বেসরকারি বিনিয়োগে চাপ পড়তে পারে

226

বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বুধবার। বাজেটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রত্যয়ে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের জন্য অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ। জানুয়ারি-জুন মেয়াদের মুদ্রানীতিতে এ লক্ষ্য ছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। ঋণের প্রবৃদ্ধি কমানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক আসলে কী করতে চেয়েছে, তা স্পষ্ট হলো না। সরকার যখন বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সচেষ্ট, ঠিক সে মুহূর্তে ঋণের লাগাম টেনে ধরা কতটা সমীচীন হবে, তা চিন্তার বিষয়। এ কথাও সত্য, কাঙ্খিত হারে বিনিয়োগ না হওয়ায় আলোচ্য লক্ষ্যই অর্জন করা যাচ্ছে না। এছাড়া ঋণের একটি অংশ খেলাপি হচ্ছে। এ কারণে কোনো ধরনের সংস্কার ছাড়া ঋণের লাগাম টেনে ধরা বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়শীল দেশের জন্য যৌক্তিক হবে না। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ আরো নিরুত্সাহিত হতে পারে, যা রাজস্বনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে এবারো মুদ্রানীতিতে পলিসি রেটের কোনো পরিবর্তন না করে গত অর্ধের মতো একই ফলাফল আশা করা হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বড় সমস্যা হলো খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি। ঋণের লাগাম টানার মাধ্যমে এ পরিস্থিতির উন্নতি হবে কিনা, তাও একটি প্রশ্ন।
বড় প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন এবং এক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা করেছিল সরকার। কিন্তু গত কয়েক বছরে এতে তেমন সুফল মেলেনি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম কাজ হওয়া উচিত আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার মাধ্যমে অধিক প্রবৃদ্ধিবান্ধব বেসরকারি খাতকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়া। আর তা যদি করতে হয়, ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরো বেশি মনোযোগী হওয়ার মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ রোধের উদ্যোগ নিতে হবে। নইলে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখার চেয়ে পাচারে বেশি সহায়ক হবে। কেউ যেন অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে ঋণ নিয়ে চলে যেতে না পারে, সেদিকেই বাংলাদেশ ব্যাংককে অধিক নজর দিতে হবে। ব্যাংকিং খাতে যেসব ঘোষিত অপরাধমূলক ঘটনা ঘটেছে এবং যে অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে, তা অব্যাহত থাকলে মুদ্রানীতি কোনো সুফল বয়ে আনতে পারবে না।
আমরা সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়াতে চাইলেও পারছি না। এজন্য ঋণ ও আমানতের মধ্যে সুদের হারের ব্যবধান (স্প্রেড) কমাতে হবে। ব্যাংকগুলো বলে, খেলাপি ঋণ বেশি থাকায় ¯েপ্রড কমানো যাচ্ছে না। সেই হিসেবে বলা যায়, খেলাপি ঋণ মুদ্রানীতি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। আবার বিনিয়োগ শুধু ব্যাংকের সুদের হারের ওপর নির্ভর করে না। গ্যাস-বিদ্যুতের স্বল্পতা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণেও এখানে বিনিয়োগ বাড়ছে না। সরকারকে এদিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। যানজট পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতেও বিনিয়োগে নিরুত্সাহিত হচ্ছেন অনেক বিনিয়োগকারী। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুদ্রানীতির লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, যার প্রভাব অর্থনীতিতে পড়ে। মুদ্রানীতির পূর্ণ ও সঠিক বাস্তবায়নে তদারকি জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি, বাংলাদেশ ব্যাংক এদিকে বিশেষ মনোযোগ দেবে। অনেকের আশঙ্কা, এবারের মুদ্রানীতি কিছুটা সংকোচনমূলক হয়ে গেল কিনা। আগামী দিনের গতিবিধির ওপরই এটি নির্ভর করবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির চাপ থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির সীমা পুনর্বিবেচনা করবে বলেই আমাদের প্রত্যাশা। কারণ কর্মসংস্থানমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য উৎপাদনমুখী খাতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন।