ভ্যাকসিন ঈশ্বরের প্রতীক্ষা

38

প্রযুক্তি প্রতিবেদন
আমাদের জীবন থমকে আছে। একটা ভয়ংকর রোগ সামাজিক মানুষকে শিখতে বলছে সামাজিক দূরত্ব। কাছের মানুষও হয়ে উঠেছে আতঙ্কের কারণ। জীবন ও জীবিকার প্রশ্ন মেলানো ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা ভর করছে আমাদের চিন্তার জগৎ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভ্যাকসিন ল্যাবের দিকে তাকিয়ে আছে দুনিয়ার তাবৎ মানুষ। প্রতীক্ষা—কখন দেখা মিলবে সেই প্রতীক্ষিত ভ্যাকসিনের। এ যেন ঈশ্বরের প্রতীক্ষায় সমগ্র মানবজাতি। যেখানে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সব ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ, বয়স এর জন্য একটাই সমাধান ভ্যাকসিন। প্রতীক্ষিত ভ্যাকসিনের জন্য আমাদের সম্মিলিত আত্মসমর্পণ। ভ্যাকসিন উৎপাদনের রাজনৈতিক অর্থনীতি যেখানে আলোচনায় গৌণ। কিংবা সেই আলোচনা প্রায় অপ্রয়োজনীয়। চিকিৎসাশাস্ত্র হিসেবে বায়োমেডিকেল শাস্ত্র এতটাই প্রতাপশালী, যেখানে ভ্যাকসিন উৎপাদনের রাজনৈতিক অর্থনীতি পর্যালোচনা করা অনেকটাই বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মহত্যার শামিল। এ কারণে যাদের দায়িত্ব ছিল ‘ভ্যাকসিন’ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার, তারাও বায়োমেডিকেল শাস্ত্রের কণ্ঠে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন, ভ্যাকসিনকে করে তুলছেন প্রশ্নাতীত।
ভ্যাকসিন একটা সমাধান, একমাত্র সমাধান নয়। যেভাবে বায়োমেডিকেল চিকিৎসাব্যবস্থা একধরনের চিকিৎসাব্যবস্থা, একমাত্র চিকিৎসাব্যবস্থা নয়। কিন্তু বায়োমেডিকেলের প্রতাপে আমরা ভুলতে বসেছি আমাদের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থা, যেখানে জীবনযাপন ও স্বাস্থ্যসেবা ছিল স্থানিক ও প্রাকৃতিক জ্ঞান ও সম্পদনির্ভর। মানুষের চিকিৎসাসেবা ছিল প্রধানত সমাজকেন্দ্রিক, যেখানে বাণিজ্য নয়, সেবা ছিল মুখ্য। কিন্তু সেই ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থা আমাদের কাছে হয়ে পড়েছে একধরনের কুসংস্কার, অবৈজ্ঞানিক বিশ্বাস। আমরা নিজেদের সঁপে দিয়েছি বিজ্ঞানমনস্ক, বাজারকেন্দ্রিক বায়োমেডিকেল চিকিৎসাব্যবস্থায়। আমাদের এই আত্মসমর্পণ বায়োমেডিকেল চিকিৎসাব্যবস্থাকে ক্রমেই একমাত্র চিকিৎসাব্যবস্থায় পরিণত করছে। এ কারণে আমাদের জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে সামাজিক ও প্রাকৃতিক অনুশাসনের চেয়ে আবশ্যিক হয়ে পড়েছে বায়োমেডিকেল প্রযুক্তি। আমরা প্রশ্ন ছাড়াই বাধ্যতামূলকভাবে মেনে নিয়েছি বায়োমেডিকেল ব্যবস্থাপত্র।
এই প্রক্রিয়ায় আমাদের অন্য সব চিকিৎসাজ্ঞান প্রান্তিক হয়ে পড়েছে। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাজ্ঞান নিয়ে কথা বলা কিংবা গবেষণা করা মানুষের সংখ্যা যেমন দিন দিন কমছে, তেমনি সেসব চিকিৎসাজ্ঞান বায়োমেডিকেল প্রতাপে প্রান্তিক হয়ে পড়ছে। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে যে গবেষণা হতে পারে; সেখানেও গবেষণার মধ্যে দিয়ে যে চিকিৎসাব্যবস্থাকে আরও সমৃদ্ধ করা যেতে পারে, তা কোনোভাবেই আমাদের মনোযোগ পায় না। আমাদের মনোজগৎ এতটাই বায়োমেডিকেল চিকিৎসা–অধ্যুষিত, এই ব্যবস্থার বাইরে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসাব্যবস্থাকে প্রতিরোধে আমরা নিজেরাই সচেষ্ট। এ যেন বায়োমেডিকেল ঈশ্বরের সন্তুষ্টিতে নিজেকে বলিদান।
