বেগমপুরের জমিদার বাড়ি এখন গোয়ালঘর!

161

– শামীম হোসেন মিজি
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বেগমপুর গ্রামে পুরাতন চিত্রা নদীর পূর্বপ্রান্তে (বর্তমান বেগমপুর বাওরের পূর্ব প্রান্তে) কালের সাক্ষী হয়েও ধবংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার শহরাম রায়ের ঐতিহ্যবাহী বাড়ি। সদর উপজেলার বেগমপুর ইউনিয়নের বেগমপুর গ্রামের ভুমি অফিস-সংলগ্নে অবস্থিত এ বাড়িটি। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে বাড়িটির অবস্থান। বাড়িটির পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে বেগমপুর বাওড়। এ জমিদার বাড়ির সঙ্গে বেগমপুর গ্রামের নামকরণের ইতিহাস জড়িত। কথিত আছে, বেগমপুরের এই বাওড় (সেই সময়ের চিত্রা নদী) দিয়ে নবাব আলীবর্দির কন্যা ঘষেটি বেগম কালিগঞ্জ হয়ে ঢাকা যাচ্ছিলেন। নদীকেন্দ্রীক নদীয়া জেলায় জালের মতো ছড়িয়ে ছিল নদী, তাই ঘষেটি বেগম ঢাকা যাওয়ার শর্টকাটে যেতে এ পথে গিয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তখন ঘষেটি বেগম জমিদার শহরাম রায়ের অনুরোধে জমিদার বাড়িতে বিশ্রাম গ্রহণ করেন। ঘষেটি বেগম যে ঘরে বিশ্রাম গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তীতে সেই ঘরের নাম হয় বেগম হল। সেই বেগম হল থেকেই গ্রামের নামকরণ হয়ে যায় বেগমপুর। পরবর্তীতে ইউনিয়নেরও নামকরণ হয় বেগমপুর।
কে এই জমিদার শহরাম রায়?
ঠিক কত বছর আগে এই ভবনগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, তা জানা না গেলে ১৮৮০ সাল থেকে ১৯৪০ সালের সিএস (ঈঝ) জরিপে শহরাম রায়ের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়। জানা যায়, শহরাম রায়ের পিতা কালীচরণ রায় কলকাতার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি নাটোরের রাজ পরিবারের রাজা রামক্রান্তের নিকট থেকে জমিদারি ক্রয় করেন। ধারণা করা হয়, রাণী ভবনীর শাসনামলে শহরাম রায় তাঁর পিতা কালীচরণ রায় মারা যাওয়ার পর জমিদারি সামলাতে এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। শহরাম রায় নাটোরের রাজার অধীনস্থ ও নাটোরের রাজা আবার নবাব আলীবর্দির অধীনস্থ ছিলেন।
জমিদার বাড়ির হালচাল:
জমিদার বাড়ির এক জায়গায় একটি নাম লেখা আছে, অক্ষয় মিস্ত্রি। ধারণা করা হয়, তিনি ছিলেন বাড়ির নির্মাণশিল্পী। এখন আর জমিদার বাড়ির জমিদারি নেই, সঙ্গে নেই গোয়ালঘর, কাচারি ঘর, বেগম হল ও খাজনা ঘর। অক্ষয় মিস্ত্রির হাতের ছোয়ায় নির্মিত জমিদার বাড়ি অক্ষয় হতে পারেনি। জমিদারের মূল ঘরের যে অংশটুকু টিকে আছে, তার ও প্লাস্টার খসে পড়েছে, জানালা-দরজা ভেঙে গেছে, কিছু জায়গায় ছাদ ধসে পড়েছে। ছাদের ওপর বটগাছের জন্ম ও তার শিকড় দেওয়াল ও ছাদ ফুড়ে বের হয়ে পড়েছে। ভেতরে অনিন্দ্যসুন্দর কারুকাজ। এই বাড়িতে এখন চারটি ঘর আছে। দুটি শোবার ঘর, একটি বড় ঘর ও আরেকটি বৈঠকখানা আছে। ঘরের ভেতর দেওয়ালে প্রদীপ জ্বালানোর জন্য খোপ বা কুঠোর রয়েছে। জানালা-দরজা কাঠ ও লোহা দিয়ে তৈরি। ভবনটির প্রতিটি কক্ষে দুটি দরজা আছে। দিনের বেলা পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের জন্য প্রতি ঘরে ৩-৪টি ঘরে জানালা আছে। দেয়ালগুলো ইট দিয়ে নির্মিত। ভবনের ছাদ লোহার পাটাতনের ওপর ঢালাই দেওয়া। বেগম হলে যেখানে ঘষেটি বেগম ছিলেন, সে জায়গায় বর্তমানে ইউনিয়ন ভূমি অফিসারের কার্যালয়। এই এলাকার সেই সময়ের প্রভাবশালীরা বাড়ির অনেকগুলো ভবনের ইট, জানালা, দরজা খুলে নিয়ে যান। এ ঘটনার সত্যটা স্বীকার করে যদুপুর গ্রামের আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমি ছোট থাকতে সেই সময়ের প্রভাবশালীদের ঘর ভেঙে নিয়ে যেতে দেখেছি।’ বর্তমানে জমিদার বাড়ির ভেতর ও ভাঙা অংশে আশেপাশের বাড়ির লোকজন গরু-ছাগল পালন করেন।
