বৃষ্টির বাগড়াতেও চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুরে ঈদ উদ্যাপন

12

বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পবিত্র ঈদুল আজহা পালিত
সমীকরণ প্রতিবেদন:
বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা। চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপরের বিভিন্ন স্থানে ঈদের দিন সকালে বৃষ্টি উপেক্ষা করে ঈদের জামাতে অংশ নেয় ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা। তবে ঈদের দিন বৃষ্টির কারণে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বিনোদনপিপাসু মানুষের উপস্থিতি ছিল খুবই কম।
চুয়াডাঙ্গা:
ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই উৎসব। বছর ঘুরে এ দিনটি এলে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনসহ প্রিয়জনদের সঙ্গে আনন্দে মিলিত হন সবাই। ডেঙ্গু আতঙ্ক আর বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করেই ঈদের নামাজ আদায় করে পশু কোরবানি শেষে সবাই যে যার মতো বের হয়ে পড়েন ঘুরতে। কোরবানি নিয়ে যাঁদের ব্যস্ততা নেই, তাঁদের কেউ কেউ মেতে ওঠেন আড্ডায়, কিংবা পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থনসহ নানা গল্পে। কিন্তু এবার সেই আনন্দে বাদ সেধেছে বৃষ্টি। ঈদের দিন সোমবার সকাল থেকেই চুয়াডাঙ্গা শহর ছাড়া বিভিন্ন স্থানে মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে আটকে পড়েন অনেকে। ঈদের নামাজ আদায়ের পরই বৃষ্টিতে আটকা পড়েন অনেক মুসল্লি; অনেকে নামাজ আদায়ের সময়ই বৃষ্টিতে ভিজেছেন। কোথাও কোথাও ঈদগাহে নামাজ পড়তে না পেরে মসজিদে ঈদের নামাজ আদায় করতে দেখা গেছে মুসল্লিদের। এরপরও নামাজের পর মোড়ে বা পাড়ার ছোট দোকানের সামনে দলবেঁধে অনেকের আড্ডা দিতে দেখা গেছে। তবে বৃষ্টির কারণে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বিনোদনপিপাসু মানুষের উপস্থিতি ছিল খুব কম। শেষ বিকেল বা সন্ধ্যায় বৃষ্টি কমলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মিলিত হতে দেখা যায় তরুণ-তরুণীদের।
ঈদের দিন দিনভর বৃষ্টি বাগড়া দিলেও পরদিন নিজ প্রিয়জন ও শিশুসন্তানদের নিয়ে চুয়াডাঙ্গার বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ছুটেছেন বিনোদনপ্রেমী মানুষগুলো। পবিত্র ঈদুল আজহায় পশু কোরবানি দেওয়ার ব্যস্ততা থাকায় পরদিন মঙ্গলবার চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের পুলিশ পার্ক, শিশুস্বর্গ, বিএডিসি খামার, দামুড়হুদার মেহেরুন শিশু পার্ক ও চিড়িয়াখানা, দর্শনার শাপলা পার্ক, দর্শনা ও জীবননগর স্থলবন্দর সীমান্তবর্তী এলাকা কিছুটা মুখর হয়ে ওঠে ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরীসহ বিনোদনপ্রেমী মানুষের পদচারণায়। ঈদ উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গা কেঁটের বিলপাড়েও বেড়াতে যান অনেকে।
ঈদের আগের দিন ও পরের দিন ছাড়াও আজ ১৫ আগস্টের সরকারি ছুটির পর রয়েছে দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি। সব মিলিয়ে রোববারের আগে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। ছুটির এ সময়ে সুদূর আমেরিকা থেকে পরিবার নিয়ে জীবননগরের উথলীতে নিজ গ্রামে ঈদ করতে এসেছেন হালিকুর রহমান বিল্টু। তিনি বলেন, ‘ঈদের দিন কোরবানির পশু জবাই, স্বজনদের বাসায় বেড়ানোর মধ্যে দিয়ে সময় পার করি। আর যে কয়দিন আছি এ সময়টুকু সন্তানদের নিয়ে মায়ের সঙ্গে থাকতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঈদের টানা ছুটিতে এবার গ্রামে এসেছি মা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে ঈদ করতে। অনেক বছর পর সবাই এক সাথে, এ যেন এক পারিবারিক মিলনমেলা। সব মিলিয়ে এবারের ঈদের আনন্দটা অনেক বেশি হচ্ছে। ঈদের পরদিন সকাল থেকে বৃষ্টির জন্য বাসা থেকে কয়েকবার প্রস্তুতি নিয়েও বের হতে পারিনি। বিকেলের পর বৃষ্টি কম হওয়ায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গার অঞ্চলজুড়ে ভারতের সীমান্ত এলাকা ও ঐতিহ্যবাহী কেরুজ চিনিকল এবং ডিস্টিলারি ঘুরে দেখলাম।’