আমরা যে বায়োমেডিকেল চিকিৎসাব্যবস্থায় নির্ভর করছি, তা স্বাস্থ্যসেবাকে কেনাবেচায় পরিণত করেছে। এই ব্যবস্থায় জ্ঞান হয়েছে অসুস্থ প্রতিযোগিতার অংশ। মানবকল্যাণে উদ্ভাবনকে কাজে না লাগিয়ে কোম্পানি ও কোম্পানির পেটেন্টে এ পরিণত হয়েছে জ্ঞান। জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞানদানের চেয়ে গোপনীয়তা এবং জ্ঞানের মালিকানা মুখ্য হয়ে পড়েছে। করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে যেসব ভ্যাকসিন ল্যাব কাজ করছে, তাদের একটাই লক্ষ্য, সবার আগে গোপনীয়তার সঙ্গে ভ্যাকসিন উৎপাদন করা এবং বাজারে ছাড়া। এ যেন এমন এক আরাধনা, যেখানে সবাইকে ছাড়িয়ে সবার আগে ভ্যাকসিন ঈশ্বরের দেখা মেলার প্রতিযোগিতা। এ কারণে করোনা ভ্যাকসিনের দেখা মেলার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মার্কেটের শেয়ারের দাম বেড়ে যায়। মানুষের সেবার আগে ভ্যাকসিন ঈশ্বর পুঁজিবাজারের সেবক হয়ে ওঠেন।
উদ্ভাবনে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সেই উদ্ভাবন যদি কেবল বাজারকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে, তাহলে সেখানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব রাখে বাজারের লাভ-ক্ষতির হিসাব; মানুষ কিংবা মানুষের স্বাস্থ্য যেখানে মুখ্য নয়। আর তাই অন্য সব পণ্যের মতো ভ্যাকসিনও হয়ে যায় একটি পণ্য মাত্র। সেবা নয় বিক্রির মোড়কে আবৃত হয় ভ্যাকসিন, ব্র্যান্ড পরিচয়ে পরিচিত হয় এবং বিজ্ঞাপনে ভরে যায় মোড়কে ঢাকা পড়া তথাকথিত জীবন রক্ষার উদ্ভাবন। জীবন রক্ষার কথা বলে উদ্ভাবিত এই ভ্যাকসিন নিজের মূল্য ঠিক করে নেয় বাজারের দামে, জীবন থেকে যায় কেবল বিজ্ঞাপনের ভাষায়।
একদিকে স্থানিক চিকিৎসাজ্ঞানকে ধ্বংস করা, অন্যদিকে নিজেকে চড়া বাজার দামে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে বায়োমেডিকেল-চিকিৎসায় নয় ব্যবসায় বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা যখন পুঁজিবাজারের শেয়ার, তখন সেই শেয়ারে যে অবদান রাখতে পারে, স্বাস্থ্যসেবা কেবল তার নাগালে ধরা দেয়। এ কারণে বায়োমেডিকেল চিকিৎসাসেবার প্রথম ও প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়ায় চিকিৎসা কেনার সামর্থ্য থাকা বা না থাকা।
রোগীর সেবার নিশ্চয়তা তখনই সম্ভব হয়, রোগী যখন সেই সেবা কেনার সামর্থ্য রাখে। রোগীর রোগের ভোগান্তি থেকে মুক্তির আগে এই বাজারকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থা জেনে নেয় সেই রোগীর পকেটের অবস্থা। আর এ কারণে করোনা ভ্যাকসিনের উদ্ভাবন মানেই দুনিয়ার সব মানুষের কাছে সেই ভ্যাকসিনের সুবিধা পৌঁছাবে না। যেভাবে অনেক ঈশ্বর সবার কাছে পৌঁছায় না, ভ্যাকসিন ঈশ্বরও সেটার ব্যতিক্রম হবেন না। অন্য স্বাস্থ্যসেবাগুলো যাঁদের কেনার সামর্থ্য আছে, তাঁরাই কেবল এই ঈশ্বরের দেখা পাবেন। আর যাঁরা চিকিৎসা সেবা কিনতে না পারার সামর্থ্যহীনতার কারণে আগেও ভুগতেন এখনো ভুগবেন ভ্যাকসিন ঈশ্বরের দেখা পাবেন না।