ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল ৬ জনের

59

সরোজগঞ্জে আলমসাধু-পাখিভ্যান -মোটরসাইকেলে বেপরোয়া রয়েল এক্সপ্রেসের ধাক্কা

বাসচালকের ঘুমের কারণে এ দুর্ঘটনা : পুলিশের হত্যা মামলা দায়ের, চালক গ্রেপ্তার
ঘটনাস্থল থেকে ফিরে রুদ্র রাসেল/আকিমুল ইসলাম:
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার সরোজগঞ্জ বাজার এলাকায় বাসের ধাক্কায় ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও পাঁচজন। গতকাল শনিবার ভোর ছয়টার দিকে চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ সড়কের সরোজগঞ্জ বাজারের আতর আলী মার্কেটের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এ দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা হলেন- চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বসু ভান্ডারদোয়া গ্রামের নিতাই হাওলাদারের ছেলে ষষ্ঠী হাওলাদার (৩৫), তিতুদহ মাঝের পাড়ার নুতার ছেলে সোহাগ (২৫), একই গ্রামের রহিম মল্লিকের ছেলে শরীফ (৩২), পিয়াস আলীর ছেলে রাজু হোসেন (৩৫), হায়দার আলীর ছেলে শরিফুল ইসলাম ওরফে কালু (৪০), খাড়াগোদা গ্রামের মাহতাব আলীর ছেলে ও সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের এআই টেকনিশিয়ান মিলন হোসেন (৪০)। আহত ব্যক্তিরা হলেন- সরোজগঞ্জের বজলুর রহমানের ছেলে বাবলু (৪৫), মোহাম্মদজুমা গ্রামের খোদা বক্সের ছেলে আকাশ (১৮) ও তিতুদহের তৈয়ব আলীর ছেলে আলমগীর হোসেন (২৮)। এ ঘটনার পর চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নিহতদের দেখতে আসেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এদিকে, এ দুর্ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় বাসটির চালক পৌর এলাকার ফার্মপাড়ার মৃত আব্দুল ওহাবের ছেলে আসাদুল আলম (৫৯) ও বাসটির হেল্পার তালতলার লিটনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছে। গতকালই বাসটির চালক আসাদুল আলমকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।

জানা যায়, গতকাল শনিবার সকাল ছয়টার দিকে সরোজগঞ্জ থেকে চুয়াডাঙ্গা অভিমুখে সারিবদ্ধভাবে ষষ্ঠী হাওলাদার, আকাশ ও বাবলু একটি বরফভর্তি আলমসাধু যোগে যাচ্ছিলেন। অপর দিকে সোহাগ, রাজু, শরিফ, কালু, আলমগীর, বেল্টুসহ ছয়জন দিনমজুর ব্যাটারিচালিত একটি পাখিভ্যানযোগে পশু চিকিৎসক ডা. মিলনের ধানখেতে ধান লাগানোর কাজ করতে যাচ্ছিলেন। আর তাঁদের সামনে মোটরসাইকেলযোগে যাচ্ছিলেন ডা. মিলন। এ সময় চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা চুয়াডাঙ্গামুখী রয়েল এক্সপ্রেসের একটি যাত্রীবাহী বাস পেছন থেকে প্রথমে আলমসাধু পরে পাখিভ্যান ও এর পরপরই সামনে থাকা মোরসাইকেলটিকে চাপা দিয়ে চলে যায়। এ ঘটনায় আলমসাধুতে থাকা তিনজন, পাখিভ্যানে থাকা ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন ও মোটরসাইকেল আরোহী বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে গুরুতর জখম হন। জখম গুরুতর হওয়ায় ঘটনাস্থলেই দুজন মারা যান। খবর পেয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থানার পুলিশ, চুয়াডাঙ্গা ফায়ার সার্ভিসের দুটি টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিহত দুজন ও আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে নেয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. সাজিদ হাসান আরও তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে নেওয়ার পথের মধ্যেই তাঁদের মৃত্যু হয়। আহত বাকি চারজনকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিয়ে হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভার্তি করা হয়। সেখানে অবস্থার অবনতি হওয়ায় বাবলু ও শরিফুল ইসলাম ওরফে কালুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হয়। সকাল আটটার দিকে পরিবারের সদস্যরা বাবলুকে নিয়ে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যান। তবে রাজশাহী নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় হাসপাতালের প্রধান ফটকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কালু। নিহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। গতকাল সকালে হাসপাতালের লাশ ঘরে নিহতদের সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্বজনদের আহাজারিতে হাসপাতালের পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যুতে নিহতদের গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া বিরাজ করছে।