তবে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টিপাত বেড়ানোতে বিঘœ ঘটালেও আটকাতে পারেননি হালিকুর রহমানের মতো আরও অনেকেরই। চুয়াডাঙ্গার পুলিশ পার্ক, শিশুস্বর্গ পার্ক, বিএডিসি খামার, দামুড়হুদার মেহেরুন শিশু পার্কেও মানুষের আনাগোনা বেশ দেখা গেছে। তবে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে শিশুদের থেকে উঠতি বয়সি যুবক-যুবতীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঈদের দিন সকাল থেকে বৃষ্টির কারণে তেমন দর্শনার্থী আসেনি। তবে ঈদের পরদিন থেকে বৃষ্টি উপেক্ষা করেই সব বয়সের দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেছে বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে। আগামী শুক্রবার-শনিবার পর্যন্ত স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশি ভিড় থাকবে বলে জানায় এ সব বিনোদন কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ।
সারা দেশের ন্যায় চুয়াডাঙ্গা জেলা কারাগারেও ঈদ আনন্দের কমতি হয়নি। বন্দীরা সকালে মুড়ি, পায়েস আর সেমাই দিয়ে ঈদের দিন শুরু করেছেন। রাতে তাঁদের গরু ও খাশির মাংস দিয়ে খাবার পরিবেশ করা হয়। এ ছাড়া ছিল নানা আয়োজন। সোমবার সকাল আটটায় কারাগারের ভেতরের ময়দানে ঈদুল আজহার একমাত্র জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জামাতের পরপরই বন্দীরা একে অন্যের সঙ্গে কোলাকুলি করেন। হাসি-ঠাট্টায় মেতে ওঠেন। ঈদ উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও বন্দীরা কারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে দেখা করতে আসা পরিবারের সদস্যদের আনা খাবার গ্রহণ করেন।
ঈদের দিন সরকারি শিশু পরিবারের সদস্যদের নতুন জামা-কাপড় ও উন্নতমানের খাবার পেয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত দেখা গেছে। দুপুরে সপরিবারে তাঁদের মধ্যে খাবার বিতরণ করেন জেলা প্রশাসক গোপাল চন্দ্র দাস। এর আগে সকালে ঈদের নামাজ শেষে সরকারি শিশু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন পৌর মেয়র ওবাইদুর রহমান চৌধুরী জিপু। সকাল আটটায় পুলিশ লাইনস মাঠে নামাজ শেষে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে কোলাকুলি ও শুভেচ্ছাবিনিময় করেন পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান পিপিএম (বার)। পরে চার থানা ও বিভিন্ন ফাঁড়িতে থাকা পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় করেন তিনি। তবে সর্বত্রই ছিল বৈরী আবহাওয়া তথা বৃষ্টির ভয়।
ঈদের আগের দিন সন্ধ্যা ছয়টায় আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়, বাংলাদেশ ও এর আশপাশের এলাকায় পশ্চিমা লঘুচাপের বর্ধিতাংশের প্রভাবে রাজশাহী, রংপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ী দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে মাঝারি ধরনের ভারী বর্ষণ হতে পারে। পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের প্রবণতা সামান্য বাড়তে পারে।
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানায়, ঈদের দিন ১২ আগস্ট থেকে পরবর্তী চার দিন জেলার বিভিন্ন স্থানে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হয়েছে। তবে গতকাল বুধবার ৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তা ছাড়া অন্য দিনের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ খুবই কম। আশা করা যায়, আজ বৃহস্পতিবার আকাশে মেঘ থাকলেও বৃষ্টির সম্ভাবনা কম, শুক্রবার এ বৈরী আবহাওয়া থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।
