বীভৎস রূপে সামাজিক অপরাধ

148

নিষ্ঠুরভাবে মানুষ হত্যা, ধর্ষণ, সর্বস্তরে নানামুখী পারিবারিক ও সামাজিক অপরাধ
সমীকরণ প্রতিবেদন:
পারিবারিক ও সামাজিক অপরাধের মাত্রা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বীভৎস ও নিষ্ঠুরভাবে খুন হচ্ছে মানুষ। ধর্ষণ করা হচ্ছে শিশু থেকে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধকে। সন্তানের হাতে বাবা-মা আর বাবা-মার হাতে খুন হচ্ছে সন্তান। শিক্ষকের হাতে ধর্ষিত হচ্ছে শিক্ষার্থী। সমাজের সর্বস্তরে হঠাৎ করে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক অপরাধ। তুচ্ছ ঘটনায় মানুষ মানুষকে হত্যা করছে। কখনো প্রকাশ্যে কুপিয়ে, কখনো পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে ততই এ ধরনের অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। মাদকের প্রভাব, সম্পদের লোভ, রাতারাতি বড়লোক হওয়ার বাসনা, সুস্থ ধারার বিনোদনের অভাব, নানা ধরনের বৈষম্য ও অসংগতিকে এসব অপরাধের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তারুণ্যের মধ্যে সৃষ্ট হত্যাশাও অন্যতম একটি কারণ বলে মনে করছেন কোনো কোনো অপরাধবিজ্ঞানী। একই সঙ্গে দায়ী করা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় আইন প্রয়োগের ব্যর্থতা, পারিবারিক শিক্ষার অভাব, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়কে।
সিলেটে নিষ্ঠুরভাবে পিটিয়ে শিশু সামিউল আলম রাজনকে হত্যার ঘটনা সারা দেশকে নাড়িয়ে দেয়। ঢাকার ভিক্টোরিয়া পার্কের সামনে দিনে-দুপুরে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় বিশ্বজিৎ দাসকে। টিএসসিতে অসংখ্য মানুষের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয় অভিজিৎ রায়কে। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের শিক্ষার্থী সুরাইয়া আক্তার রিশাকে স্কুলের সামনেই ছুরিকাঘাতে হত্যা করে এক দর্জি। প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের ছাত্রী খাদিজা বেগম নার্গিসকে অসংখ্য মানুষের সামনে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারা গেছে মনে করে ফেলে যায় বদরুল আলম। মাদ্রাসা অধ্যক্ষের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে মামলা করায় গায়ে কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করা হয় ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতকে। সর্বশেষ স্ত্রীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় বরগুনায় স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাত শরীফকে (২২) কুপিয়ে হত্যার ঘটনা সারা দেশে আলোড়ন ফেলে।
সন্তান বাবাকে, বাবা সন্তানকে খুন করছে। স্নেহময়ী মায়ের হাতে প্রাণ দিচ্ছে প্রাণপ্রিয় সন্তান। আবার সন্তানের হাতে প্রাণ দিতে হচ্ছে গর্ভধারিণী মাকে। সন্তানকে খুন করে আত্মঘাতী হচ্ছেন বাবা-মা। পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হচ্ছে মানুষকে। ধর্ষণের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে বহুমাত্রিক চিত্র। পিতৃতুল্য শিক্ষকের কাছেও নিরাপদ নয় ছাত্রী! প্রায়ই শিক্ষকের হাতে ছাত্রী লাঞ্ছিত হওয়ার খবর সামনে আসছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। আপত্তিকর ছবি দেখিয়ে চার বছর ধরে ২০ ছাত্রীকে ধর্ষণ করার অভিযোগে সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অক্সফোর্ড কিন্ডারগার্টেন নামে এক স্কুলের দুই শিক্ষককে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের হাতেও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন ছাত্রী। কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে। শুধু ধর্ষণ নয়, সেই দৃশ্যের ভিডিও করে রাখা এবং সেই ভিডিও দিয়ে দিনের পর দিন মেয়েটিকে ব্ল্যাকমেইল করার ঘটনা ঘটছে হামেশা। অনেক সময় ধর্ষণের ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দিয়ে বিকৃত আত্মতৃপ্তি নিচ্ছে ধর্ষক, যা মেয়েটিকে আত্মহত্যার দিকেও ঠেলে দিচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সম্পর্ক থেকে প্রেম, অতঃপর ধর্ষণ ও হত্যার খবর মাঝেমধ্যেই সামনে আসছে। সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে এগুলোর পেছনে মাদকের বড় প্রভাব আছে। এ ছাড়া সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধন আলগা হয়ে যাওয়া, নানা বৈষম্য থেকে সৃষ্ট হতাশা, বেকারত্ব, রাতারাতি বড়লোক হওয়ার আকাক্সক্ষাও ভূমিকা রাখছে। সেই সঙ্গে আইনের প্রয়োগ না হওয়া, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক আশ্রয়ে অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া, খুনের আসামি গ্রেফতার না হওয়া, গ্রেফতার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়া, বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকাসহ সর্বোপরি সামাজিক ও নৈতিক অধঃপতনকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।