প্রত্যাক্ষদর্শী সরোজগঞ্জ বাজারের ফল ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন জানান, বাসটি দ্রুতগতিতে চুয়াডাঙ্গার দিকে যাচ্ছিল। সরোজগঞ্জ বাজারের আতর আলী মার্কেটের সামনে থেকে বাসটি একটি বরফভর্তি আলমসাধুকে ধাক্কা দিয়ে সমান গতিতে এগিয়ে যেয়ে আরও একটি পাখিভ্যানকে ধাক্কা দেয়। বাসটি ব্রেক করলে এত জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটতো না। নিঃসন্দেহে বাসচালক ঘুমে অচেতন ছিলেন।
ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাণে বেঁচে যাওয়া দুর্ঘটনার শিকার পাখিভ্যানের যাত্রী বেল্টু হোসেন বলেন, ‘পশু চিকিৎসক ডা. মিলনের ধানখেতে ধান লাগানোর জন্য আমরা ছয়জন পাখিভ্যানযোগে সরোজগঞ্জ বাজার ছাড়িয়ে ১০ মাইলের দিকে যাচ্ছিলাম। আমি ভ্যানের বাম পাশে বসেছিলাম। এমন সময় একটি দ্রুতগতির বাস ভ্যানের দিকে ছুটে আসতে দেখি। আমি লাফ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাসটি ভ্যানটিকে ধাক্কা মারে। এরপর সামনে থাকা মোটরসাইকেলেটিকেও পিষ্ট করে চলে যায় বাসটি। আমার কিছু না হলেও আমার সঙ্গে বসে থাকা চারজন ও ডা. মিলন মারা গেছে এবং হাসপাতালে ভর্তি আছে একজন।’
চুয়াডাঙ্গা ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুস সামাদ বলেন, ভোর ৬টা ৪০ মিনিটে সরোজগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের খবর পায়। এ সময় ফায়ার সার্ভিসের দুটি টিম দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেয়। এ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই দুজন মারা যায়, হাসপাতালে নিলে জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক আরও তিনজনকে মৃত ঘোষণা করেন। বাকি চারজনকে হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যান। এ ঘটনায় মোট ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে এবং তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন।
চুয়াডাঙ্গা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু জিহাদ ফকরুল আলম খান বলেন, ‘ভোরে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে আমরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেখান থেকে আহত ও নিহত ব্যক্তিদের লাশ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা নিই। রয়েল এক্সপ্রেস পরিবহনটি প্রথমে একটি আলমসাধু এরপর একটি ব্যাটারিচালিত পাখিভ্যান এবং শেষে একটি মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। আলমসাধু, পাখিভ্যান ও মোটরসাইকেলটি সড়কের বাম পাশ দিয়েই যাচ্ছিল। সুতরাং বাসটির ধাক্কায় বাসচালকের দোষে দুর্ঘটনা ঘটেছে। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি জব্দ করে পুলিশ লাইনসে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা মামলা করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় পুলিশ বাদী হয়ে চুয়াডাঙ্গা সদর থানায় বাসটির চালক পৌর এলাকার ফার্মপাড়ার মৃত আব্দুল ওহাবের ছেলে আসাদুল আলম (৫৯) ও বাসটির হেল্পার তালতলার লিটনকে আসামি করে হত্যা মামলা করা করেছে। এ ঘটনায় বাসটির চালক আসাদুল আলমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) শামীম কবির বলেন, সড়ক দুর্ঘটনায় একই সঙ্গে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। চারজনকে হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় দুজনকে রাজশাহী রেফার্ড করা হয়। এর মধ্যে একজনকে নিয়ে পরিবারের সদস্যরা সকাল আটটার দিকে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে হাসপাতাল ত্যাগ করে। রেফার্ডকৃত অপর একজনকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় তাঁর মুত্যৃ হয়। বর্তমানে হাসপাতালে দুজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন। নিহত ছয়জনের ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে, ভয়াবহ এ সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ পেয়ে সদর হাসপাতালে ছুটে যান চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক মো. নজরুল ইসলাম সরকার। এ সময় তিনি বলেন, একই সঙ্গে ছয়জনের মৃত্যু একটি মর্মাহত ঘটনা। ঘাতক বাসটির বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার প্রতি ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসাসহায়তা দেবেন বলেও জানান তিনি।

এ দুর্ঘটনার বিষয়ে রয়েল পরিবহনের চেয়ারম্যান সালাউদ্দীন বলেন, ‘দুর্ঘটনার বিষয়ে আমি পরে জানতে পেরেছি। এ দুর্ঘটনায় ছয়জন প্রাণ হারিয়েছেন। আমরা নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সহায়তার বিষয়ে বাস-ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি-সদস্যদের নিয়ে আগামীকাল (আজ রোববার) আলোচনা করব।’
এদিকে, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. সোহরাব হোসেনকেকে প্রধান করে অর্থোপেডিক কনসালট্যান্ট ডা. মিলোনুজ্জামান জোয়ার্দ্দার ও আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. শামীম কবিরকে সদস্য করে তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে নিহত ছয়জনের ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের স্বজনের নিকট হস্তান্তর করা হয়। গতকাল মাগরিবের নামাজের পর ডা. মিলনের দাফনকার্য ও এশার নামাজের পর নিহত অন্যদের দাফনকার্য গ্রামের কবরস্থানে সম্পন্ন করা হয়েছে। এছাড়া শ্মশানঘাটে সিহত ষষ্ঠীর লাশের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়েছে।