হয় এই অনিশ্চয়তা থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। কেউ কেউ আগে হয়তো মাসিক বেতন পর্যায়ক্রমে তুলে খরচ চালাতেন, কিন্তু এখন পুরো টাকা একবারে তুলে বাসায় রাখছেন। এসব কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক তারল্য বাড়াতে নানা সুবিধা দিলেও অনেক ব্যাংকে নগদ টাকার ওপর একটা চাপ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকায় ঋণ চাহিদা নেই বললেই চলে। ফলে করোনা ভাইরাসের এ সময়ে আদায় না থাকলেও কাগজে-কলমে ব্যাংক খাতের উদ্বৃত্ত বেড়ে এপ্রিল শেষে এক লাখ ১৩ হাজার ৮০৭ কোটি টাকা হয়েছে। গত মার্চ শেষে উদ্বৃত্ত ছিল ৮৯ হাজার ৯০৯ কোটি টাকা। আর গত ডিসেম্বর শেষে যা ছিল এক লাখ ৫ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা। ঋণের কিস্তি না দিলেও খেলাপি করা যাবে না ঢালাওভাবে এই সুবিধার ফলে ইচ্ছা করেই অনেক গ্রাহক টাকা দিচ্ছে না। আবার মাঝে দুই মাসের সুদ স্থগিতের পর অনেকেই এমন ধারণা করছেন, হয়তো এক পর্যায়ে সব সুদ মাফ করে দেবে সরকার। কিন্তু সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে গ্রামে চলে গেছে বড় একটি অংশ। পেশা বদল করছে অনেকে। করোনার কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিম্নবিত্তের তালিকায় চলে যাবে এটাই বড় সংকট।