বড় পদ পাবে না বিদ্রোহীরা

54

সমীকরণ প্রতিবেদন:
বিদ্রোহী আওয়ামী লীগের বিষফোঁড়া! এই বিদ্রোহীদের কাছেই গত পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ১৩৫টি উপজেলায় হেরেছিল নৌকাপ্রতীকের প্রার্থীরা। দলীয় বিদ্রোহী থাকায় অভ্যন্তরীণ কোন্দল সৃষ্টি হয়েছে তৃণমূল আওয়ামী লীগে। আর এই বিদ্রোহীদের সরাসরি মদদ দিয়েছিলেন স্থানীয় সাংসদ এবং প্রভাবশালীরা। এ বিষয়টিতে প্রথমে কঠোর অবস্থানে থাকলেও বিদ্রোহীদের সাধারণ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে শেষ রক্ষা হচ্ছে না ক্ষমতাসীন দলটির দলীয় বিদ্রোহীদের। তৃণমূলে সম্মেলনের মধ্যদিয়ে গঠিত নতুন কমিটিগুলোতে স্থান পাবেন না স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীরা। বিশেষ বিবেচনায় রাখা হতে পারে সদস্যপদে। একই সাথে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের দলীয় মনোনয়ন না দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগের হাইকমান্ড।
আ.লীগ সূত্র জানায়, গত শনিবার অনুষ্ঠিত হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ড সভা। ওই সভায় আলোচনায় উঠে আসে দলীয় বিদ্রোহীদের কথা। এ সময় জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের একাধিক নেতা অভিযোগ তোলেন, বিগত দিনে বিদ্রোহীদের ছাড় দেয়ায় তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে বলয়ভিত্তিক রাজনীতি। আর এসব কোন্দল নিরসনে হিমশিম খাচ্ছে বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্তরা। তাই তৃণমূলে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিদ্রোহী প্রার্থী যতই জনপ্রিয় হোক, তাদের দলীয় মনোনয়ন না দিতে সভানেত্রীর কাছে আবেদন করেন তারা। এসময় বঙ্গবন্ধুকন্যাও তাদের সাথে একমত প্রকাশ করেন। বিদ্রোহীরা যেনো দলীয় প্রতীক না পায় সেদিকে নজর রাখতে কঠোর নির্দেশনা দেন তিনি। দলের মনোনয়ন বোর্ডের এমন সিদ্ধান্তের পর আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে বিগত দিনে কোনো বিদ্রোহী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে না। একই সাথে পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহীদের দলের শীর্ষ পদে রাখতে নারাজ আওয়ামী লীগ। তৃণমূলে সম্মেলনের মধ্যদিয়ে দায়িত্বশীল পদপদবি থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে তাদের। এর আগে দলে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর থাকলেও বিদ্রোহীদের কখনো সরাসরি শাস্তি দেয়নি আওয়ামী লীগ। এ নিয়ে তৃণমূলে ক্ষোভ দেখা দিলেও সব সময় পার পেয়ে যায় বিদ্রোহীরা। তবে এবার আর নয়। আসন্ন পৌরসভা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী দেয়ার ক্ষেত্রে বিদ্রোহীদের বিষয়ে ছিলো কঠোর। জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিগুলোতেও স্থান হবে না বিদ্রোহীদের। এক কথায় তৃণমূল কোন্দলমুক্ত রাখতে তৎপর আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা। যদিও দলের এই সিদ্ধান্তগুলো পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন হলে কেন্দ্রের প্রতি পূর্ণ আস্থা ফিরবে তৃণমূল আওয়ামী লীগের।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিদ্রোহীরা ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। আওয়ামী লীগ তাদের ক্ষমা চাওয়াকে মূল্যায়ন করেছে। সবাইকে সাধারণ ক্ষমা করে দিয়েছে। তবে কাউকে কিন্তু দলীয় পদে বহাল রাখা হয়নি। বহিষ্কারও বহাল রাখা হয়েছে। তাই বিদ্রোহীদের দলীয় পদে আসার আর কোনো সুযোগ নেই। নৌকার বিরুদ্ধে নির্বাচন করে তারা নিজেরাই সেই সুযোগ নষ্ট করেছেন। তথ্যমতে, একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের মধ্যদিয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। ওই নির্বাচনে ভোটের মাঠে দলীয় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ থাকলেও মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দেশে ১৩৫টি উপজেলায় নৌকার প্রার্থী হেরে যায়। নৌকার বিপক্ষে জয়লাভ করা অধিকাংশ নেতাই ছিলেন আওয়ামী লীগের দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী। এই বিদ্রোহীদের সরাসরি পক্ষে নিয়ে ভোটের মাঠে কাজ করেন স্থানীয় সাংসদ এবং দলের প্রভাবশালী নেতারা। প্রভাবশালীরা প্রকাশ্যে নৌকার বিরোধিতা করায় তৃণমূলে ব্যাপক কোন্দলের সৃষ্টি হয়। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, হামলা-মামলার শিকার হন নৌকা সমর্থকরা।
অভ্যন্তরে সৃষ্ট এসব কোন্দলের জন্য অভিমানে দূরে সরে যাচ্ছেন দলের ত্যাগী, পরিশ্রমী, মেধাবী এবং দুর্দিনে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে মাঠের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা নেতাকর্মীরা। তবে এই অবস্থা থেকে দলকে মুক্ত করতে চান আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য দায়িত্বশীল নেতাদের কঠোর নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। নেত্রীর নির্দেশের পর কাজ শুরু করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। তারা বিতর্কমুক্ত তৃণমূল গঠনে ওয়ার্ডপর্যায়েও নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব তৈরি করছেন। তাই শুধু পৌরসভা নির্বাচনে বিদ্রোহীদের মনোনয়ন বঞ্চিত করা নয়, সম্মেলনের মধ্যদিয়ে তৃণমূলে মেয়াদোত্তীর্ণ নতুন কমিটিগুলোতেও স্থান পাবেন না জাতীয় এবং স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় বিদ্রোহীরা। তবে বিশেষ বিবেচনায় রাখা হবে সদস্যপদে। এজন্য স্থানীয় সাংসদ কিংবা দলের প্রভাবশালীরা যেনো পক্ষপাতিত্ব না করতে পারেন, সেদিকে নজর রাখছেন আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা।
আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক বলেন, জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পদে থেকে অনেকেই গত পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছিলেন। কেউ কেউ ভোটের মাঠে জয়লাভও করেছেন। তাদের কোনোভাবেই দলের শীর্ষ পদে রাখা হবে না। এটাই তাদের জন্য শাস্তি। তিনি আরও বলেন, সে সময় বিদ্রোহীদের সাধারণ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মেয়াদোত্তীর্ণ জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিগুলোতে বিদ্রোহীদের স্থান দেয়া হবে না। তবে বিশেষ বিবেচনায় তাদের সদস্যপদে রাখা হতে পারে। ভোটের মাঠে নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় এটাই তাদের জন্য শাস্তি।