নদীপাড়ের বাড়ি বা হাওয়া ভবন:
জমিদার বাড়ি থেকে দুই মিনিট উত্তর দিকে হাটলে জমিদার শহরাম রায়ের আরেকটি স্থাপত্য নিদর্শন দেখতে পাওয়া যায়। যেটাকে নদীপাড়ের বাড়ি বলে। সেই ভবন দীর্ঘ দিন বেগমপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হয়েছে। যখন সেই ভবনটি ভেঙে পড়ে, তখন সরকার পাশেই নতুন হাসপাতাল ঘর নির্মাণ করলেও পুরাতন ঐতিহ্যবাহী ভবনটি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেনি। হাসপাতাল ভবনে চারটি ঘর রয়েছে, একটি ঘরের ছাদ সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, বাকিগুলোর ছাদ ভেঙে পড়ার অবস্থায়।.ঘরের যে অংশটুকু টিকে আছে, তারও প্লাস্টার খসে পড়েছে, জানালা-দরজা ভেঙে গেছে। এখানে একটি গভীর কূপ বা ইন্দারা ও বাড়ির পেছনের দুই কক্ষে যেতে একটি গেট রয়েছে। গেটটি বর্তমানে বন্ধ। জমিদার এ নদী বা বাওড় পাড়ের এ ভবনটি কী কাজে ব্যবহার করতেন, তা জানা না গেলেও এই ভবনের পেছনের দিকে নদীতে অতীতে ঘাট থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।
হাসপাতাল থেকে দুই মিনিটের দূরত্বে বেগমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। যা শুরু হয়েছিল জমিদার শহরাম রায়ের একটি ভবনকে কেন্দ্র করে। অথচ সেই ঐতিহাসিক ভবন ভেঙে সেখানে এখন গড়ে উঠেছে আধুনিক ভবন। বর্তমানে জমিদার শহরাম রায়ের ভবন সমূহের ৬০ ভাগ বিলীন হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে বিলীনের পথে বেগমপুরের ইতিহাস ও শহরাম জমিদারের ইতিহাস। এই ভবনগুলো হারিয়ে গেলে এই অঞ্চলে মানুষ বসবাসের ইতিহাস হবে ১৯৪৭ সালের পরে শুধু মুসলিমদের বসবাসের ইতিহাস। কেউ বিশ্বাস করবে না যে এই গ্রামে বাস করতেন চুয়াডাঙ্গার সূর্যসেন অনন্ত হরি মিত্র ও জমিদার শহরাম রায়রা। যে বেগমপুর এক সময় জমিদার শহরাম রায়ের ছিল, যাঁর জমি ও ভবনে সরকারি স্কুল, হাসপাতাল, ভূমি অফিস গড়ে উঠেছে সেই ব্যক্তির শেষ স্মৃতি চিহ্নটুকু মুছে যেতে বসেছে। ১৯৪৭ সালে জমিদার প্রথা পাকিস্তান সরকার বিলুপ্ত করার পর জমিদারের বংশধরা এদেশ ছেড়ে চলে যান। হিন্দু ও মুসলিম এই দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ হয়। তাই এ দেশে আগত মুসলিমরা হিন্দুদের ইতিহাস চর্চা ও তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণ করতে চাননি। তাই হারিয়ে গেছে ইতিহাসের অনেক উপাদান। চুয়াডাঙ্গায় ব্রিটিশ স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক স্থান এমনিতেই কম। এখনি ভবনগুলো সংরক্ষণের ব্যবস্থা না করলে, আগামী বর্ষায় তা ধসে পড়তে পারে।
এ অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে জমিদার বাড়িটি সংরক্ষণে জেলা প্রশাসক ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এই বাড়িটির সঙ্গে জমিদার শহরাম রায়, ঘষেটি বেগম, বিপ্লবী অনন্ত হরি মিত্র ও বেগমপুরের নামকরণের ইতিহাস লুকায়িত, এটা সংরক্ষণ করা খুব জরুরি।

লেখক:
সভাপতি, শেকড়
সমাজকল্যাণ সম্পাদক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা সংসদ