জীবননগর:
জীবননগরের ১টি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়নের ১০৭টি ঈদগাহ ময়দানে পবিত্র ঈদুল আজহার জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃষ্টিভেজা সকালে আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যে দিয়ে এ ঈদুল আজহার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবছরের ন্যায় এ বছরেও জীবননগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি হাফিজুর রহমান হাফিজ নিজ গ্রাম খয়েরহুদা ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করেন এবং সেখানে গরু-ছাগল কোরবানি করেন। পরবর্তীতে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় করেন। জীবননগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম জীবননগর পৌর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করেন। পরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাংবাদিক ও সুধীজনদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় এবং উপজেলা পরিষদে ছাগল কোরবানি করেন। জীবননগর পৌরসভার মেয়র জাহাঙ্গীর আলম জীবননগর পৌর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করেন এবং নিজ বাড়ি ৬ নম্বর ওয়ার্ডে তিনটি গরু কোরবানি করেন। পরে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় করেন। জীবননগর থানার ভারাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ গনি মিয়া জীবননগর থানা ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় করেন এবং থানা পুলিশের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় করেন। জীবননগর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবু মো. আব্দুল লতিফ অমল জীবননগর পৌর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে ঈদের নামাজ আদায় শেষে নিজ বাড়ি ৭ নম্বর ওয়ার্ডে গরু-ছাগল কোরবানি করেন। বিকেলে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় করেন।
এদিকে, জীবননগরে বিজিবি ও বিএসএফ ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের মধ্যে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছাবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঈদের দিন সোমবার বিকেলে জীবননগর উপজেলার সীমান্তবর্তী দৌলতগঞ্জে প্রস্তাবিত আইসিপির নিকটে খালিশপুর ব্যাটালিয়নের (৫৮ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল কামরুল আহসান ৫৪ ব্যাটালিয়ন বিএসএফের কমান্ড্যান্ট মধুকর জুয়ালের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময় করেন। এ সময় ৫৮ বিজিবি অধিনায়কের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন খালিশপুর ব্যাটালিয়ন ৫৮ বিজিবির উপ-অধিনায়ক মেজর কামরুল হাসান।
মেহেরপুর:
মেহেরপুরে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহা। গত সোমবার সকালে ঈদের নামাজ আদায়ের মধ্যে দিয়ে ঈদের উৎসব উদ্যাপন শুরু হয়। নামায শেষে মোনাজাতে দেশের সমৃদ্ধি ও শান্তি কামনা করা হয়। পাশাপাশি একে অপরে নিজেদের সৌহার্দ্যপূর্ণ ভ্রাতৃত্বকে বজায় রাখতে আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতজনদের সঙ্গে কোলাকুলি করেন। পরে মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে কোরবানি করেন সামর্থ্যবান মুসলমানেরা। মেহেরপুরে ঈদুল আজহার প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল আটটায় মেহেরপুর নতুন পৌর ঈদগাহ ময়দানে। ২য় জামাত অনুষ্ঠিত হয় সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে চুয়াডাঙ্গা সড়কের পুরাতন ঈদগাহ ময়দানে। সকাল সাড়ে ৬টায় মেহেরপুর শহীদ ড. সামসুজ্জোহা পার্কে আহলে হাদিসের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া এখানে মহিলারা জামাতে পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করেন।